প্রায় দেড় বছর ধরে কারাগারে রয়েছেন বেক্সিমকো গ্রুপের কর্ণধার সালমান এফ রহমান। তিনি ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন। তার মালিকানাধীন কোম্পানির সংখ্যা ২০০-এর বেশি।
এসব কোম্পানির নামে দেশের বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে নেয়া ঋণের পরিমাণ ৮০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এখন অধিকাংশ কোম্পানি বন্ধ। খেলাপি হয়ে গেছে কোম্পানিগুলোর নামে থাকা ব্যাংক ঋণ। ফলে এই প্রতিষ্ঠানগুলিতে চাকরিরত বহু কর্মী কর্মহীন হয়েছেন।
তবে শত কোম্পানির মধ্যে একমাত্র ব্যতিক্রম হলো বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড। সালমান এফ রহমানের কারাগারে থাকার পরও এই পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ওষুধ উৎপাদনকারী কোম্পানির আয় ও মুনাফা বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি ব্যাংক ঋণের পরিমাণও কমেছে। কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কোম্পানির আয় ও মুনাফা নিরন্তর বৃদ্ধি পেয়েছে।
২০২৩ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত, অর্থাৎ শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী থাকার সময়, ওষুধ বিক্রি ও ব্যবসা থেকে কোম্পানির আয় ছিল ২,২০৬ কোটি টাকা। এরপর ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পরবর্তী সময়ে, ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত, এই আয় বেড়ে ২,৪০১ কোটি টাকায় উন্নীত হয়। মোট মুনাফার দিকেও লক্ষ্যযোগ্য বৃদ্ধি হয়েছে। ২০২৩ সালের শেষ ছয় মাসে কোম্পানির গ্রস প্রফিট ছিল ৯৭৯ কোটি টাকা, যা ২০২৪ সালের একই সময়ে বেড়ে ১,০৯৮ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। বিক্রি ও গ্রস মুনাফা বাড়ার প্রভাব পড়েছে নিট মুনাফায়ও। ২০২৩ সালের শেষ ছয় মাসে নিট মুনাফা ছিল ৩০০ কোটি টাকা, যা গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী ছয় মাসে বেড়ে ৩৫৩ কোটি টাকায় উন্নীত হয়।
সুতরাং, সালমান এফ রহমানের কারাগারে থাকার পরও বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস নিরবিচ্ছিন্নভাবে আয় ও মুনাফা বাড়াতে সক্ষম হয়েছে, যা কোম্পানির আর্থিক দৃঢ়তার পরিচায়ক। সালমান এফ রহমান কারাগারে যাওয়ার পরও বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের সংরক্ষিত আয় (রিটেইনড আর্নিংস) বেড়েছে। ২০২৩ সালে এটি ৩,২২৩ কোটি টাকা থেকে ২০২৪ সালের শেষে ৩,৬৮০ কোটি টাকায় উন্নীত হয়। পাশাপাশি ব্যাংক ঋণের পরিমাণ কমেছে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বর শেষে ঋণ ছিল ৭৬০ কোটি টাকা, যা ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে নেমে আসে ৬১৯ কোটি টাকায়।
তবে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের পর থেকে কোম্পানি আর কোনো আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি। কোম্পানির পক্ষ থেকে জানানো হয়, গত বছরের শুরুতে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসে ৯ জন স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ দেয়। কোম্পানিটি এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে রিট দায়ের করেছে।
উচ্চ আদালতে বিচারাধীন থাকায় পর্ষদ সভা করা সম্ভব হয়নি। এর ফলে কোম্পানি ২০২৪-২৫ হিসাব বছরের তৃতীয় প্রান্তিক (জানুয়ারি-মার্চ) অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন, একই বছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন এবং ২০২৫-২৬ হিসাব বছরের প্রথম প্রান্তিক (জুলাই-সেপ্টেম্বর) অনিরীক্ষিত প্রতিবেদন প্রকাশ করতে পারেনি। নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ না হওয়ার কারণে গত ২ জানুয়ারি থেকে লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের লেনদেন সাময়িকভাবে স্থগিত রয়েছে। কোম্পানির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগের তুলনায় সংরক্ষিত আয় বেড়েছে এবং এর সঙ্গে ব্যাংক ঋণ কমেছে। পাশাপাশি ব্যবসায়িক পারফরম্যান্সও ভাল অবস্থায় রয়েছে।
বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) মোহাম্মদ আলী নেওয়াজ বলেন, “দেশের পুঁজিবাজারের পাশাপাশি আমাদের কোম্পানি লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত। তাই কোম্পানিকে কঠোর সুশাসন মেনে চলতে হয়। দৈনন্দিন কার্যক্রমে পর্ষদের সরাসরি হস্তক্ষেপ নেই। পরিচালনায় পেশাদার কর্মীরা মুখ্য ভূমিকা রাখছেন। ব্যবসাও স্বাভাবিক গতিতে চলছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও জনতা ব্যাংকের সহায়তা আমাদের ব্যবসা পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।”
বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস পিএলসি দেশের ওষুধ খাতের অন্যতম শীর্ষ প্রতিষ্ঠান। কোম্পানি ১৯৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। শুরুতে তারা জার্মানির বায়াহ ও যুক্তরাষ্ট্রের আপজন কোম্পানি থেকে ওষুধ আমদানি করে বিক্রি করত। পরবর্তী সময়ে, ১৯৮০ সালে, বাংলাদেশে লাইসেন্সিং চুক্তির মাধ্যমে উৎপাদন শুরু করে। বর্তমানে কোম্পানির পোর্টফোলিওতে তিনশর বেশি পণ্য রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপসহ ৬০টির বেশি দেশে ওষুধ রফতানি করছে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস।
সালমান এফ রহমান অনুপস্থিত থাকলেও ২০২৫ সালে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস গবেষণা ও উৎপাদন ক্ষমতায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি দেখিয়েছে। কোম্পানি একটি বিরল রোগের উচ্চমূল্যের জেনেরিক ওষুধের বাজারজাতকরণ ঘোষণা করেছে। কোম্পানিটি ‘ট্রিকো’ নামের এই ওষুধের উৎপাদন ও সরবরাহ পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে। ট্রিকো মূলত সিস্টিক ফাইব্রোসিস নামে পরিচিত জটিল জেনেটিক রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হবে। বেক্সিমকো ফার্মার পক্ষ থেকে জানানো হয়, এটি উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশের রোগীদের জন্য সাশ্রয়ী চিকিৎসা নিশ্চিতের লক্ষ্যে তৈরি করা হয়েছে।
যদিও ওষুধটির পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক সরবরাহ ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে শুরু করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, ২০২৫ সালেই এর উৎপাদন প্রস্তুতি, নিয়ন্ত্রক প্রক্রিয়া এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। একই বছরে কোম্পানি হৃদরোগ ও গ্যাস্ট্রিকের নতুন ওষুধও বাজারে ছেড়েছে। তাছাড়া, ২০২৫ সালে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস ওষুধ খাতের কোম্পানিগুলোর মধ্যে সিলভার ক্যাটাগরিতে আইসিএমএবি বেস্ট করপোরেট অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসে দক্ষ পরিচালনা ও সুশাসন দেখা যাচ্ছে, যা সালমান এফ রহমানের অন্য কোম্পানিগুলিতে তার অনুপস্থিতিতে দেখা যায় না।
বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস ১৯৮৬ সালে দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। পাশাপাশি কোম্পানি লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জের অল্টারনেটিভ ইনভেস্টমেন্ট মার্কেট (এআইএম)-এও তালিকাভুক্ত। লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জের বিনিয়োগকারীদের কাছে কোম্পানির ২২.৪২ শতাংশ শেয়ার রয়েছে, আর বাংলাদেশের স্টক এক্সচেঞ্জে আছে ৭৭.৫৮ শতাংশ শেয়ার।
কোম্পানির অন্যতম উদ্যোক্তা হলেন সালমান এফ রহমান এবং তার ভাই এএসএফ রহমান। খাতসংক্রান্ত বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন অন্যান্য কোম্পানির তুলনায় কেবল বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসে করপোরেট সুশাসন অটুট ছিল। ব্যবসা সম্প্রসারণ, আয়-ব্যয়ের হিসাব, ঋণ গ্রহণ—সব ক্ষেত্রেই কোম্পানি রীতিনীতি মেনে চলে।
বিদেশি স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত থাকার কারণে সালমান এফ রহমান কোম্পানির পর্ষদ বা পরিচালনায় অনৈতিক হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত থাকতেন। ফলে তিনি কারাগারে থাকলেও কোম্পানির ব্যবসায় কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি। উল্টো, ওষুধ শিল্পের বাজারে কোম্পানির অবস্থান আরও সুসংহত হয়েছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, “উন্নত দেশগুলোসহ আমাদের দেশেও প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের মূল ভিত্তি হলো করপোরেট গভর্ন্যান্স। এটি মূলত নিয়মকানুনের যথাযথ পরিপালন বা কমপ্লায়েন্স। কমপ্লায়েন্স দুই ধরনের—অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক। এক্সটারনাল কমপ্লায়েন্স হলো দেশের প্রচলিত ব্যবসায়িক নিয়ম ও নীতিমালা মেনে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা। অন্যদিকে ইন্টারনাল গভর্ন্যান্স হলো প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব নিয়মনীতি, যা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। এতে অন্তর্ভুক্ত হয় ব্যবসার নীতি, মুনাফা নীতি, মানবসম্পদ নিয়োগ ও ব্যবস্থাপনা, অর্থ ও নিরীক্ষাসংক্রান্ত নিয়মাবলি। প্রতিষ্ঠানকে অভ্যন্তরীণ ও বহিঃনিরীক্ষা—উভয় ধরনের নিরীক্ষা ব্যবস্থা বজায় রাখতে হয়।”
দীর্ঘমেয়াদে টেকসই প্রতিষ্ঠান হতে হলে শীর্ষ পর্যায়ে বা টপ ম্যানেজমেন্টে যোগ্য ও দক্ষ লোক থাকা প্রয়োজন। পাশাপাশি তাদের কাজের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাও জরুরি। সিপিডি নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, “প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি বিভাগ, অ্যাডভাইজরি বোর্ড বা ট্রাস্টি বোর্ডকে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। এভাবে প্রতিষ্ঠান ভালোভাবে পরিচালিত হবে এবং কর্মদক্ষতা বা এফিশিয়েন্সি বাড়বে। তুলনামূলক কম উন্নত দেশেও যদি কোনো কোম্পানি সঠিকভাবে করপোরেট গভর্ন্যান্স অনুসরণ করে, তবে সেই কোম্পানি অন্যদের চেয়ে আলাদা হয়ে দাঁড়াবে এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও ভালো ফলাফল করতে সক্ষম হবে।”
বর্তমানে দেশের পুঁজিবাজারে বেক্সিমকো গ্রুপের তিনটি কোম্পানি তালিকাভুক্ত রয়েছে। এগুলো হলো:
- বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড
- বাংলাদেশ এক্সপোর্ট ইমপোর্ট কোম্পানি (বেক্সিমকো) লিমিটেড
- শাইনপুকুর সিরামিকস লিমিটেড
এর মধ্যে ব্যবসায়িক ও আর্থিক পারফরম্যান্সের দিক দিয়ে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস অন্য দুই কোম্পানির চেয়ে অনেক এগিয়ে। খাতসংক্রান্ত বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূলত সুশাসন চর্চা ও পেশাদার কর্মীদের মাধ্যমে কোম্পানি পরিচালনা করায় বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতিতেও স্থিতিশীলভাবে টিকে আছে।
প্রতিকূলতা ও প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও প্রতিষ্ঠানকে টিকে থাকতে সাহায্য করে করপোরেট গভর্ন্যান্স। এমনটা উল্লেখ করে বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির সেক্রেটারি জেনারেল ড. জাকির হোসেন বলেন, “বিক্রির দিক থেকে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস দেশের তৃতীয় বৃহত্তম কোম্পানি, কিন্তু করপোরেট গভর্ন্যান্সের দিক থেকে এক নম্বর।
ফার্মা সেক্টরে মানবসম্পদ বা জনশক্তি তৈরি করতে বেক্সিমকোর ভূমিকা বড়। এর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো মালিকরা নিজে পরিচালনা করেন না, বরং পেশাদার কর্মী নেতৃত্ব দেন। শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিদের অনুপস্থিতিতেও প্রতিষ্ঠান চালাতে কোনো সমস্যা হয়নি। অভ্যন্তরীণ কাঠামো বা ‘ঘরের ভেতরে’ অভিজ্ঞ পেশাদাররা বিভিন্ন শাখা ও উইং সামলাতে সক্ষম। এজন্য দেশের ফার্মা সেক্টরে দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে বেক্সিমকো অগ্রণী।
ড. জাকির হোসেন আরও বলেন, “বাজারে অন্যান্য বড় ওষুধ কোম্পানিতে যারা বড় পদে কাজ করছেন, তাদের একটি বড় অংশই বেক্সিমকো প্রোডাক্ট বা বেক্সিমকো থেকে তৈরি কর্মী। বাংলাদেশে হাতেগোনা কয়েকটি কোম্পানি যেমন বেক্সিমকো, এসিআই ও এসকেএফ মূলত পেশাদারদের ওপর নির্ভরশীল। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান এখনো মালিকদের দ্বারা পরিচালিত। দেশে সাকসেশন প্ল্যানিং সাধারণত ভালো নয়, কিন্তু বেক্সিমকো একটি ইতিবাচক উদাহরণ। সমস্যা থাকলেও এই ব্যবস্থার কারণে কোম্পানি প্রতিকূল সময়েও স্থিতিশীল। মালিকপক্ষের সরাসরি হস্তক্ষেপহীন এবং পেশাদারদের ওপর নির্ভরতা বেক্সিমকোকে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সাহায্য করেছে।”
শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির কয়েকদিন পর, ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট রাজধানীর সদরঘাট এলাকা থেকে সালমান এফ রহমান গ্রেফতার হন। এরপর থেকে তিনি কারাগারে রয়েছেন। ছাত্র-জনতার গণ-আন্দোলনের সময় হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালেও তার বিচার চলছে। গত দুই বছরে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) দায়েরকৃত বিভিন্ন মামলায়ও সালমান এফ রহমানকে আসামি করা হয়েছে।
গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে দেশের ব্যাংক ও আর্থিক খাত থেকে লুটপাট হওয়া অর্থের চিত্র সামনে আসে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে হাইকোর্টে জমা দেওয়া বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের অন্তত ১৬টি ব্যাংক ও ৭টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে বেক্সিমকো গ্রুপের কোম্পানিগুলো ৫০,৯৮০ কোটি টাকার বেশি ঋণ নিয়েছে। এর মধ্যে কেবল রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক থেকেই নেওয়া ঋণের পরিমাণ প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা।
ওই বছরের ৩০ নভেম্বরের মধ্যেই সালমান এফ রহমানের নেওয়া ৩১ হাজার কোটি টাকার ঋণ খেলাপির খাতায় উঠে। প্রতিবেদনটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আইনজীবী ব্যারিস্টার মুনিরুজ্জামানের মাধ্যমে হাইকোর্টে উপস্থাপন করা হয়েছিল। প্রতিবেদনের বিষয়ে ব্যারিস্টার মুনিরুজ্জামান গণমাধ্যমকে বলেন, “বেক্সিমকো গ্রুপের মোট ১৮৮টি কোম্পানি জনতা, সোনালী, অগ্রণী, রূপালী, আইএফআইসি, ন্যাশনাল, এবি ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ নিয়েছে। বেশির ভাগ ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক আইন, নিয়ম ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা লঙ্ঘন করা হয়েছে।”
হাইকোর্টে প্রতিবেদন দাখিলের পর, ২০২৫ সালে দেশের প্রায় এক ডজন ব্যাংকে ফরেনসিক অডিট করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে সালমান এফ রহমান চেয়ারম্যান পদে থাকা আইএফআইসি ব্যাংকও। ফরেনসিক অডিট ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ নিরীক্ষায় বিভিন্ন ব্যাংকে বেনামি কোম্পানির নামে আরও অন্তত ৩০ হাজার কোটি টাকা ঋণ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে কেবল আইএফআইসি ব্যাংকেই ৮ হাজার কোটি টাকার বেশি বেনামি ঋণ ধরা পড়ে।
নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, সালমান এফ রহমানের ২০০-এর বেশি কোম্পানি রয়েছে। এসব কোম্পানির নামে ব্যাংক ও আর্থিক খাত থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণ প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকা। তবে কেবল বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের ঋণই নিয়মিত চলছে; বাকি কোনো কোম্পানির ঋণ এখন আর নিয়মিত নয়।

