মোবাইল আর্থিক সেবা, কিউআর পেমেন্ট ও অনলাইন ব্যাংকিংয়ের বিস্তারে বাংলাদেশ ডিজিটাল পেমেন্টে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। তবু দেশের বড় অংশের লেনদেন এখনও নগদনির্ভর।
নগদবিহীন অর্থনীতির পথে বড় চারটি বাধা চিহ্নিত করেছে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআরআই)। এসব বাধা হলো সীমিত আন্তঃসংযোগ, অবকাঠামোগত ঘাটতি, সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং কম ডিজিটাল সাক্ষরতা!
গতকাল বৃহস্পতিবার পিআরআই আয়োজিত ‘ক্যাশলেস অর্থনীতির পথে বাংলাদেশের জন্য কৌশলগত রোডম্যাপ’ শীর্ষক কর্মশালায় উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। গেটস ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় আয়োজিত এই কর্মশালায় ডিজিটাল ও ক্যাশলেস লেনদেন সম্প্রসারণের পথ, চ্যালেঞ্জ ও নীতি অগ্রাধিকার নিয়ে আলোচনা হয়। এতে নীতিনির্ধারক, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, অর্থনীতিবিদ, আর্থিক খাতের প্রতিনিধি এবং উন্নয়ন সহযোগীরা অংশ নেন।
কর্মশালার অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন পিআরআইর চেয়ারম্যান ড. জাইদী সাত্তার। তিনি বলেন, নগদবিহীন লেনদেন উৎপাদনশীলতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে এর মাধ্যমে সৃষ্ট অর্থনৈতিক মূল্য যথাযথভাবে ধারণ করা প্রয়োজন। তিনি জানান, ডিজিটাল ও নগদবিহীন লেনদেনের মূল্য জাতীয় উৎপাদনে প্রতিফলিত করতে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোকে জাতিসংঘের সিস্টেম অব ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টস ২০২৫ গ্রহণ করতে হবে। এই প্রক্রিয়ায় কমপক্ষে তিন বছর সময় লাগবে।
এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক, বিবিএস ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয় এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে প্রয়োজনীয় তথ্যের প্রাপ্যতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি উল্লেখ করেন।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পিআরআইর প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. আশিকুর রহমান। তিনি বলেন, বাংলাদেশের ক্যাশলেস অর্থনীতির দিকে এগিয়ে নিতে একটি কৌশলগত রোডম্যাপ প্রণয়নের লক্ষ্যেই এই পরামর্শক সভা আয়োজন করা হয়েছে। চীন ও ভারতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এই রোডম্যাপ তৈরি করা হবে। তাঁর মতে, ক্যাশলেস এজেন্ডাকে এখন জাতীয় উন্নয়ন অগ্রাধিকারে স্থান দিতে হবে।
ড. আশিকুর রহমান বলেন, ডিজিটাল ও নগদবিহীন উপকরণ আর প্রান্তিক উদ্ভাবন নয়। এগুলো আর্থিক অন্তর্ভুক্তি জোরদার করে, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা সহজ করে এবং লেনদেন ব্যয় কমাতে সহায়তা করে। পরিকল্পিতভাবে এসব সেবা চালু হলে প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক সেবা সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানো সম্ভব হবে। এতে অনানুষ্ঠানিকতা কমবে, স্বচ্ছতা বাড়বে এবং রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা শক্তিশালী হবে।
তিনি আরও বলেন, বৈশ্বিক ডিজিটাল অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে নগদবিহীন অর্থনীতিতে উত্তরণ হতে হবে পরিকল্পিত, সমন্বিত এবং নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে।
কর্মশালায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান। তিনি বলেন, ডিজিটাল পেমেন্ট, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং নিরাপদ পেমেন্ট ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে বাংলাদেশ ব্যাংক সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। নগদবিহীন অর্থনীতিতে সফলভাবে উত্তরণ ঘটাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও প্রযুক্তি সরবরাহকারীদের মধ্যে শক্তিশালী সমন্বয় জরুরি। এতে এই রূপান্তর সবার জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে।
আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা মার্চেন্ট গ্রহণযোগ্যতা, ডিজিটাল লেনদেনের ব্যয়, সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকি, গ্রামীণ পর্যায়ে সেবা বিস্তার এবং ফিনটেক উদ্ভাবনের ভূমিকা নিয়ে মত দেন। সরকার, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, বেসরকারি খাত এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন বক্তারা।
কর্মশালার সমাপনী বক্তব্য দেন পিআরআইর নির্বাহী পরিচালক ড. খুরশিদ আলম। তিনি বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপান্তর এজেন্ডা সমর্থনে প্রমাণভিত্তিক নীতি সংলাপ ও গবেষণায় পিআরআইর অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। কর্মশালায় পিআরআইর গবেষণা পরিচালক ড. বজলুল এইচ. খন্দকারও উপস্থিত ছিলেন।

