সরকার দেশীয় স্পিনিং মিলগুলোকে আমদানিকৃত সুতার চাপ থেকে রক্ষা করার জন্য একাধিক বিকল্প নিয়ে ভাবছে। এর মধ্যে রয়েছে—আমদানিতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ, শুল্কমুক্ত সুতার আমদানিতে সীমা টানা এবং স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সুতা ব্যবহারে প্রণোদনা দেওয়া। বিশেষ করে ভারত থেকে ভর্তুকিপ্রাপ্ত সুতার আমদানি বেড়ে যাওয়ায় দেশীয় মিলগুলো রক্ষায় সরকারের ওপর চাপ বেড়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকায় বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন (বিটিটিসি) কর্মকর্তারা বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) এবং দেশের দুই প্রধান পোশাক রপ্তানিকারক সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে সবাই একমত হয়েছেন যে টেক্সটাইল ভ্যালু চেইন রক্ষা জরুরি। তবে মিলমালিক ও রপ্তানিকারকদের মধ্যে তীব্র মতপার্থক্যের কারণে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবুর রহমান বলেন, “আমরা বিষয়টি নিয়ে স্টাডি করছি, কাজ চলছে।” তিনি জানান, স্থানীয় শিল্পকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে কোন সুতা আমদানিতে কড়াকড়ি আরোপ করা হবে কিনা তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম হিসেবে উন্নতি করেছে। এর সঙ্গে সমান্তরালে স্থানীয় টেক্সটাইল মিলও গড়ে উঠেছে। বর্তমানে এই মিলগুলো ওভেন পোশাকের প্রায় ৬০ শতাংশ এবং নিটওয়্যার খাতের প্রায় শতভাগ সুতা সরবরাহ করতে সক্ষম। তবে গত এক বছরের বেশি সময় ধরে স্পিনিং মিলগুলো তীব্র আর্থিক সংকটে রয়েছে। অনেক মিল উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে সুতা বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে।
মিলমালিকরা জানিয়েছেন, কারখানাগুলোতে বর্তমানে অবিক্রীত সুতার মজুতের মূল্য ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি। বিটিএমএ জানিয়েছে, ২৩ বিলিয়ন ডলারের টেক্সটাইল শিল্পকে রক্ষা করতে সরকারের দ্রুত পদক্ষেপ প্রয়োজন।
বিটিএমএ’র তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ২০২৪ সালে প্রায় ২.২০ বিলিয়ন ডলারের সুতা আমদানি করেছে। এর ৭৬ শতাংশ এসেছে ভারত থেকে, যার পরিমাণ প্রায় ১.৬৪ বিলিয়ন ডলার। স্পিনারদের অভিযোগ, ভারতের কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকার থেকে প্রতি কেজি সুতায় ০.৩০ ডলারের ভর্তুকি পাওয়ায় সেখানে সুতা কম দামে বিক্রি হচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের মিলগুলো প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারছে না।
বিটিটিসি’র একজন সিনিয়র কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “সব পক্ষ একমত যে টেক্সটাইল শিল্পকে রক্ষা করতে হবে। কিন্তু স্বার্থের বৈষম্যের কারণে আজকের সভায় কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।” তিনি আরও বলেন, “নিষ্কর্ষে পৌঁছানোর আগে বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা, রাজস্ব ও আইনি বিষয়গুলো বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করতে হবে।”
শিল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বৈঠকে এক বছরের জন্য ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সুতা আমদানি বন্ধ বা বাড়তি শুল্ক আরোপের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। এই ক্যাটাগরি বাংলাদেশের মোট সুতা আমদানির প্রায় ৯৫ শতাংশ।
বিটিএমএ পরিচালক মাসুদ রানা প্রস্তাব দেন স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সুতা ব্যবহারকারী রপ্তানিকারকদের জন্য ৭ শতাংশ প্রণোদনা দেওয়ার। বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএ এই প্রস্তাবকে সমর্থন করে। তবে বিটিএমএর আরও দুই প্রতিনিধি বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধার আওতায় শুল্কমুক্ত সুতার আমদানির পুরো প্রত্যাহারের দাবি জানান। একই বৈঠকে বিকেএমইএ’র একজন নেতা জানান, গত ৬ মাসে তার আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় সুতা আমদানি কমেছে।
পোশাক রপ্তানিকারকদের আপত্তি:
বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিকারকরা দেশীয় সুতা ও আমদানি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সরকারের সম্ভাব্য উদ্যোগকে আপত্তিকর মনে করছেন। বিকেএমইএ’র নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান জানান, “বর্তমানে তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে থাকা রপ্তানিকারকদের প্রায় ৮০ শতাংশ সময় উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে রপ্তানি করতে হচ্ছে। নতুন করে যদি সুতা আমদানি বন্ধ করা হয়, উৎপাদন খরচ আরও বেড়ে যাবে এবং ক্রয়াদেশ হারানোর সম্ভাবনা বেড়ে যাবে।” তিনি আরও বলেন, “বায়াররা সহজে কম দামের অন্য দেশের দিকে ঝুঁকবে।
রপ্তানিকারকরা স্বীকার করছেন যে টেক্সটাইল খাতকে সহায়তা প্রয়োজন। কিন্তু তাদের মতে, আমদানিতে রেস্ট্রিকশন সমাধান নয়। বরং সরকার স্পিনারদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা বা বিকল্প সুবিধা দিতে পারলে শিল্পকে রক্ষা করা সম্ভব। বিজিএমইএ নেতারাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন—যদি স্থানীয় সুতার দাম আমদানিকৃত সুতার চেয়ে বেশি হয়, আন্তর্জাতিক ক্রেতারা বাড়তি খরচ দিতে রাজি হবেন কি না, সেটিও বিবেচনা করতে হবে।
অন্যদিকে, টেক্সটাইল মিলমালিকরা সতর্ক করে জানাচ্ছেন, কম দামের সুতার অব্যাহত আমদানি দেশের উৎপাদন সক্ষমতাকে স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। বিটিএমএ’র সাবেক সহসভাপতি সালেউদ জামান খান বলেন, “ভারত বর্তমানে ডাম্পিং মূল্যে সুতার রপ্তানি করছে। চলতে থাকলে দেশের মিলগুলো এক পর্যায়ে বন্ধ হয়ে যাবে। এরপর গার্মেন্টস শিল্পকে ভারত থেকে বেশি দামে সুতা কিনতে হবে।”
বিটিএমএ পরিচালক খোরশেদ আলম আরও বলেন, “ভার্টিক্যালি ইন্টিগ্রেটেড উৎপাদকরাও নিজের উৎপাদনের ওপর নির্ভর করতে পারছে না। ট্যারিফ কমিশনের সভায় আরএন স্পিনিংয়ের প্রতিনিধিও জানিয়েছেন, প্রাইস মেলাতে না পারায় নিজের কারখানা থেকে সুতা ব্যবহার না করে আমদানি করতে বাধ্য হচ্ছেন। আমরা কম দামে যে সুতা কিনছি, তার সুবিধা স্থানীয় উৎপাদকরা পাচ্ছে না, বায়াররাই তা ব্যবহার করছে।”
বিটিএমএ’র সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল জানিয়েছেন, “এখন পর্যন্ত প্রায় ১০০ টেক্সটাইল মিল পুরোপুরি বা আংশিক বন্ধ হয়ে গেছে। আমার নিজেরও একটি মিল বন্ধ করতে হয়েছে।”
বাজারে কম দামের আমদানিকৃত সুতার চাপ এবং রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতা দেশের টেক্সটাইল শিল্পের জন্য দানবীয় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। রপ্তানিকারকরা আমদানি সীমিত করতে চায় না, অন্যদিকে মিলমালিকরা স্থানীয় উৎপাদন রক্ষার জন্য ব্যবস্থা চাচ্ছেন। পরিস্থিতি যদি এভাবে চলতে থাকে, তবে দেশীয় স্পিনিং মিলগুলো আরও সংকটের মুখোমুখি হবে এবং গার্মেন্টস শিল্পকে বিদেশ থেকে বেশি দামে সুতা কিনতে বাধ্য হতে হবে। বিশেষ প্রণোদনা বা বিকল্প নীতি না নিলে টেক্সটাইল খাতের স্থিতিশীলতা ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা ঝুঁকিতে পড়বে।
বন্ড সুবিধা অপব্যবহার ও সুতার সংকট, টেক্সটাইল শিল্পের চ্যালেঞ্জ:
পোশাক রপ্তানিকারকরা প্রশ্ন তুলেছেন, আমদানি সীমিত করলেও কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে কি না। বিকেএমইএ’র নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, “আমদানি সীমিত করলে স্থানীয় বাজার থেকে বেশি দামে সুতা কিনতে হবে। অধিকাংশ বায়ার সেই অতিরিক্ত খরচ দিতে চাইবেন না। বিকল্প হিসেবে তারা ইন্ডিয়া থেকে গ্রে ফেব্রিক আমদানির জন্য আমাদেরকে নির্দেশ দিতে পারে। তখন আমদানি বাধ্যতামূলক হয়ে যাবে। ফলে সীমিত করার যে সুবিধা পাওয়া যাবে, তা নষ্ট হয়ে যাবে।
অন্যদিকে, মিলমালিকরা বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধার অপব্যবহারের অভিযোগ তুলেছেন। সরকার শুল্কমুক্ত সুবিধায় পোশাকের কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিয়েছে যাতে শিল্প বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় সক্ষম হয়। তবে শর্ত হলো—আমদানিকৃত পণ্য স্থানীয় বাজারে বিক্রি করা যাবে না; বিক্রি করতে হলে শুল্ক দিতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে এই সুবিধা ব্যবহার করে কিছু পণ্য স্থানীয় বাজারে বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিটিএমএ’র পরিচালক খোরশেদ আলম জানিয়েছেন, প্রতি বছর বন্ড সুবিধার অপব্যবহার এবং চোরাইপথে আনা টেক্সটাইল পণ্যের পরিমাণ প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার হতে পারে। তিনি বলেন, “স্থানীয় বাজারে অ্যাপারেল চাহিদা ১২ বিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে আমরা সরবরাহ করতে পারছি মাত্র ৭ বিলিয়ন ডলার। বাকী ৫ বিলিয়ন ডলার বন্ড মিসইউজ এবং চোরাইপথে আসে।
সুতার দাম কমে যাওয়ায় মিলগুলো বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে এবং সরকারের রাজস্বও কমেছে। খোরশেদ আলম জানান, “ফেব্রুয়ারি থেকে ৫৩ কাউন্ট সুতার দাম প্রতি কেজি ৬০ টাকা কমেছে, এতে নিট ক্ষতি হয়েছে কেজি প্রতি ৪১ টাকা। শুধু নভেম্বর মাসেই একটি মিলের লোকসান হয়েছে ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা।
তিনি আরও বলেন, ভ্যাট আদায়ও কমেছে। “অক্টোবরে মিলটি ১৫ লাখ টাকা ভ্যাট দিয়েছিল, কিন্তু নভেম্বর মাসে বিক্রি কমে গিয়ে তা নেমে আসে ৮ লাখ টাকায়।”
বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধার অপব্যবহার এবং বিদেশি সস্তা ফেব্রিক ও সুতার চাপ দেশের টেক্সটাইল শিল্পের জন্য দানবীয় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। আমদানি সীমিত করলেও রপ্তানিকারকরা বিকল্প পথে বিদেশি কাঁচামাল আনবেন।
ফলস্বরূপ, স্থানীয় উৎপাদন রক্ষা কঠিন হয়ে উঠছে। সুতার দাম কমে যাওয়ায় মিলগুলো আর্থিকভাবে দুর্বল হচ্ছে, রাজস্ব ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং ভ্যাট আদায় কমছে। এক্ষেত্রে শুধুমাত্র নিয়ন্ত্রণ নয়, বিশেষ প্রণোদনা ও শুদ্ধ বন্ড ব্যবস্থাপনা ছাড়া টেক্সটাইল শিল্পের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

