পবিত্র রমজান মাস ঘনিয়ে এলেও ফলের বাজারে স্বস্তির কোনো আভাস নেই। ইফতারের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হলেও আপেল, মাল্টা, আঙুর ও নাশপাতির মতো বিদেশি ফল এখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।
উচ্চ শুল্ক ও ডলারের বাড়তি দামের চাপ একসঙ্গে পড়ায় এসব ফলের আমদানি কমেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাজারে। দাম বেড়েছে। কমেছে সরবরাহ। এই বাস্তবতায় ফলের বাজার স্থিতিশীল রাখা এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে দাম আনতে বিদেশি তাজা ফলে শুল্ক কমানোর চিন্তাভাবনা করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। আপেল, মাল্টা, নাশপাতি ও আঙুরজাতীয় ফলে সম্পূরক ও নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক কমানোর বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে এসব ফলে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও কমিশনের সামগ্রিক সুপারিশ ছিল প্রায় ৫০ শতাংশ শুল্ক কমানোর পক্ষে। ইতোমধ্যে চলতি সপ্তাহেই এ বিষয়ে একটি সুপারিশ প্রতিবেদন এনবিআর চেয়ারম্যানের কাছে পাঠিয়েছে ট্যারিফ কমিশন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাজা ফল আমদানিতে বিদ্যমান উচ্চ শুল্ক-কর কাঠামো স্বল্পমেয়াদে রাজস্ব বাড়ালেও দীর্ঘমেয়াদে এটি ভোক্তা স্বার্থের পরিপন্থী। একই সঙ্গে এটি অবৈধ আমদানি উৎসাহিত করে এবং ভবিষ্যতে রাজস্ব আহরণ ঝুঁকির মুখে ফেলে। তাই আইন, নীতিমালা ও বাস্তব বাজার পরিস্থিতির আলোকে শুল্কনীতি পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছে কমিশন।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশে আপেল, মাল্টা, আঙুর, নাশপাতি ও আনার মতো ফলের স্থানীয় উৎপাদন সীমিত। চাহিদা মেটাতে দীর্ঘদিন ধরেই আমদানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শুল্ক ও কর বাড়ায় তাজা ফল আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে ভোক্তা স্বার্থ, বাজারের স্থিতিশীলতা ও রাজস্ব আদায়ে।
সম্প্রতি তাজা ফল আমদানিতে সম্পূরক শুল্ক ৩০ শতাংশ এবং নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক ২০ শতাংশ আরোপের ফলে সামগ্রিক কর-শুল্কের বোঝা অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। বর্তমানে ৮৬ টাকা মূল্যের আপেল আমদানি করতে প্রায় ১০৫ টাকা শুল্ক ও কর পরিশোধ করতে হচ্ছে। অর্থাৎ পণ্যের মূল্যের চেয়েও করের অঙ্ক বেশি হয়ে যাচ্ছে। এতে আমদানিকারকদের ব্যয় বেড়েছে। খুচরা বাজারে দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে। সাধারণ মানুষের জন্য ফল কেনা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে।
চার অর্থবছরের আমদানি চিত্রে স্পষ্ট পতন ধরা পড়েছে। বর্তমানে এসব ফলে ১২১ দশমিক ৭৮ থেকে ১২৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক-ভ্যাট দিতে হচ্ছে। এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১–২২ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৪–২৫ অর্থবছরে আপেল আমদানি কমেছে প্রায় ৩৭ দশমিক ৩৫ শতাংশ। মাল্টা কমেছে ৪২ দশমিক ৭৭ শতাংশ। আঙুর কমেছে ৩৫ দশমিক ১১ শতাংশ। নাশপাতি কমেছে ২৪ দশমিক ৭০ শতাংশ। আনার আমদানি কমেছে প্রায় ৯৪ দশমিক ৩৮ শতাংশ।
পরিমাণের দিক থেকেও বড় ধরনের পতন দেখা যায়। ২০২১–২২ অর্থবছরে আপেল আমদানি হয়েছিল ২ লাখ ৫৮ হাজার ৩৪৩ টন। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে তা নেমে এসেছে ১ লাখ ৬১ হাজার ৮৬৩ মেট্রিক টনে। একই সময়ে মাল্টা ২ লাখ ৯৪ হাজার ৯৭৯ টন থেকে কমে হয়েছে ১ লাখ ৬৮ হাজার ৮২৫ টন। আঙুর ১ লাখ ৩৭ হাজার ৯৮২ টন থেকে কমে ৮৯ হাজার ৫৪১ টন। নাশপাতি ৯ হাজার ৯৫৯ টন থেকে কমে হয়েছে ৭ হাজার ৪৯৯ টন।
এর প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারে। রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে বর্তমানে প্রতি কেজি মাল্টা বিক্রি হচ্ছে ৩৫০ থেকে ৩৮০ টাকায়। কমলার দাম ৩২০ থেকে ৩৬০ টাকা। আঙুর বিক্রি হচ্ছে ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা কেজি দরে। আপেলের দাম ৩১০ থেকে ৩৫০ টাকা। নাশপাতি কিনতে হচ্ছে ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা কেজি দরে। ফলে অনেক ক্রেতাই কেজির বদলে এক বা দুই পিস ফল কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।
ট্যারিফ কমিশন মনে করে, উচ্চ শুল্ক বৈধ আমদানিকে নিরুৎসাহিত করছে। এতে সীমান্তপথে অবৈধ আমদানির ঝুঁকি বাড়ছে। একই সঙ্গে লোকসান পুষিয়ে নিতে কিছু ব্যবসায়ী ফল সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণে ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহারে ঝুঁকছেন। যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। কমিশনের মতে, স্বল্পমেয়াদে উচ্চ শুল্কে প্রতি ইউনিটে রাজস্ব বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদে আমদানি কমে যাওয়ায় সামগ্রিক রাজস্ব ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এ কারণেই কমিশনের সুপারিশে বলা হয়েছে, তাজা ফলের স্থানীয় উৎপাদন সীমিত হওয়ায় এসব পণ্যে অতিরিক্ত প্রতিরক্ষামূলক শুল্কের যৌক্তিকতা নেই। ৩০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক পুরোপুরি প্রত্যাহার বা যৌক্তিক হারে পুনর্নির্ধারণ করা যেতে পারে। একই সঙ্গে ২০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক কমানো বা বাতিলের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হয়েছে।
কমিশন আরও উল্লেখ করেছে, ২০২১ সালে তাজা ফলকে ‘বিলাস পণ্য’ হিসেবে বিবেচনা করে সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা হয়। অথচ অ্যাসেনশিয়াল কমোডিটিজ অ্যাক্ট, ১৯৫৬ অনুযায়ী তাজা ফল একটি অত্যাবশ্যকীয় খাদ্যপণ্য। ফলে খাদ্যপণ্যের ওপর অতিরিক্ত সম্পূরক শুল্ক আরোপ আইনগত ও নীতিগতভাবে পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে।
বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি সেলিমুল হক ইসা বলেন, সরকার রাজস্ব বাড়ানোর উদ্দেশ্যে বিদেশি ফলে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করেছে। এতে ফলের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। বাস্তবে রাজস্বও বাড়েনি।
কারণ আমদানি আশঙ্কাজনক হারে কমেছে। তিনি বলেন, বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে শুল্ক যৌক্তিক পর্যায়ে নামানো ছাড়া বিকল্প নেই। দেশে এসব ফল পর্যাপ্ত উৎপাদন হয় না। তাই শুল্ক না কমালে বাজার স্বাভাবিক হবে না। তিনি আরও জানান, ভারতে বিপুল উৎপাদন থাকা সত্ত্বেও বাজার স্বাভাবিক রাখতে ফল আমদানিতে শুল্ক কম রাখা হয়। বাংলাদেশেও একই বাস্তবসম্মত নীতি প্রয়োজন।
এ বিষয়ে এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ডলারের দাম বৃদ্ধি ও বাড়তি শুল্কের কারণে ২০২১–২২ থেকে ২০২৪–২৫ অর্থবছর পর্যন্ত তাজা ফল আমদানি ২৫ থেকে ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। অথচ বাজারে চাহিদা রয়ে গেছে। এই বাস্তবতা বিবেচনায় এনবিআরও বিদেশি তাজা ফল আমদানিতে শুল্ক কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানান তিনি।

