বাংলাদেশের রাজনীতি সাধারণত নির্বাচন, দলীয় সংঘাত বা বিদেশনীতি দিয়ে ব্যাখ্যা করা হয় কিন্তু বাস্তবে রাষ্ট্রক্ষমতার মূল চালিকা শক্তি এখন আর শুধু রাজনৈতিক দল নয়।
ক্ষমতার প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ গড়ে উঠেছে একটি ত্রিভুজ কাঠামোয়–
- বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও অবকাঠামো
- ব্যাংক খাত, অর্থ ও ঋণ
- ব্যালট, অর্থাৎ নির্বাচন ও প্রশাসন
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই তিন খাত একে অপরের সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত, যে এক খাতের পরিবর্তন অন্য দুই খাতকেও সরাসরি প্রভাবিত করে। ২০২৬ সালের নির্বাচন ঘিরে এই ত্রিভুজের ভারসাম্যই নির্ধারণ করবে রাষ্ট্রক্ষমতার ভবিষ্যৎ রূপরেখা। অর্থাৎ, রাজনীতি এখন কেবল চেহারা নয়, ক্ষমতার মূল চাবি হলো অর্থ ও অবকাঠামো।
বিদ্যুৎ: রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে ওঠা খাত:
গত এক দশকে বিদ্যুৎ খাত কেবল অবকাঠামো নয়। এটি এখন রাজনৈতিক অর্থনীতির প্রধান নিয়ন্ত্রক। দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহের নামে তৈরি ‘ভাড়াভিত্তিক কেন্দ্র’, এলএনজি নির্ভরতা এবং উচ্চ ক্যাপাসিটি চার্জ কাঠামো রাষ্ট্রকে দীর্ঘমেয়াদি দায়ে ফেলে দিয়েছে। প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে গিয়ে সরকার ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণ নেয়। বাজেট ঘাটতি বাড়ে, এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর বিদ্যুতের দাম চাপানো হয়। বিদ্যুতের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বাড়ে, খাদ্যের দাম বাড়ে, শিল্প উৎপাদনের খরচ বেড়ে যায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে ভোটে।
এভাবেই বিদ্যুৎ খাত রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে ওঠে। নির্বাচন সামনে রেখে সরকার দাম নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে, ভর্তুকি বাড়ায় এবং ব্যাংক থেকে ধার নেয়। কিন্তু এতে ব্যাংকিং খাতের চাপ বাড়ে, ডলার সঙ্কট তীব্র হয়। অর্থাৎ বিদ্যুৎ সংকট শেষ পর্যন্ত ব্যাংক ও ব্যালটের ওপর আঘাত করে। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিদ্যুৎ প্রকল্পের মালিকানা কাঠামো। অনেক প্রকল্পে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর অংশগ্রহণ আছে। ফলে বিদ্যুৎ খাত কেবল জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়, ক্ষমতাশালী গোষ্ঠীর অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার ক্ষেত্রও হয়ে উঠেছে।
ব্যাংক: অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের নীরব কেন্দ্র:
বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে খেলাপি ঋণ, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং দুর্বল নিয়ন্ত্রণের চাপে রয়েছে। বড় ঋণখেলাপিরা অনেক ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক আশ্রয়ে টিকে আছে। ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণ অনেক সময় শিল্পে বিনিয়োগ না হয়ে জমি, শেয়ারবাজার বা বিদেশে পাচার হয়।
নির্বাচনী বছরে ব্যাংক খাত আরও স্পর্শকাতর হয়ে ওঠে। সরকার উন্নয়ন ব্যয় ধরে রাখতে ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নেয়। রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনী ব্যয় মেটাতে ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর ওপর নির্ভর করে। বড় ব্যবসায়ীরা ব্যাংকের ঋণের পুনঃতফসিল সুবিধা আদায় করে। ফলে ব্যাংক হয়ে ওঠে রাজনৈতিক দরকষাকষির কেন্দ্রবিন্দু। কে ক্ষমতায় থাকবে, তার ওপর নির্ভর করে কার ঋণ মাফ হবে, কার মামলা ঝুলে থাকবে, কার প্রকল্প অনুমোদন পাবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ডলার সঙ্কট। আমদানি-নির্ভর অর্থনীতিতে ডলারের সরবরাহ কমলে এলএনজি, জ্বালানি ও খাদ্য আমদানি ব্যাহত হয়। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে, মূল্যস্ফীতি বাড়ে, রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়ে। অর্থাৎ ব্যাংকের ডলার ব্যবস্থাপনা সরাসরি ভোটের রাজনীতিকে প্রভাবিত করে।
ব্যালট: নির্বাচন নয়, রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ:
বাংলাদেশে নির্বাচন এখন আর কেবল জনগণের রায় নয়। এটি প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, আমলাতন্ত্র এবং অর্থনৈতিক শক্তির সম্মিলিত ব্যবস্থাপনা। কে নির্বাচনে টিকবে, কার মনোনয়ন বাতিল হবে, কোথায় প্রশাসন কতটা সক্রিয় থাকবে– এসব সিদ্ধান্তের পেছনে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক হিসাব কাজ করে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন আসনে প্রার্থিতা বাতিল, প্রশাসনিক বদলি, আইনগত জটিলতা– সবই ব্যালটকে একটি নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থায় পরিণত করেছে।
এখানে ব্যাংক ও বিদ্যুৎ খাত আবার ফিরে আসে। যেসব ব্যবসায়ী বিদ্যুৎ প্রকল্প বা ব্যাংক ঋণের সুবিধাভোগী, তাদের রাজনৈতিক আনুগত্য নির্বাচনী ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলে। নির্বাচনী অর্থায়ন, মিডিয়া প্রভাব, প্রশাসনিক লবিং– সব ক্ষেত্রেই অর্থনৈতিক শক্তি কার্যকর হয়।
ক্ষমতার ত্রিভুজ: বিদ্যুৎ, ব্যাংক, ব্যালট: বিদ্যুৎ, ব্যাংক ও ব্যালট খাত তিনটি একে অপরের সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত, যে আলাদা করে বিশ্লেষণ করলে পুরো বাস্তবতা ধরা পড়ে না।
উপাদান ও প্রভাব:
- বিদ্যুৎ: মূল্যস্ফীতি, শিল্প উৎপাদন, জীবনযাত্রার ব্যয়
- ব্যাংক: ঋণপ্রবাহ, ডলার সরবরাহ, ব্যবসার গতি
- ব্যালট: নীতি সিদ্ধান্ত, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ
বিদ্যুতের দাম বাড়লে জনগণের ক্ষোভ বেড়ে ভোটের ফল প্রভাবিত হয়। ব্যাংকের ডলার সঙ্কট হলে জ্বালানি আমদানি কমে, বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে এবং সংকট তৈরি হয়। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়লে ব্যাংক বিনিয়োগ কমায়, অর্থনীতি স্থবির হয়। এই চক্রই হলো বাংলাদেশের ক্ষমতার ত্রিভুজ। এক খাতের পরিবর্তন অন্য দুই খাতকেও সরাসরি প্রভাবিত করে।
আন্তর্জাতিক শক্তির প্রবেশ, ত্রিভুজে নতুন চাপ: বাংলাদেশের ক্ষমতার ত্রিভুজে এখন যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক শক্তির প্রভাব।
- এলএনজি বাজারে কাতার ও যুক্তরাষ্ট্র
- বিদ্যুৎ প্রকল্পে চীন ও জাপান
- ব্যাংকিং লেনদেনে ডলার ও আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থা
- নির্বাচনে পশ্চিমা গণতান্ত্রিক চাপ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা উদ্বেগ
রাষ্ট্র কোথায় আটকে যাচ্ছে? ক্ষমতার ত্রিভুজের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণ জনস্বার্থের বদলে গোষ্ঠীস্বার্থে বন্দী হয়ে পড়া।
- বিদ্যুৎ খাত: অদক্ষ চুক্তি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর ঋণের বোঝা চাপাচ্ছে
- ব্যাংক খাত: রাজনৈতিক আশ্রয় দুর্নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক করছে
- নির্বাচনী ব্যবস্থা: আস্থাহীনতা গণতন্ত্রকে দুর্বল করছে
ক্ষমতার ত্রিভুজ ভাঙবে কে? ২০২৬ সালের নির্বাচন কেবল সরকার পরিবর্তনের প্রশ্ন নয়। এটি নির্ধারণ করবে:
- বিদ্যুৎ খাতে স্বচ্ছতা আসবে কি না
- ব্যাংক খাতে জবাবদিহি ফিরবে কি না
- ব্যালটে জনগণের আস্থা পুনর্গঠিত হবে কি না
ত্রয়ীর যেকোনো একটিতে ব্যর্থতা অন্য দুই খাতকেও দুর্বল করে দেবে। রাষ্ট্র যদি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিকভাবে টেকসই হতে চায়, বিদ্যুৎ-ব্যাংক-ব্যালটের এই ক্ষমতার ত্রিভুজ ভাঙতেই হবে। নচেৎ নির্বাচন হবে কেবল ক্ষমতার হাতবদল, রাষ্ট্রের কাঠামোগত মুক্তি নয়।



ডেটা কী দেখাচ্ছে, খাতগুলোতে ঝুঁকি:
বিদ্যুৎ খাত: ক্যাপাসিটি চার্জের প্রায় ৯০% সময় পণ্য বা বিতরণ ভিত্তিক নয়। অর্থাৎ বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও অর্থ প্রদান হচ্ছে পাওনা হিসেবে। এর ফলে বাজেট ঘাটতি, বৈদেশিক রিজার্ভে চাপ এবং বিনিয়োগ প্রবাহ দুর্বল হচ্ছে।
ব্যাংকিং খাত: মোট খেলাপি ঋণ ব্যাংকিং খাতের প্রায় ২৫–২৭% এ পৌঁছেছে। মাত্র ১০টি ব্যাংকেই মোট খেলাপির ৭১% জমা রয়েছে। অর্থাৎ স্বল্প সংখ্যক ব্যাংক বড় ঝুঁকিতে।
নিয়ন্ত্রক ঝুঁকি: ব্যাংক ও নন-ব্যাংক ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশনে (এনবিএফআই) খেলাপি ঋণের মাত্রা অভাবনীয়। এর ফলে ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা ন্যূনতম স্তরে দাঁড়িয়েছে।

