বিদ্যুৎ কেন্দ্র, সার ও শিল্প কারখানায় গ্যাস সরবরাহের ঘাটতি শুরু হয় ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়। তখন দেশে নতুন জ্বালানি উৎস খুঁজে বের করার পরিবর্তে আমদানি করে সরবরাহ বজায় রাখার নীতি নেওয়া হয়। তবে অর্থ সংকটের কারণে এবং আমদানি বাড়াতে গিয়ে জ্বালানি পণ্যের দাম বারবার বৃদ্ধি পায়। আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং সরবরাহ চেইনে বিঘ্নও বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে চাপের মধ্যে ফেলে।
বর্তমানে দেশে গ্যাসের চাহিদা দৈনিক ৩৮০ কোটি ঘনফুট। সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ২৫৮ কোটি ঘনফুট। ফলে প্রতিদিন ঘাটতি দাঁড়াচ্ছে ১২২ কোটি ঘনফুট। তুলনায় ২০২৫ সালের ১০ জানুয়ারি সরবরাহ ছিল ২৭৫ কোটি ঘনফুট। এখনকার সরবরাহ আগের বছরের তুলনায় ১৭ কোটি ৬০ লাখ ঘনফুট কম।
মোহাম্মদপুরের নুরুল মোল্লা এন্টারপ্রাইজের গৃহিণী জোসনা বেগম জানান, “আজকেও গ্যাস নেই। তিন দিন ধরে ঘুরছি। কোথায় যাব দেখার কেউ নেই।” নাখালপাড়ার রুমান ১৩৫০ টাকায়ও সিলিন্ডার পাচ্ছেন না, দুই-চারটি পেলে ১,৬০০–১,৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দেশে দিনে ৫ হাজার টন এলপিজি লাগে। কয়েক দিন ধরে গড়ে ৪০০ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে।
দেশে ২৮টি কোম্পানি এলপিজি আমদানির অনুমতি পেয়েছে। তবু চাহিদা পূরণে ব্যর্থ। লোয়াব জানায়, ২৩টির অনুমোদন আছে, মূলত ছয়টি কোম্পানি বেশি আমদানি করে। কিছু কোম্পানি ধুঁকে ধুঁকে চলছে। ব্যাংক ঋণের কিস্তি দিতে পারছে না। অনুমোদিত বরাদ্দের চেয়ে কম আমদানি বা বাড়তি আমদানির অনুমতি না পাওয়ায় সংকট প্রকট। মোহাম্মদপুরের সোহেল এন্টারপ্রাইজের ম্যানেজার মাহবুব আলম জানান, “আগে ২–৩ গাড়িতে ১,৮০০–২,০০০ বোতল এলপিজি পাওয়া যেত। এখন ৫০০–৬০০ বোতলও পাওয়া যায় না।”
পেট্রোম্যাক্সের ডিলার আবদুল হক বলেন, “জানুয়ারি থেকে চরম সংকট চলছে। দিনে ৫০–৬০ বোতল বেশি পাওয়া যায় না। দাম ১,৩৫০ টাকা। সরকার নির্ধারিত ১,৩০৬ টাকায় বিক্রি করলে লোকসান হবে।” লোয়াব সেক্রেটারি জেনারেল আহসানুল জব্বার বলেন, “সরকার অনুমতি দিলে আমদানি বাড়ানো যেত। এভাবে অসাধু ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা ভোক্তাদের পকেট থেকে ১৭ কোটি টাকা প্রতিদিন বের করতে পারত না।”
বর্তমানে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১,৩০৬ টাকা। শীতের জন্য জাহাজভাড়া বৃদ্ধি, ইউরোপে জ্বালানির চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এবং সরবরাহ বিঘ্নের কারণে দাম বাড়ছে। লোয়াব আশা করছে চলতি মাসের ২০ তারিখের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় মজুদ ও সরবরাহ কমার সঙ্গে সঙ্গে কোম্পানিগুলোর উৎপাদনও কমছে। নতুন কূপ খনন করে গ্রিডে সংযোগ দেওয়া হলেও তা বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে না। সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন, প্রতিদিন গ্রিড থেকে ১৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস কমে যাচ্ছে।
দেশে গ্যাস উত্তোলনে স্থানীয় তিনটি কোম্পানির পাশাপাশি দুটি বিদেশী কোম্পানি নিয়োজিত। গত এক বছরে পাঁচটির মধ্যে চারটির উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে।
- বিজিএফসিএল ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৫,৩১৪ এমএমসিএম উৎপাদন করেছে, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরের ৫,৮৩৭ এমএমসিএমের তুলনায় ৫২৩ এমএমসিএম কম।
- এসজিএফএল ১,৩৯২ এমএমসিএম উৎপাদন করেছে, আগের বছরের তুলনায় সামান্য বেড়েছে।
- বাপেক্স ১,১৫৫ এমএমসিএম উৎপাদন করেছে, আগের বছরের ১,৩৩৪ এমএমসিএমের তুলনায় প্রায় ১৪% কম।
- শেভরন ১১,৩৬৮ এমএমসিএম উৎপাদন করেছে, যা আগের বছরের ১২,৪০৭ এমএমসিএমের তুলনায় কম।
- তাল্লোও কোম্পানির উৎপাদন ৩৬৯ এমএমসিএম, আগের বছরের ৪২১ এমএমসিএমের তুলনায় কম।
স্থানীয় উৎপাদনের ঘাটতি পূরণে জ্বালানি বিভাগ বিদেশ থেকে এলএনজি আমদানির পরিমাণ বাড়িয়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১১৫ কার্গো এলএনজি আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে, যার ব্যয় প্রাক্কলন ৫১,৫৪০ কোটি টাকা। তুলনায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এলএনজি আমদানির খরচ ছিল ৪০,৭৫২ কোটি টাকা। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারও পূর্বে বড় আকারে এলএনজি আমদানি করেছে।
দেশে দুটি এলএনজি টার্মিনাল রয়েছে, যা দৈনিক ১০০ কোটি ঘনফুট সরবরাহে সক্ষম। গ্যাস সংকট মেটাতে আরও অবকাঠামো প্রয়োজন। অন্তর্বর্তী সরকার নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে, তবে মাঠ পর্যায়ে কার্যক্রম এখনও শুরু হয়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি তৈরি হতে কমপক্ষে তিন বছর লাগবে। স্থানীয় উৎপাদন বাড়াতে দরপত্র আহ্বান করা হলেও বিদেশি কোম্পানি এতে অংশ নেয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও এ বিষয়ে অগ্রগতি হয়নি।
বিদেশী বিনিয়োগকারীরা দেশে বিনিয়োগের আগে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হতে চায়। তবে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতেও পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ নেই। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান গ্যাস সংকটের কারণে বন্ধ, অনেক কারখানা বছরে বেশির ভাগ সময় প্রয়োজনীয় চাপ পাচ্ছে না। উদ্যোক্তারা বলছেন, এতে রফতানিমুখী আয়ও নেতিবাচক প্রভাবিত হচ্ছে।
বাপেক্সের সাবেক এমডি মর্তুজা আহমদ ফারুক চিশতী বলেন, “সংকটের মূল কারণ গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে বিনিয়োগ না করা। দুই দশকের বেশি সময় ধরে যথাযথ বিনিয়োগ হয়নি। বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ, তাই বিদেশী প্রতিষ্ঠান অনিশ্চিত সরকারের ওপর ঝুঁকতে চায় না।”
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বদরুল ইমাম বলেন, “গ্যাস খাতে দ্রুত সমাধান নেই। একটি পদ্ধতি দরকার, যা নির্ধারিত সময়ে এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে পারবে। ব্যয়বহুল জ্বালানি দিয়ে অর্থনীতি ঠিক রাখা সম্ভব নয়।” অন্তর্বর্তী সরকারের সমন্বিত জ্বালানি পরিকল্পনায় তিন ধাপে খাত সাজানো হয়েছে, যা ২০২৬ থেকে ২০৫০ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হবে। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ৭০–৮০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন।
জ্বালানি বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, “সরকার গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে স্থানীয় উৎপাদন ও আমদানি দুটোই বাড়াবে। নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ ও ল্যান্ডবেইজ টার্মিনালের কার্যক্রম এগোচ্ছে। বাপেক্সসহ অন্যান্য কোম্পানি গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে কাজ করছে। দুটি নতুন রিগ কেনা হয়েছে এবং গভীর ড্রিলিং চলছে।”
শীর্ষ ব্যবসায়ী আজম জে চৌধুরী বলেন, “জ্বালানি খাত দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। গ্যাস খাত সবচেয়ে বেশি অবহেলিত ছিল। অন্তর্বর্তী সরকার ডিপ সিতে এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণে উদ্যোগ নিতেই দেরি হয়েছে। বর্তমানে এলপিজি সংকট তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা বা জাহাজ সমস্যা থাকলেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এটি পরবর্তী সরকারের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।

