দেশের অর্থনীতি বর্তমানে বহুমাত্রিক ঝুঁকির মুখে রয়েছে। বিনিয়োগ মন্দাকে সর্ববৃহৎ ও তাৎক্ষণিক ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্চ সুদহার, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং নীতিগত অস্পষ্টতার কারণে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ থমকে আছে। এই পরিস্থিতিতে নির্বাচন-পরবর্তী নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বিনিয়োগ ফিরিয়ে আনা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা।
সিপিডি আরও সুপারিশ করেছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, আর্থিক শৃঙ্খলা ফেরানো এবং ব্যাংক খাত সংস্কারে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। নীতিনির্ধারকদের জন্য অর্থনীতির ওপর সাতটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে সংস্থাটি।
গতকাল শনিবার ঢাকার ধানমন্ডিতে সিপিডির কার্যালয়ে ‘বাংলাদেশের অর্থনীতি ও নির্বাচনী বাঁকে বহুমাত্রিক ঝুঁকি’ শিরোনামে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। প্রতিবেদনের উপস্থাপনা করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সংস্থার সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান, গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমসহ অন্যান্য গবেষকরা।
ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, দেশের অর্থনৈতিক গতি বর্তমানে মন্থর। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হার গত ১০ বছরে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে, যা গভীর উদ্বেগের বিষয়। তিনি বলেন, বিনিয়োগের সব সূচকই নিচের দিকে নেমেছে। মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় বেসরকারি বিনিয়োগ আগের বছর যেখানে প্রায় ২৪ শতাংশ ছিল, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা নেমে এসেছে সাড়ে ২২ শতাংশে। বিদেশি বিনিয়োগও কমেছে। নিট বিদেশি বিনিয়োগ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২০১৮-১৯ অর্থবছর ছাড়া গত ১৬ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, বিনিয়োগ কমে যাওয়াই দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা। বিনিয়োগ না বাড়লে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে না। কর্মসংস্থান কমলে বেকারত্ব, বৈষম্য ও সামাজিক অস্থিরতা বাড়বে। এ পরিস্থিতি থেকে বের না হলে অর্থনীতির সংকট দীর্ঘস্থায়ী হবে।
সিপিডি বিশ্লেষণে জানিয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিনিয়োগ আরও দুর্বল হয়েছে। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও নীতিগত পরিবর্তনের কারণে বিনিয়োগকারীরা ‘অপেক্ষার’ নীতি অনুসরণ করছেন। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধিও কমছে। উচ্চ সুদহার, জ্বালানি সংকট ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে নতুন বিনিয়োগ কার্যত স্থবির। সংস্থার মতে, বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত না করে আর্থিক শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার করা।
ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের জন্য মূলধন সহায়তা হিসেবে দেওয়া ২০ হাজার কোটি টাকা এবং জ্বালানি খাতে দেওয়া আরও ২০ হাজার কোটি টাকা পরিশোধের চাপ চলতি বাজেটে পড়ছে। একই সঙ্গে সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হলে ব্যয়ের চাপ আরও বাড়বে। এই প্রেক্ষাপটে রাজস্ব আদায় বাড়াতে নতুন উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
সিপিডি মনে করে, অন্তর্বর্তী সরকার কিছু সংস্কার করলেও অর্থনীতির গতি ফেরাতে আরও সমন্বিত ও সাহসী পদক্ষেপ প্রয়োজন। নির্বাচনী চ্যালেঞ্জ নিয়ে ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, নির্বাচনে অর্থের অপব্যবহার রোধে নীতিমালা কঠোরভাবে মানা জরুরি।
ঋণের বোঝা বাড়ছে:
অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, দেশি ও বিদেশি ঋণের বোঝা দ্রুত বেড়ে চলেছে। সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও পেনশন এখনও ব্যয়ের বড় খাত হলেও ঋণের সুদ পরিশোধ এখন দ্বিতীয় বৃহত্তম ব্যয়ের খাত। এই প্রবণতা বাংলাদেশকে ধীরে ধীরে ঋণের ফাঁদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
তিনি বলেন, রাজস্ব ব্যয়ের বড় অংশই ব্যয় হয় বেতন, পেনশন, ঋণ পরিষেবা ও ভর্তুকিতে। এগুলো কমানো কঠিন। ফলে উন্নয়ন ব্যয় কমানোর ঝুঁকি তৈরি হয়, যা প্রবৃদ্ধিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই উন্নয়ন ব্যয় কমানো নয়, বরং প্রত্যক্ষ কর বাড়িয়ে রাজস্ব আয় বাড়ানোই টেকসই সমাধান।
বাজার ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি, বাড়ছে মূল্যস্ফীতি:
সিপিডির পর্যালোচনা অনুযায়ী, খাদ্য মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও খাদ্য-বহির্ভূত মূল্যস্ফীতি এখনও অনেক বেশি। চাল উৎপাদনে ঘাটতি না থাকলেও দাম বাড়ছে। একই চিত্র চিনি ও ভোজ্যতেলের ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
সিপিডি মনে করে, শুধু মুদ্রানীতির মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। সরবরাহ ব্যবস্থা সংস্কার, মজুতদারি রোধ এবং কার্যকর বাজার তদারকি এখন জাতীয় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।

