চ্যালেঞ্জিং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আর বৈশ্বিক লজিস্টিক জটিলতাকে পাশ কাটিয়ে ২০২৫ সালে সাফল্যের নতুন ইতিহাস গড়েছে দেশের অর্থনীতির হূিপণ্ড চট্টগ্রাম বন্দর। কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে ৩৪ লাখ টিইইউএসের মাইলফলক স্কর্শ করার পাশাপাশি ইতিহাসে প্রথমবারের মতো অর্জন করেছে কাঙ্ক্ষিত ‘জিরো ওয়েটিং টাইম’।
শুধু প্রবৃদ্ধিই নয়, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার মানদণ্ডে ‘জিরো অবজারভেশন’ লাভ এবং বে টার্মিনাল ও মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের মতো মেগাপ্রকল্পের অগ্রগতি চট্টগ্রাম বন্দরকে পরিণত করেছে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক হাবে। বন্দরের এই রূপান্তর, রাজস্ব আয় ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মুনিরুজ্জামান
প্রশ্ন: ২০২৫ সালে চট্টগ্রাম বন্দর ইতিহাসের সর্বোচ্চ উচ্চতায় পৌঁছেছে। এই সাফল্যের নেপথ্যের গল্পটি যদি বলেন?
এস এম মুনিরুজ্জামান: যদি শতাংশের হিসাবে বলি, কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে ৪.০৭ শতাংশ, কার্গো হ্যান্ডলিংয়ে ১১.৪৩ শতাংশ এবং জাহাজ হ্যান্ডলিংয়ে ১০.৫০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। মোট কার্গো হ্যান্ডলিং হয়েছে ১৩ কোটি ৮১ লাখ টনের বেশি। এ ছাড়া বাল্ক কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের ১৩.২০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি আমাদের সামগ্রিক পারফরম্যান্সকে অনেক উঁচুতে নিয়ে গেছে।
প্রশ্ন: বন্দরে আসার পর জাহাজগুলোকে আগে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হতো। বর্তমানে এই ‘ওয়েটিং টাইম’ বা অপেক্ষমাণ সময়ের অবস্থা কী?

প্রশ্ন: বন্দরের আধুনিকায়ন ও ডিজিটাল সেবা নিয়ে আপনাদের নতুন উদ্যোগগুলো কী কী?
এস এম মুনিরুজ্জামান: আমরা একটি ‘পেপারলেস’ বা কাগজবিহীন বন্দর বিনির্মাণের দিকে এগোচ্ছি। এখন টস (টিওএস) সিস্টেমের মাধ্যমে অনলাইন ই-গেট পাস ব্যবস্থাপনা চালু হয়েছে, যা ২৪ ঘণ্টা সচল থাকে। এর ফলে বন্দর এলাকায় যানজট কমেছে। এ ছাড়া গত ২৩ ডিসেম্বর এক দিনে সর্বোচ্চ ছয় হাজার ৭৬১টি গেট পাস ইস্যু করার রেকর্ড হয়েছে। এখন ব্যবহারকারীরা মোবাইল ফোন বা ল্যাপটপের মাধ্যমে যেকোনো জায়গা থেকে অপারেশনাল বিল পরিশোধ করতে পারছেন।
প্রশ্ন: জাতীয় অর্থনীতিতে চট্টগ্রাম বন্দরের আর্থিক অবদান সম্কর্কে কিছু বলুন।
এস এম মুনিরুজ্জামান: চট্টগ্রাম বন্দর দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। ২০২৫ পঞ্জিকাবর্ষে বন্দরের রাজস্ব আয় হয়েছে ৫৪৬০.১৮ কোটি টাকা, যা গত বছরের তুলনায় ৭.৫৫ শতাংশ বেশি। আমরা সরকারি কোষাগারে ১৮০৪.৪৭ কোটি টাকা প্রদান করেছি। গত পাঁচ বছরে জাতীয় কোষাগারে আমাদের মোট অবদানের পরিমাণ ১২৩৪৯.৫০ কোটি টাকা।
প্রশ্ন: নিরাপত্তার বিষয়ে আন্তর্জাতিক কোনো স্বীকৃতি কি আপনারা পেয়েছেন?
এস এম মুনিরুজ্জামান: হ্যাঁ, সম্ক্রতি ইউএস কোস্ট গার্ডের ইন্টারন্যাশনাল পোর্ট সিকিউরিটি (টিপিএস) দল আমাদের বন্দর পরিদর্শন করেছে। তাদের রিপোর্টে আমাদের কোনো বিচ্যুতি ধরা পড়েনি, অর্থাৎ আমরা সম্মানজনক ‘জিরো অবজারভেশন’ পেয়েছি, যা আমাদের ইতিহাসের এক গৌরবময় অর্জন।
প্রশ্ন: মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ও বে টার্মিনাল প্রকল্পের সর্বশেষ অগ্রগতি কী?
এস এম মুনিরুজ্জামান: মাতারবাড়ী বন্দর উন্নয়ন প্রকল্পটি আমাদের অন্যতম ফাস্ট ট্র্যাক প্রকল্প, যা আঞ্চলিক ট্রান্সশিপমেন্ট হাব হিসেবে কাজ করবে। সেখানে ড্রেজিংয়ের প্রস্তুতি চলছে। অন্যদিকে বে টার্মিনাল হবে দেশের প্রথম ‘গ্রিন পোর্ট’। এই প্রকল্পের মেরিন ইনফ্রাস্ট্রাকচারের জন্য বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে ৬৫০ মিলিয়ন ডলারের ঋণচুক্তি হয়েছে এবং শিগগিরই নির্মাণকাজ শুরু হবে।
প্রশ্ন: বন্দর ব্যবস্থাপনায় বেসরকারি অংশীদারি বা পিপিপি মডেল নিয়ে আপনাদের পরিকল্পনা কী?
এস এম মুনিরুজ্জামান: আমরা আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারি জোরদার করছি। লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার জন্য ডেনমার্কের এপিএম টার্মিনালস এবং পানগাঁও টার্মিনাল পরিচালনায় সুইজারল্যান্ডের মেডলগের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি সই হয়েছে।
প্রশ্ন: বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ইয়ার্ড এবং যন্ত্রপাতির আধুনিকায়ন নিয়ে বিশেষ কী কাজ হয়েছে?
এস এম মুনিরুজ্জামান: ক্রমবর্ধমান কন্টেইনারের চাপ সামলাতে ২০২৫ সালে আমরা ৭০ হাজার বর্গমিটার নতুন ইয়ার্ড নির্মাণ করেছি। এ ছাড়া অপারেশনাল গতি বাড়াতে রাজস্ব বাজেটের আওতায় ৩৫টি নতুন ইকুইপমেন্ট এবং নিজস্ব অর্থায়নে আরো ৮১টি ইকুইপমেন্ট সংগ্রহের প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ফোর হাই স্ট্র্যাডেল ক্যারিয়ার, মোবাইল ক্রেন এবং লগ হ্যান্ডলারের মতো ভারী ও আধুনিক যন্ত্রপাতি রয়েছে, যা আমাদের হ্যান্ডলিং সক্ষমতাকে আন্তর্জাতিক মানে নিয়ে গেছে।
প্রশ্ন: ডিজিটাল বন্দর হিসেবে আপনারা ‘ই-গেট পাস’ ব্যবস্থার কথা বলছিলেন। এতে ব্যবহারকারীরা কতটা উপকৃত হচ্ছে?
এস এম মুনিরুজ্জামান: এটি একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন। এখন ব্যবহারকারীরা সপ্তাহে সাত দিন, ২৪ ঘণ্টা যেকোনো স্থান থেকে অনলাইনে গেট পাস সংগ্রহ ও ফি পরিশোধ করতে পারছেন। এতে যেমন জালিয়াতির সুযোগ কমেছে, তেমনি স্বচ্ছতা বেড়েছে। আমাদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত কয়েক মাসে প্রতি মাসে গড়ে ৬০ হাজার থেকে ৬৫ হাজার গেট এন্ট্রি সম্কন্ন হচ্ছে, যা আমাদের ডিজিটাল অগ্রগতির প্রমাণ।
প্রশ্ন: চট্টগ্রাম ড্রাইডক লিমিটেড পরিচালিত পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালের পারফরম্যান্স কেমন?
এস এম মুনিরুজ্জামান: সেখানেও আমরা দারুণ সাফল্য পেয়েছি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসেই (জুলাই-ডিসেম্বর) ছয় লাখ ৯৮ হাজার ৬৬৮ টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ১০.১৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি। বিশেষ করে অক্টোবর মাসে ২০.১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে।
প্রশ্ন: বন্দরের বিভিন্ন চার্জ (যেমন—ইয়ার্ড রেন্ট, ডক লেবার চার্জ) বাড়ানোর বিষয়ে ব্যবসায়ীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সিপিএর অবস্থান কী?
এস এম মুনিরুজ্জামান: চট্টগ্রাম বন্দর দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর; এবং বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রায় ১২ শতাংশ চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মূল গেটওয়ে চট্টগ্রাম বন্দর। পরিবর্তিত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সেবা প্রদানের জন্য চট্টগ্রাম বন্দরকে নতুন নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে অবকাঠামোগত ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন করতে হচ্ছে। বন্দরের অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি বন্দরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, যন্ত্রপাতি ক্রয়, জ্বালানি ব্যয়, সাপোর্ট ভেসেল ক্রয়, চলাচল ও মেরামত ব্যয় বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়নে বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন। চট্টগ্রাম বন্দরের আয়ের মূল উৎস সেবা মাশুল বা ট্যারিফ। চট্টগ্রাম বন্দর দীর্ঘ প্রায় চার দশক ধরে, অর্থাৎ ১৯৮৬ সালের প্রণীত ট্যারিফের আওতায় বন্দর সেবা প্রদান করা হচ্ছিল। ফলে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বন্দরসমূহের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সময়োপযোগী ট্যারিফ হালনাগাদের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। তারই ধারাবাহিকতায় ২০২০ সালে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে স্কেনভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান M/S, IDOM Consulting, Engineering & Architecture, Bilbao, Spain কে নিয়োগ দেওয়া হয়।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক মূল্যস্ফীতি, আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রতিযোগিতা বিবেচনা করে দীর্ঘ ৪০ বছর পরে যথাবিহিত প্রক্রিয়া অবলম্বন ও বন্দর ব্যবহারকারীদের সঙ্গে আলাপের পর চট্টগ্রাম বন্দরের ট্যারিফ সরকার কর্তৃক পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্ধিত ট্যারিফে প্রতি কেজি পণ্যে ভোক্তা পর্যায়ে চট্টগ্রাম বন্দরের ট্যারিফের প্রভাব মাত্র ১২ পয়সা এবং প্রতি ১০০ টাকার পণ্যের মূল্যে ১৫ পয়সা।
নতুন ট্যারিফ কাঠামোর মাধ্যমে অর্জিত রাজস্ব উন্নত অবকাঠামো, কনটেইনার হ্যান্ডলিং সরঞ্জাম এবং বে টার্মিনাল, লালদিয়া টার্মিনাল সম্ক্রসারণে ব্যবহৃত হবে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। উন্নত সেবার মান নিশ্চিত হলে দেশের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে গতি আসবে, যা দীর্ঘ মেয়াদে ব্যবসায়ীদের খরচ কমাবে। নতুন ট্যারিফ কাঠামো দেশের ব্যবসায়ীসমাজকে কোনো ধরনের অযাচিত চাপের মধ্যে ফেলবে না। বর্তমান ট্যারিফ যৌক্তিক ও ন্যূনতম পরিসরে বৃদ্ধি করা হয়েছে। এই পরিবর্তন এমনভাবে প্রণয়ন করা হয়েছে, যাতে দেশের আমদানি-রপ্তানিকারকরা সাশ্রয়ী কাঠামোর মধ্যেই ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন।
পৃথিবীর প্রতিটি আন্তর্জাতিক বন্দরের প্রাতিষ্ঠানিক ট্যারিফ পলিসি রয়েছে এবং নির্দিষ্ট মেয়াদে পরিচালন ব্যয় বাজার ব্যবস্থা এবং প্রতিযোগিতা বিবেচনায় ট্যারিফ রিভিউ করা হয়। এরই মধ্যে চবক বোর্ড বাস্তবমুখী ট্যারিফ পলিসি প্রণয়নের জন্য আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। বাজারব্যবস্থা এবং প্রতিযোগিতা বিবেচনায় ট্যারিফ পলিসি নির্ধারণ করা হবে এবং সেই পলিসি মোতাবেক ভবিষ্যতে চবকের ট্যারিফ স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্ধারিত হবে।
ট্যারিফ বৃদ্ধির ফলে আন্তর্জাতিক টার্মিনাল অপারেটররা নির্মীয়মাণ বে টার্মিনাল, লালদিয়া টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ী ডিপ সি টার্মিনালে বিনিয়োগে আগ্রহী হবে। বন্দরকেন্দ্রিক বিনিয়োগ বৃদ্ধির ফলে সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনৈতিক গতিশীলতাও বৃদ্ধি পাবে। সূত্র: কালের কন্ঠ

