বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর) শিল্প খাতে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ বিতরণে উল্লেখযোগ্য বার্ষিক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। চলমান অর্থনৈতিক সমন্বয়ের মধ্যেও শিল্প খাতে বিনিয়োগের আগ্রহ ধীরে ধীরে বাড়ছে। তবে ঝুঁকি বিবেচনায় ব্যাংকগুলো এখনো সতর্ক অবস্থান বজায় রেখেছে।
এই তিন মাসে শিল্প খাতে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ বিতরণ হয়েছে ২৪৭ দশমিক ৭১ বিলিয়ন টাকা। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ অঙ্ক ছিল ২২১ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন টাকা। সে হিসাবে বছরে ঋণ বিতরণ বেড়েছে ১১ দশমিক ৮৬ শতাংশ। আগের প্রান্তিক এপ্রিল–জুনে বিতরণ হওয়া ২৪২ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন টাকার তুলনায়ও এবার ১ দশমিক ৯৬ শতাংশ বেশি ঋণ দেওয়া হয়েছে। এতে শিল্প খাতে ঋণ প্রবাহ ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত মিলছে।
অন্যদিকে, শিল্প ঋণ আদায়ে ইতিবাচক প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। জুলাই–সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে শিল্প খাতে ঋণ আদায় হয়েছে ২৮৯ দশমিক ২২ বিলিয়ন টাকা। আগের অর্থবছরের একই প্রান্তিকে আদায় হয়েছিল ২০৫ দশমিক ০৫ বিলিয়ন টাকা। ফলে বছরে আদায় বেড়েছে ৪১ দশমিক ০৬ শতাংশ। এতে বোঝা যায়, ঋণগ্রহীতাদের নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনায় কিছুটা উন্নতি হয়েছে।
পূর্ববর্তী প্রান্তিকগুলোর তথ্যেও এই ধারাবাহিকতা দেখা যাচ্ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের এপ্রিল–জুন প্রান্তিকে শিল্প ঋণ আদায় ছিল ২৭১ দশমিক ৮১ বিলিয়ন টাকা, যা জানুয়ারি–মার্চ প্রান্তিকের তুলনায় ২ দশমিক ৮২ শতাংশ বেশি। একই অর্থবছরের অক্টোবর–ডিসেম্বর প্রান্তিকে আদায় সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে ৩৩১ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন টাকায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে আরও দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিক শেষে ব্যাংকিং খাতে শিল্প ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ দশমিক ৯৯ ট্রিলিয়ন টাকা। এটি সামগ্রিক ঋণ হিসাব শিল্প খাতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার ইঙ্গিত দেয়।
ব্যাংকার ও বিশ্লেষকদের মতে, মাঝারি হারে ঋণ বিতরণ এবং শক্তিশালী আদায়—এই দুইয়ের সমন্বয় ব্যাংকগুলোর ঝুঁকিসচেতন ঋণনীতির প্রতিফলন। সম্পদের মান নিয়ে উদ্বেগ, উচ্চ সুদের হার এবং বেসরকারি বিনিয়োগের ধীরগতির কারণে ব্যাংকগুলো এখনও সাবধানতার সঙ্গে ঋণ দিচ্ছে। তাঁরা মনে করছেন, ঋণ আদায়ের ধারাবাহিক উন্নতি ব্যাংকগুলোর আর্থিক হিসাবপত্রের ওপর চাপ কমাতে সহায়ক হবে। পাশাপাশি এতে উৎপাদনমুখী শিল্প খাতে নতুন ঋণ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, কিছু খাতে ব্যবস্থাপনার ঘাটতি বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক এলপিজি সিলিন্ডার সংকট বাজার কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটিয়েছে এবং সাময়িকভাবে বিক্রি বন্ধ হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, নির্বাচনের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। এতে ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের আস্থা ফেরানো সম্ভব হবে।
বর্তমান চ্যালেঞ্জের মধ্যেও নতুন বিনিয়োগ পুরোপুরি থেমে নেই বলে উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বিনিয়োগের গতি ধীর হলেও তা অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক সংকেত এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখছে। তিনি আরও জানান, তৈরি পোশাক খাতের কিছু উদ্যোক্তা এখনও ভালো করছেন। বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ চাপের মধ্যেও তাঁদের অভিযোজন ক্ষমতা রপ্তানি আয় ও কর্মসংস্থান ধরে রাখতে সহায়তা করছে।

