নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত সময়সূচি অনুযায়ী জাতীয় নির্বাচন হলে আর মাত্র এক মাস পরই দায়িত্ব নেবে নতুন সরকার। ক্ষমতা গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গেই যে বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে, তার প্রথম ও সবচেয়ে দৃশ্যমান রূপ হবে রমজানের বাজার। কিন্তু এই বাজার নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জ আসলে কোনো সাময়িক চাপ নয়। এটি দেশের অর্থনীতিতে জমে থাকা বহুদিনের সংকটের প্রতিফলন—উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল সরবরাহব্যবস্থা, স্থবির বিনিয়োগ, রাজস্ব ঘাটতি, ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংক খাত এবং লাগামহীন সরকারি ব্যয়—সবকিছু মিলিয়েই নতুন সরকারের সামনে দাঁড়িয়ে আছে একটি জটিল অর্থনৈতিক সমীকরণ।
অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন সরকারকে একই সঙ্গে কঠিন আর্থিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রত্যাশার চাপও সামলাতে হবে। এই দুইয়ের ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নেওয়া কিছু নীতিগত ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নির্বাচিত সরকারের জন্য বাড়তি বোঝা তৈরি করেছে। রাজস্ব আদায়ে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি, অথচ সরকারি পরিচালন ব্যয় ক্রমাগত বেড়েছে। ফলে সামষ্টিক অর্থনীতির ভারসাম্য ধরে রাখা এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মূল্যস্ফীতি ও রমজান বাজার নতুন সরকারের প্রথম পরীক্ষা
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, গত নভেম্বর মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে কিছুটা ওঠানামা হলেও মূল্যস্ফীতি আট শতাংশের ঘরেই আটকে আছে। সামনে রমজান মাস আসায় খাদ্যপণ্যের দামে নতুন করে চাপ বাড়ার আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা। ফলে নতুন সরকারের জন্য রমজান বাজারই হয়ে উঠতে পারে প্রথম বড় ধাক্কা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি ব্যয় বাড়ানোর চাপ, বেতন-ভাতা বৃদ্ধির প্রত্যাশা এবং বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে। একদিকে বাজারে সরবরাহ নিশ্চিত করা ও সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ, অন্যদিকে ব্যয় সংকোচন—এই দুই বিপরীত চাপ একসঙ্গে সামলানো নতুন সরকারের জন্য সহজ হবে না।
পরিচালন ব্যয় বাড়ছে উন্নয়ন ব্যয় থমকে আছে
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সরকারি পরিচালন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। জনপ্রশাসনে সাধারণ ও ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি, বিভিন্ন ভাতা বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং একাধিক নতুন কমিটি ও উদ্যোগের কারণে ব্যয়ের চাপ তৈরি হয়েছে। এর পাশাপাশি নতুন বেতন কমিশন গঠনের আলোচনা সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে বেতন বৃদ্ধির প্রত্যাশা তৈরি করেছে, যা ভবিষ্যতে ব্যয় আরও বাড়াতে পারে।
অন্যদিকে উন্নয়ন ব্যয়ে দেখা যাচ্ছে স্পষ্ট স্থবিরতা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন হয়েছে বরাদ্দের মাত্র ৬৭ দশমিক ৮৫ শতাংশ, যা দেড় দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে এডিপি বাস্তবায়নের হার মাত্র ১১ দশমিক ৭৫ শতাংশ। এর প্রভাব পড়েছে কর্মসংস্থান, অভ্যন্তরীণ চাহিদা এবং সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির ওপর।
কর্মসংস্থান সংকট ও বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা
দেশের বিভিন্ন বড় শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কর্মসংস্থান কমেছে। নতুন বিনিয়োগ না আসায় বেকারের সংখ্যাও বাড়ছে। বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি।
সাবেক অর্থসচিব মাহবুব আহমেদ মনে করেন, জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়ানো ছাড়া কর্মসংস্থান বাড়ানো সম্ভব নয়। তাঁর মতে, সরকারি ও বেসরকারি—উভয় ধরনের বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। কিন্তু বিনিয়োগ বাড়াতে হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, প্রশাসনিক জটিলতা কমানো এবং নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি, যা বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় সহজ কাজ নয়।
রাজস্ব ঘাটতি ও ঋণের চাপ
২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি হয়েছে প্রায় ৯২ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের লক্ষ্যমাত্রা ৪ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা হলেও প্রথম পাঁচ মাসেই ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২৪ হাজার কোটি টাকার বেশি।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল মজিদের মতে, রাজস্ব বোর্ড পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত থাকলেও বাস্তবায়নের সুস্পষ্ট রোডম্যাপ না থাকায় কাঙ্ক্ষিত সংস্কার হয়নি। ফলে নিম্ন করভিত্তি, অস্বচ্ছ প্রশাসন ও দুর্বল কর প্রয়োগ ব্যবস্থার মধ্যেই রাজস্ব আদায় করতে হচ্ছে, যা নতুন সরকারের জন্য বড় বাধা হয়ে থাকবে।
ব্যাংক খাতের উত্তরাধিকার ঝুঁকি
ব্যাংক খাতের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। খেলাপি ঋণের পরিমাণ ইতোমধ্যে ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, যা মোট ঋণের ৩৬ শতাংশের বেশি। ১৭টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৫০ শতাংশের ওপরে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সমস্যাগ্রস্ত ইসলামী ব্যাংকগুলো একীভূত করে নতুন ব্যাংক গঠন এবং সেখানে সরকারের প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার মূলধন সহায়তা।
এই পরিস্থিতিতে ব্যাংক খাতকে স্থিতিশীল করা, আমানতকারীদের আস্থা ফেরানো এবং খেলাপি ঋণ আদায় নিশ্চিত করা নতুন সরকারের জন্য একটি কঠিন আর্থিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিনিয়োগ ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণই মূল চ্যালেঞ্জ
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের মতে, পরবর্তী সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বিনিয়োগ পুনরুদ্ধার এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, বিনিয়োগ না বাড়লে কর্মসংস্থান বাড়বে না, মানুষের প্রকৃত আয় বাড়বে না এবং বৈষম্য আরও গভীর হবে।
তার মতে, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, অবকাঠামোগত দুর্বলতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, কর ব্যবস্থার চাপ, উচ্চ সুদহার, চুক্তি বাস্তবায়নের দুর্বলতা এবং জ্বালানি সংকট বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের রেখে যাওয়া অর্থনৈতিক চিত্র
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কিছু সূচকে স্বস্তির ইঙ্গিত মিলেছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়তে শুরু করেছে, বিনিময় হার তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল হয়েছে এবং হুন্ডি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে। তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দেড় বছরে পুরো অর্থনীতি পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়। সংস্কারের যে সূচনা হয়েছে, তার ধারাবাহিকতা বজায় রাখাই হবে নতুন সরকারের বড় দায়িত্ব।
ঋণফাঁদের ঝুঁকি ও কাঠামোগত মূল্যস্ফীতি
সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. মুস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, জাতীয় বাজেটে ঋণ পরিশোধ এখন দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যয়ের খাতে পরিণত হয়েছে, যা শিক্ষা খাতকেও ছাড়িয়ে গেছে। এতে ঋণফাঁদের ঝুঁকি বাড়ছে।
তার মতে, বর্তমান মূল্যস্ফীতি সাময়িক নয়, এটি কাঠামোগত রূপ নিয়েছে। শুধু মুদ্রানীতি কঠোর করে খাদ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। সরবরাহ ব্যবস্থার সংস্কার, বাজার তদারকি শক্তিশালী করা এবং প্রভাবশালী সিন্ডিকেট ভাঙার মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
বিশ্ববাজারের দাম কমলেও দেশের বাজারে প্রভাব নেই
বিশ্ববাজারে চাল, চিনি ও ভোজ্যতেলের দাম কমলেও দেশের বাজারে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। উৎপাদনে ঘাটতি না থাকলেও চালের দাম উচ্চই রয়ে গেছে। সিপিডির মতে, বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কারণে ভোক্তারা আন্তর্জাতিক বাজারের সুফল পাচ্ছেন না।
নতুন সরকারের সামনে কোন অর্থনীতি
সব মিলিয়ে নতুন সরকার এমন একটি অর্থনীতি উত্তরাধিকার হিসেবে পাচ্ছে, যেখানে একদিকে রিজার্ভ ও বিনিময় হারে কিছুটা স্থিতিশীলতা এসেছে, অন্যদিকে রয়েছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কম বিনিয়োগ, বড় রাজস্ব ঘাটতি, ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংক খাত এবং বাড়তে থাকা সামাজিক প্রত্যাশা।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই বাস্তবতায় নতুন সরকারের সামনে মূল প্রশ্ন একটাই—রাজনৈতিক বাস্তবতা ও সামাজিক চাপের মধ্যে ভারসাম্য রেখে কি কঠিন সংস্কার বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে, নাকি অর্থনীতি আরও দীর্ঘ অনিশ্চয়তার পথে এগোবে।

