দেশের আনাচে–কানাচে অবৈধ সিগারেটের ব্যবসা এখন আর গোপন কোনো বিষয় নয়। টং দোকান পেরিয়ে এই সিগারেট পৌঁছে গেছে ফেরিওয়ালার ঝুলিতে। এমনকি ঘরে বসেই অর্ডার দিয়ে সিগারেট পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে অনলাইনে। ফেসবুক পেজ, ওয়েবসাইট আর মোবাইল নম্বরের মাধ্যমে চলছে রমরমা বেচাকেনা। দিনে দিনে এই অনলাইন অবৈধ বাজার আরও বিস্তৃত হচ্ছে।
কিন্তু এই অবৈধ অনলাইন সিগারেট বাণিজ্য বন্ধে কার্যত অসহায় বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বলছে, অবৈধ সিগারেটের কারণে সরকার প্রতিবছর অন্তত ১০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে। বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিলে এই ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা সংশ্লিষ্টদের।
এনবিআর কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে অবৈধ তামাক ব্যবসা এখন আর সাধারণ চোরাচালান বা নকল পণ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এর পেছনে রয়েছে সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র, যারা উৎপাদন, সরবরাহ ও বিক্রির পুরো একটি সমান্তরাল ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। বিশেষ করে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে এই চক্র খুব সহজেই ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে সম্প্রতি অনলাইনে অবৈধ সিগারেট বিক্রির সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন ফেসবুক পেজ, ওয়েবসাইটের লিংক ও ফোন নম্বর বন্ধ করতে বিটিআরসিকে অনুরোধ জানায় এনবিআর। তবে বিটিআরসি জানিয়ে দেয়, তাদের হাতে এ বিষয়ে সরাসরি ব্যবস্থা নেওয়ার আইনগত ক্ষমতা নেই।
বিটিআরসির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশের আওতায় তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপত্তিকর কনটেন্ট মডারেশন এবং ওয়েবসাইট ব্লক বা আনব্লক করে থাকে। কিন্তু অবৈধ সিগারেট ব্যবসা পরিচালনাকারীদের পরিচয় শনাক্ত করা বা তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ার বিটিআরসির নেই। এ কারণে বিটিআরসি এনবিআরকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দিয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিটিআরসির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, সারা দেশে অনলাইনে অবৈধভাবে সিগারেট ও ই-সিগারেট বিক্রি বন্ধের মূল দায়িত্ব মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের। এই সংস্থাগুলো নিষিদ্ধ ওয়েবসাইট বা অনলাইন প্ল্যাটফর্মের সুনির্দিষ্ট তালিকা পাঠালে বিটিআরসি সেগুলো ব্লক করতে পারে। তবে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে কোনো ওয়েবসাইট খুঁজে বের করা বা নিয়মিত মনিটরিং করার আইনগত ক্ষমতা তাদের নেই। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, বৈধ-অবৈধ যাচাইয়ের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের, বিটিআরসির নয়।
এ ছাড়া অনলাইন প্ল্যাটফর্ম বন্ধ করতে গিয়ে বড় ধরনের কারিগরি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয় বলেও জানান ওই কর্মকর্তা। বেশির ভাগ ওয়েবসাইটই বিদেশি সার্ভারে হোস্ট করা থাকে। ফলে পুরো ডোমেইন বন্ধ করা সম্ভব হয় না। বাংলাদেশে শুধু স্থানীয় নেটওয়ার্কে প্রবেশ সীমিত করা যায়। কিন্তু ভিপিএন ব্যবহার করলে সেই নিষিদ্ধ ওয়েবসাইট আবারও সহজেই দেখা যায়।
গবেষণা তথ্য বলছে, গত বছরের তুলনায় দেশে অবৈধ তামাক বাজার প্রায় ৩১ শতাংশ বেড়েছে। প্রতি মাসে বাজারে প্রবেশ করছে প্রায় ৮৩২ মিলিয়ন শলাকা অবৈধ সিগারেট। এই বিশাল অবৈধ বাজারের বড় অংশই বিভিন্ন বেআইনি উপায়ে উৎপাদিত। চোরাচালানের মাধ্যমে আসা এসব সিগারেট কোনো ধরনের শুল্ক পরিশোধ ছাড়াই দেশের বাজারে ঢুকে পড়ছে।
বাংলাদেশে বিদেশি সিগারেট গোপন চ্যানেলে ঢুকে পড়ছে মূলত প্রায় ৬০০ শতাংশ আমদানি শুল্ক ফাঁকি দিয়ে। ফলে এসব সিগারেট বাজারে তুলনামূলকভাবে অনেক সস্তায় বিক্রি হচ্ছে। কম দামের কারণে এই অবৈধ সিগারেট দ্রুতই নিম্ন আয়ের মানুষ ও তরুণদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে ধূমপানের হারের ওপর, যা ক্রমাগত বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈধ সিগারেটের দাম যখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে, তখন অবৈধ ও সস্তা সিগারেট এক ধরনের ‘ফাঁদ’ হিসেবে কাজ করছে। এতে একদিকে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকির মুখে পড়ছে, অন্যদিকে সরকার বিপুল রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
এনবিআর সূত্র জানায়, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে তামাক খাত থেকে সরকারের রাজস্ব আদায় হয়েছে ৪০ হাজার ৪১১ কোটি টাকা। অথচ ২০০৫ সালে এই খাত থেকে রাজস্ব আয় ছিল মাত্র দুই হাজার ৮৮৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ দুই দশকে তামাক খাতে রাজস্ব আদায় বেড়েছে প্রায় ৩৮ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু একই সময়ে অবৈধ সিগারেট বিক্রি যেভাবে বেড়েছে, তাতে সরকারের যে পরিমাণ রাজস্ব পাওয়ার কথা ছিল, তার বড় অংশই অধরাই থেকে যাচ্ছে।
সব মিলিয়ে, অবৈধ সিগারেটের বিস্তার এখন শুধু রাজস্ব হারানোর বিষয় নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, আইনশৃঙ্খলা ও ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার বড় এক চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই অবৈধ বাজার নিয়ন্ত্রণে আনা যে কঠিন—সেই বাস্তবতাই দিন দিন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

