পুরো একটি অর্থবছর পেরিয়ে গেলেও ১১০টি উন্নয়ন প্রকল্পে খরচ হয়নি এক টাকাও। অথচ এসব প্রকল্পের বিপরীতে বরাদ্দ ছিল ২ হাজার ৪৫৯ কোটি ৮১ লাখ টাকা। অর্থবছর শেষে পুরো বরাদ্দই ফেরত গেছে। এতে প্রকল্পগুলোর মেয়াদ বাড়া ও ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা কিছু ক্ষেত্রে বাস্তব কার্যক্রমের দাবি করলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি উন্নয়ন কার্যক্রমের গভীর সংকটের স্পষ্ট চিত্র।
বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যালোচনা প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
এ বিষয়ে সাবেক পরিকল্পনা সচিব মামুন-আল-রশীদ মঙ্গলবার বলেন, এসব প্রকল্পে অর্থ ও সময় অপচয়ের শতভাগ আশঙ্কা রয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়ন দেরি হলে পণ্য ও সেবার দাম বাড়ে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও বদলি হয়ে যান। ফলে সময় ও ব্যয় বাড়াটাই স্বাভাবিক। তাঁর মতে, প্রতিবেদনটি উন্নয়ন কার্যক্রমের দুরবস্থাই তুলে ধরেছে। এখানে যেমন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে, তেমনি পরিকল্পনা কমিশনও তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেনি।
তিনি বলেন, প্রতি তিন মাস অন্তর পরিকল্পনা উপদেষ্টার সভাপতিত্বে এডিপি অগ্রগতি পর্যালোচনা সভা হয়। সেখানে সব সচিব উপস্থিত থাকেন। এসব সভায় প্রকল্পগুলোর গভীর বিশ্লেষণ করে জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে প্রতিবছর একই চিত্র দেখা যেত না।
মামুন-আল-রশীদ আরও বলেন, আইএমইডির হাতে প্রতিবেদন তৈরির ক্ষমতা থাকলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নেই। বাধ্যবাধকতা না থাকায় মন্ত্রণালয়গুলোও এসব প্রতিবেদনকে গুরুত্ব দেয় না। এতে একটি প্রশাসনিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে। এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে প্রকল্প বাস্তবায়নে শৃঙ্খলা ফেরানো জরুরি।
প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, এমন চিত্র নতুন নয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৮০টি প্রকল্পে খরচ হয়নি এক টাকাও। সেসব প্রকল্পে বরাদ্দ ছিল ২ হাজার ৬২৩ কোটি ১০ লাখ টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১০৭টি প্রকল্পে বরাদ্দ ছিল ১ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে ৯৪টি প্রকল্পে বরাদ্দ ছিল ১ হাজার ৪ কোটি টাকা। ২০২০-২১ অর্থবছরে ৯০টি প্রকল্পে বরাদ্দ ছিল ১ হাজার ৭৮৯ কোটি টাকা। এসব ক্ষেত্রেই খরচ হয়নি এক টাকাও।
আইএমইডির একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, দেরিতে অর্থছাড়, ভূমি অধিগ্রহণের জটিলতা, দরপত্র আহ্বানে বিলম্ব, দরপত্র রেসপনসিভ না হওয়া, অপ্রতুল বরাদ্দ, মামলা সংক্রান্ত জটিলতা, ডিপিপি সংশোধন ও অনুমোদনে দেরি এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরে বিলম্বের কারণে প্রকল্পগুলো এগোতে পারেনি।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে শূন্য আর্থিক অগ্রগতির প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে গুলশান-বারিধারা লেক উন্নয়ন প্রকল্প এবং কক্সবাজার-বান্দরবান অঞ্চলে কমপ্রিহেনসিভ এনভায়রনমেন্টাল ইমপ্যাক্ট অ্যান্ড ড্যামেজ অ্যাসেসমেন্ট প্রকল্প। আরও আছে যমুনা নদী টেকসই ব্যবস্থাপনা ফেজ-১, গুলশানে জাতীয় অতিথিশালা নির্মাণ এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে ছয়টি পূর্ণাঙ্গ টেলিভিশন কেন্দ্র স্থাপন প্রকল্প।
এ ছাড়া মাদারীপুর ও নওগাঁয় আধুনিক স্টিল সাইলো নির্মাণ, লাঙ্গলবন্দে পুণ্যস্নান স্থান উন্নয়ন এবং তিন পার্বত্য জেলায় দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পেও ব্যয় হয়নি এক টাকাও। চুনকুড়ি সেতু নির্মাণ, বান্দরবান সড়ক বিভাগের তিনটি সড়ক উন্নয়ন, খুলনা শিপইয়ার্ড সড়ক উন্নয়ন ও প্রশস্তকরণ এবং কক্সবাজারে অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণ প্রকল্পও রয়েছে তালিকায়।
এ তালিকায় আরও রয়েছে ঝিনাইদহ জেলায় আবাসিক প্লট উন্নয়ন, চট্টগ্রামের মীরসরাই উপজেলায় নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য আবাসিক প্লট তৈরি, হবিগঞ্জ জেলায় একই ধরনের প্রকল্প এবং ইজিপ্টে বাংলাদেশ চ্যান্সারি ভবন নির্মাণ। পাশাপাশি ময়মনসিংহ জোনের গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক মহাসড়ক উন্নয়ন, লেবুখালী-বাউফল-গলাচিপা সেতু নির্মাণ, বগুড়া শহর থেকে মেডিকেল কলেজ পর্যন্ত লিংক রোড নির্মাণ, মাদ্রাসা শিক্ষা ভবন নির্মাণ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন আর্টস অনুষদ ভবন এবং চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড সায়েন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ক্যাম্পাস প্রকল্পেও কোনো ব্যয় হয়নি।

