মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীদের জন্য বড় স্বস্তির খবর এসেছে নতুন বছরের শুরুতেই। সরকার স্মার্টফোন ও এর যন্ত্রাংশ আমদানিতে বিদ্যমান কাস্টমস ডিউটি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে। স্মার্টফোন আমদানির ওপর শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। খাত-সংশ্লিষ্টদের মতে, এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে দেশের বাজারে স্মার্টফোনের দাম গড়ে ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে।
এই সিদ্ধান্ত শুধু সাধারণ ক্রেতাদের জন্যই নয়, বরং পুরো মোবাইল ফোন বাজারের কাঠামো বদলে দিতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বর্তমানে দেশের বাজারে মূলত দুই ধরনের মোবাইল ফোন পাওয়া যায়। একদিকে রয়েছে বৈধ পথে আমদানি করা অফিসিয়াল হ্যান্ডসেট। অন্যদিকে আছে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আনা ফোন, নকল সেট কিংবা পুরোনো ফোন সংস্কার করে নতুন হিসেবে বিক্রি করা হ্যান্ডসেট। এসব ফোন সাধারণত “আনঅফিসিয়াল” নামে পরিচিত এবং অনেক ক্ষেত্রে আসল ফোনের অর্ধেক দামে বাজারে বিক্রি হয়।
এই অবৈধ হ্যান্ডসেটগুলো নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরেই সরকার এগুলোর ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নিচ্ছিল। সেই ধারাবাহিকতায় চলতি মাসে চালু করা হয়েছে ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) সিস্টেম। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে অবৈধ ফোন শনাক্ত করে ধীরে ধীরে নেটওয়ার্কের বাইরে রাখার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
তবে এনইআইআর চালুর আগেই মোবাইল ফোন ব্যবসায়ীরা আন্দোলনে নামেন। দোকান বন্ধ, রাস্তা অবরোধসহ নানা কর্মসূচি পালন করে তারা দাবি করেন, এই ব্যবস্থা কার্যকর হলে বৈধ স্মার্টফোনের দাম বেড়ে যাবে এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাবে।
ব্যবসায়ীদের আন্দোলনের পর টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং টেলিযোগাযোগ বিভাগ যৌথভাবে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনায় বসে। আলোচনায় বৈধ হ্যান্ডসেটের দাম কমিয়ে আনার লক্ষ্যে শুল্ক ও কর কাঠামো পুনর্বিন্যাসের আশ্বাস দেওয়া হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় ১ জানুয়ারি উপদেষ্টা পরিষদের সভায় মোবাইল ফোনে শুল্ক ছাড় দেওয়ার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়। সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই গতকাল স্মার্টফোন আমদানির কাস্টমস ডিউটি ১৫ শতাংশ কমানো হয়েছে।
এনবিআরের ভাষ্য অনুযায়ী, এই সিদ্ধান্তের সরাসরি প্রভাব পড়বে বাজারদরের ওপর এবং আমদানি করা প্রতিটি বৈধ স্মার্টফোনের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।
একজন মোবাইল ফোন প্রস্তুত ও আমদানিকারক ব্যবসায়ী জানান, বর্তমানে একটি হ্যান্ডসেটের ওপর সব মিলিয়ে প্রায় ৬১ শতাংশ ভ্যাট ও কর আরোপ রয়েছে। কাস্টমস ডিউটি ১৫ শতাংশ কমায় মোট ভ্যাট-ট্যাক্স কাঠামোতে এর প্রভাব পড়বে প্রায় ২০ শতাংশ।
তার হিসাবে, বর্তমানে ৪০ হাজার টাকা দামের একটি স্মার্টফোনের দাম প্রায় ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত কমতে পারে।
এনবিআরের হিসাবও প্রায় একই রকম। সংস্থাটি জানিয়েছে, নতুন শুল্ক কাঠামোর ফলে ৩০ হাজার টাকার বেশি মূল্যের প্রতিটি আমদানি করা স্মার্টফোনের দাম সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত কমতে পারে।
এনবিআরের আশা, এই সিদ্ধান্তের ফলে ব্যবসায়ীরা বৈধ পথে ফোন আমদানিতে আরও আগ্রহী হবেন এবং ধীরে ধীরে বাজারে অবৈধ হ্যান্ডসেটের পরিমাণ কমে আসবে।
শুধু আমদানিকৃত ফোন নয়, দেশীয় মোবাইল সংযোজন শিল্পকেও শুল্ক ছাড়ের আওতায় আনা হয়েছে। এনবিআর জানিয়েছে, দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যেন আমদানিকৃত ফোনের সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতায় না পড়ে, সে জন্য মোবাইল ফোন সংযোজনের কাঁচামাল ও উপকরণ আমদানিতে কাস্টমস ডিউটি ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে।
এর ফলে দেশে সংযোজিত মোবাইল ফোন তৈরির খরচ কমবে। এনবিআরের হিসাব অনুযায়ী, দেশে সংযোজিত ৩০ হাজার টাকার বেশি মূল্যের একটি মোবাইল ফোনের দাম গড়ে দেড় হাজার টাকা কমতে পারে।
বর্তমানে দেশে ৯টি মোবাইল ফোন প্রস্তুতকারী ও সংযোজনকারী কোম্পানি কার্যক্রম চালাচ্ছে। নতুন শুল্ক কাঠামো তাদের উৎপাদন ও প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়াবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্লেষকদের মতে, এনইআইআর সিস্টেম চালু করে অবৈধ ফোন নিয়ন্ত্রণ এবং একই সঙ্গে বৈধ ফোনের দাম কমানোর এই যুগপৎ সিদ্ধান্ত বাজারে একটি ভারসাম্য তৈরি করতে পারে। একদিকে যেমন গ্রাহকরা কম দামে বৈধ স্মার্টফোন কিনতে পারবেন, অন্যদিকে সরকার রাজস্ব আদায় ও নিরাপত্তা—দুই দিকই সামলাতে পারবে।

