দেশের ১১টি ব্যাংকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর এস এম মনিরুজ্জামানের নামে ১৫৯টি অ্যাকাউন্টের তথ্য মিলেছে। এসব হিসাবের মাধ্যমে ৩৯ কোটি ১০ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে। বর্তমানে হিসাবগুলোর মোট স্থিতি এক কোটি ৮০ লাখ টাকা।
২০২১ সালে ইসলামী ব্যাংকে মনিরুজ্জামান একটি অ্যাকাউন্ট খোলেন। সেখানে দুই কোটি টাকা জমা হয় তাঁর চাকরি শেষ হওয়ার প্রায় আট মাস পর। পে-অর্ডারের মাধ্যমে এই অর্থ আসে এস আলম ভেজিটেবল অয়েলের অ্যাকাউন্ট থেকে। আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রতিবেদনে এই লেনদেনকে সন্দেহজনক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অবসর নেওয়ার পর ২৭ মাস মনিরুজ্জামান এস আলমের মালিকানাধীন এসএস পাওয়ারে কর্মরত ছিলেন।
বিএফআইইউ জানিয়েছে, একজন সাবেক ডেপুটি গভর্নরের নামে এতসংখ্যক এফডিআর হিসাব থাকা এবং কোটি কোটি টাকার লেনদেন সন্দেহজনক। তারা এই তথ্য দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) পাঠিয়ে আরও তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে। বিএফআইইউর পরিদর্শনে অনিয়ম ধরা পড়লেও তারা সরাসরি আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারে না।
মনিরুজ্জামানকে ২০১৬ সালের নভেম্বরে প্রথম ধাপে তিন বছরের জন্য এবং পরে ৬২ বছর বয়স পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত ডেপুটি গভর্নরের পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। তাঁর চুক্তির মেয়াদ ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর শেষ হয়।
বিএফআইইউর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২১ সালের ১৭ আগস্ট তিনি ইসলামী ব্যাংকের গুলশান সার্কেল-১ শাখায় একটি সঞ্চয়ী হিসাব খোলেন। পরদিন, ১৯ আগস্ট, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের চট্টগ্রামের জুবিলি রোড শাখা থেকে এস আলম ভেজিটেবল অয়েলের নামে পরিচালিত হিসাব থেকে মনিরুজ্জামানের জন্য দুই কোটি টাকার পে-অর্ডার ইস্যু করা হয়। ২৩ আগস্ট পে-অর্ডারটি ব্যাংক থেকে ছাড় করা হয়। ২৪ আগস্ট তিনি ইসলামী ব্যাংকের ওই শাখায় ৭০ লাখ টাকার দুটি এবং ৬০ লাখ টাকার একটি এফডিআর করেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এস আলম ভেজিটেবল অয়েলের অ্যাকাউন্ট থেকে মনিরুজ্জামানের অ্যাকাউন্টে অর্থ জমার কারণ জানা যায়নি। এটি সন্দেহজনক লেনদেন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তিন মাস পর, ওই হিসাব থেকে এসএস পাওয়ারের অ্যাকাউন্টে অর্থ জমা হতে থাকে। ২৭ মাসে মোট এক কোটি ৬৩ লাখ টাকা জমা হয়। এর মধ্যে বেতন হিসেবে দেওয়া হয় এক কোটি ৩৮ লাখ টাকা এবং গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণে খরচ হয় ২৫ লাখ টাকা।
বিএফআইইউর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মনিরুজ্জামান বাংলাদেশ ব্যাংকের চাকরি শেষ করার পর এসএস পাওয়ারে যোগদান করেছেন। প্রতিষ্ঠানটির ৭০ শতাংশ মালিকানা এস আলম গ্রুপের এবং বাকি ৩০ শতাংশ দুটি চীনা কোম্পানির। ২০২৩ সালের মার্চে প্রাইম ব্যাংকের গুলশান শাখায় মনিরুজ্জামানের নামে একটি সঞ্চয়ী হিসাব খোলা হয়। হিসাব খোলার দিনই সাত লাখ টাকা জমা করা হয় এবং সঙ্গে সঙ্গে একটি এফডিআর করা হয়। পরবর্তীতে এই হিসাবেও বিপুল লেনদেন হয়েছে, যা সন্দেহজনক বলে চিহ্নিত।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, ২০১৬ সালে মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে দুদক তদন্ত শুরু করে। পরে তিনি দুদকের ছাড়পত্র পান এবং ২০১৬ সালের ৪ ডিসেম্বর ডেপুটি গভর্নর হিসেবে যোগ দেন। ২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারি ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ এস আলম গ্রুপের হাতে চলে যায়। সেই সময়ে মনিরুজ্জামান বিশেষ নির্দেশনা দিয়ে পরিদর্শন কার্যক্রম বন্ধ করেন। তিনি তখন ব্যাংকের পরিদর্শন বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে অনিয়ম ও দুর্নীতি কমাতে ক্যাশলেস লেনদেনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
এস এম মনিরুজ্জামান বলেন, তিনি এস আলমের কাছে একটি বাড়ি বিক্রির বিপরীতে দুই কোটি টাকা পেয়েছিলেন। এর অর্থ এস আলম ভেজিটেবল অয়েলের হিসাব থেকে তাঁর অ্যাকাউন্টে এসেছে। তিনি বলেন, বাড়ি বিক্রির বিষয়টি ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন।
মনিরুজ্জামান অ্যাকাউন্টে ২০২১ সালের আগস্টে দুই কোটি টাকা জমার পর নভেম্বর থেকে এস আলমের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে তিনি চাকরি শুরু করেন। তিনি বলেন, ‘কমার্শিয়াল অ্যাডভাইজার হিসেবে চাকরি করেছি। কোনো অনৈতিক সুবিধা নেই।’ ১৫৯টি অ্যাকাউন্টে ৩৯ কোটি টাকার বেশি লেনদেন বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এত অ্যাকাউন্ট নেই। তবে বিভিন্ন সময়ে এফডিআর খুলেছি। সবই ট্যাক্স ফাইলে আছে।’

