দেশে কৃষিজমির পরিমাণ প্রতিদিনই কমছে। প্রায় ৫৬ শতাংশ জমি উৎপাদনশীলভাবে ব্যবহার হচ্ছে না। ৪০ শতাংশ কৃষক পরিবার ভূমিহীন বর্গাচাষী। দেশের অর্ধেক কৃষক যথাযথ মজুরি পান না। একদিকে যাদের হাতে বেশি জমি, তারা কৃষিকাজে মনোযোগ দিচ্ছে না। অন্যদিকে কৃষি উৎপাদনের খরচ বাড়ছে কিন্তু কৃষক ফসলের উপযুক্ত দাম পাচ্ছেন না।
অনেক কৃষক নির্ভরশীল বহুজাতিক কোম্পানির ওপর। উৎপাদনশীলতা বাড়াতে যান্ত্রিকীকরণ এখনও পিছিয়ে। অর্থনৈতিক সংস্কারবিষয়ক টাস্কফোর্স অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে জমা দেয়া প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, কৃষি খাতের উৎপাদনশীলতা ও প্রবৃদ্ধি কমছে। এর ফলে খাদ্যশস্য আমদানি বাড়ছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো প্রথাগত কৃষিকে পিছনে ফেলে প্রযুক্তি নির্ভর চাষাবাদে এগোচ্ছে। তারা ড্রোন, স্মার্ট সেচ এবং উন্নত অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করছে। একই সঙ্গে টেকসই চাষাবাদ ও ডিজিটাল সরঞ্জামের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে। এসব সম্ভব হয়েছে সময়মতো নীতি সংস্কার ও সরকারি সহায়তার মাধ্যমে।
১৯৮৮ সালে ইউএনডিপি ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ উদ্যোগে কৃষি খাতের পর্যালোচনা (রিভিউ) করা হয়। ১৯৯০ সালেও অর্থনীতি রিভিউ করা হয়। উভয় প্রতিবেদনে কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও ফসল বৈচিত্র্যকরণের সুপারিশ ছিল।
১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এসব সুপারিশ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়। সেচ সম্প্রসারণ, উন্নত বীজ ও সার ব্যবস্থাপনা, গবেষণা ও সম্প্রসারণ কার্যক্রম জোরদার করা হয়। কৃষিকে প্রযুক্তিনির্ভর করার প্রচেষ্টা শুরু হয়। বেসরকারি খাতকে সেচ, সার আমদানি ও বিতরণে যুক্ত করা হয়। এতে সার সংকট অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আসে। সারের প্রাপ্যতা বাড়ায় কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমে।
তবে ১৯৯০ সালের পর ৩৫ বছর কেটে গেছে, অথচ কৃষি খাত সংস্কারে আর কোনো বড় উদ্যোগ দেখা যায়নি। কৃষিনির্ভর দেশগুলো প্রযুক্তি নির্ভর চাষাবাদে এগোচ্ছে কিন্তু বাংলাদেশ পুরনো সমস্যায় ভুগছে। বিশেষজ্ঞরা আশা করেছিলেন, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার কৃষি খাতের জন্য কমিশন গঠন করবে। কিন্তু ১১টি সংস্কার কমিশনের মধ্যে কৃষি খাতকে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় খাদ্যশস্য আমদানিও বেড়েছে। গত পাঁচ দশকে কৃষিতে প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ শতাংশ। গত অর্থবছরে এটি ২ শতাংশের নিচে নেমেছে। নীতিসহায়তার অভাবে কৃষি সংশ্লিষ্ট শিল্প খাতও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
ভূমি বণ্টনে বৈষম্য এখনো বিরাজ করছে। আইএফপিআরআই-এর তথ্য অনুযায়ী, ৫৬ শতাংশ গ্রামীণ পরিবারের কোনো জমি নেই। শূন্য দশমিক ৫ একরের কম জমির মালিক প্রান্তিক চাষীর হার ৪১ শতাংশ। প্রতি বছর কৃষিজমি প্রায় ০.২ শতাংশ কমছে। একদিকে জমি কমছে, অন্যদিকে জলবায়ুর অভিঘাতে উৎপাদনও কমছে। বিনিয়োগের অভাবে আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।
কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণ, সার, বীজ ও কীটনাশকের জন্য আমদানির ওপর নির্ভরতা এখনও বেশি। সেচ যন্ত্রের ৮০ শতাংশ বিদেশ থেকে আসে। কৃষি গবেষণার উন্নয়নও প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃষি খাতের জন্য সময়মতো সংস্কার জরুরি।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “১৯৮৮ ও ১৯৯০ সালে কৃষি খাতের পর্যালোচনা হয়েছে। এরপর বহু বছর পেরিয়েছে। পরিবর্তনগুলো ধারণের জন্য একটি সংস্কার কমিশন দরকার ছিল। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার তা করেনি।” তিনি মনে করেন, নির্বাচনের পর নতুন সরকার কৃষি সংস্কার কমিশন গঠন করবে এবং মাঠ থেকে জাতীয় পর্যায়ে পর্যালোচনা করে সুপারিশ করবে।
কৃষিতে আমদানিনির্ভরতা কমানো যায়নি। পর্যাপ্ত উৎপাদন না হওয়ায় খাদ্যশস্য আমদানি করতে হচ্ছে। বীজ ও কীটনাশকও এখনো আমদানির ওপর নির্ভরশীল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে চাল ও গম আমদানিতে ব্যয় হয় ২০৬ কোটি ডলার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এটি বেড়ে ২৩১ কোটি ডলার। ডালের আমদানিও ৩৪.৪ শতাংশ বাড়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এএইচএম সাইফুল ইসলাম বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কাল সীমিত। তবে কৃষিকে অন্যান্য খাতের তুলনায় যতটা গুরুত্ব দেওয়া দরকার ছিল, তা দেওয়া হয়নি। খাদ্য নিরাপত্তার জন্য স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে কৃষিকে গুরুত্ব দিতে হবে।”
বীজের আমদানিও বেশি। পাটের ৭০ শতাংশ, ভুট্টার ৯০ শতাংশ, সবজির ৬০ শতাংশ, হাইব্রিড ধানের ২০ শতাংশ এবং তেলবীজ ও মসলা বীজের ৮০ শতাংশ আমদানির ওপর নির্ভর। দেশে উৎপাদিত না হওয়া বীজ আমদানির মাধ্যমে গবেষণা ও উৎপাদনে মনোযোগ দিতে হবে।
কীটনাশকও আমদানির ওপর নির্ভর। দেশে ব্যবহৃত ৯০ শতাংশের বেশি কীটনাশক আমদানি করতে হয়। বিদেশী কীটনাশকের শুল্ক ৫ শতাংশ, দেশীয় কাঁচামালে ৫৮ শতাংশ। নীতিসহায়তার অভাবে স্থানীয় শিল্প বিকশিত হয়নি।
সার সংকট নিয়ন্ত্রণে আসলেও, গত মৌসুমে কৃষকরা সার ও সবজির উপযুক্ত মূল্য না পাওয়ায় আন্দোলন করেছেন। আলুর হিমাগার মূল্য ২২ টাকা নির্ধারণ হলেও বাস্তবায়ন হয়নি। কৃষক এখনো লোকসান ভোগ করছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আব্দুর রহিম বহুবার ফোনে সাড়া দেননি।
২০৫০ সালের লক্ষ্য অনুযায়ী অন্তর্বর্তী সরকার কৃষির জন্য দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান বলেন, “এই খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”

