দেশের অধিকাংশ মানুষ এখনও উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে রয়েছেন। বিশ্ববাজারে নিত্যপণ্য ও জ্বালানির দাম কমলেও দেশীয় বাজারে এর প্রভাব তেমন পড়ছে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র পাঁচ মাসেই তিন দফায় নীতি সুদহার ৫০ বেসিস পয়েন্ট করে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ নির্ধারণ করেছেন। গত এক বছরে নীতি সুদ হার স্থিতিশীল থাকলেও মূল্যস্ফীতি অনেকটা কমেনি। অন্যদিকে উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে ব্যবসা করতে পারছেন না উদ্যোক্তারা। ফলে বিনিয়োগ কমে গেছে। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধিও সর্বনিম্ন অবস্থায়, যা গত নভেম্বরে ৬.৫৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে ২৯ জানুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংক চলতি অর্থবছরের শেষ ছয় মাসের জন্য মুদ্রানীতি ঘোষণা করবে। এই মুদ্রানীতি থেকে জানা যাবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যাংক ঋণের সুদ আরও বাড়বে কি না, বাজারে টাকার সরবরাহ বাড়বে বা লাগাম টানা হবে, এবং বিনিয়োগ স্থবিরতা কাটাতে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হবে কি না।
অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও ব্যাংকাররা এখন মুদ্রানীতির দিকে নজর রাখছেন। গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, মূল্যস্ফীতি কমিয়ে জনগণকে স্বস্তি দেওয়া হবে। তিনি তিন দফায় নীতি সুদ বাড়িয়ে বাজারে টাকার সরবরাহ কমিয়েছেন। তবুও মূল্যস্ফীতির ‘পাগলা ঘোড়া’ নিয়ন্ত্রণে খুব বেশি সফল হননি।
মুদ্রানীতি হলো বাজারে টাকার সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের নীতি। টাকা সরবরাহ বাড়াতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতি সুদের হার কমিয়ে দেয়। এতে ঋণ সহজ হয়, মানুষের হাতে বেশি টাকা যায়। আবার বাজারে অর্থ কমাতে সুদহার বাড়িয়ে ব্যাংক টাকা নিজের কাছে রাখে। এই দুটি পদ্ধতি মূলত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যবহৃত হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল দায়িত্ব হলো সঠিক মুদ্রানীতি প্রণয়নের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা। গত এক বছর ধরে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। নীতি সুদ বাড়িয়ে অতিরিক্ত চাহিদা ও অর্থের সঞ্চালন কমিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করা হয় কিন্তু বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও শক্তিশালী সিন্ডিকেটের প্রভাবের কারণে তেমন কার্যকর হয়নি। সিন্ডিকেট কৃত্রিমভাবে পণ্যের দাম বাড়িয়ে অতিরিক্ত মুনাফা করছে। তাই কিছু অর্থনীতিবিদ মনে করেন, টাকার সরবরাহ না কমিয়ে বাজার ব্যবস্থাপনার দিকে বেশি মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। ব্যবসায়ীরা মনে করেন, ঋণের সুদ কমানো জরুরি।
ড. মুস্তফা কে. মুজেরী বলেন, অর্থনীতিকে গাড়ির ইঞ্জিনের সঙ্গে তুলনা করলে নীতি সুদ হলো ব্রেক। ইঞ্জিন অতিরিক্ত গরম হলে ব্রেক চেপে গতি নিয়ন্ত্রণ করা হয়। কিন্তু বাজার ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি থাকলে কেবল ব্রেক চাপেই নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। দীর্ঘ সময় ধরে ঋণের উচ্চ সুদ ব্যবসায়ীদের খরচ বাড়াচ্ছে। ফলে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি মনে করেন, বর্তমানে সুদ অপরিবর্তিত রাখা এবং বাজার তদারকি ও সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়নে জোর দেওয়া উচিত।
ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, মূল্যস্ফীতি ও বিনিয়োগ স্থবিরতা বর্তমানে প্রধান সমস্যা। ঋণের সুদ কমানো ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। রাজস্ব নীতির সঙ্গে সমন্বয় করে বাজার তদারকিও জোরদার করতে হবে।
জাতীয় বাজেটে মূল্যস্ফীতি কমিয়ে ৬.৫ শতাংশে আনার লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও তা কাঙ্ক্ষিত হয়নি। সংশোধিত বাজেটে লক্ষ্য ৭ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো জানায়, গত ডিসেম্বরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৮.৪৯ শতাংশে পৌঁছেছে। এক বছরে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ঘরেই রয়েছে। ২০২৫ সালে গড় মূল্যস্ফীতি ৮.৭৭ শতাংশ হয়েছে।
মুদ্রানীতির জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে বৈঠক শুরু করেছে। গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর জানিয়েছেন, নীতি সুদ অপরিবর্তিত রাখা হবে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, উন্নত দেশে কার্যকর হলেও বাংলাদেশের বাস্তবতায় সুদ বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্ব দিতে হবে। সুদ কমিয়ে ও ব্যবসায়ীদের হয়রানি বন্ধ করে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
ডিসিসিআই সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদ বলেন, উন্নত দেশে সুদ বাড়িয়ে ভোগ ব্যয় কমানো যায়। কিন্তু বাংলাদেশে ৮৫ শতাংশ ঋণ ব্যবসায়িক, তাই উচ্চ সুদে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে গেছে। বিনিয়োগ না হলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে যাবে।
বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ব্যবসায়ীরা নতুন নতুন ‘টোল’ বা সুদের বাধার সম্মুখীন। ১৫ শতাংশ সুদে ব্যবসা করা সম্ভব নয়। ব্যাংকগুলো রপ্তানিকারকদের বিভিন্ন ফান্ডেও সুদ নিচ্ছে। ঋণের কিস্তি ও খেলাপি ঋণ নীতি ব্যবসায়ীদের ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরদারি বাড়ানোর ও খেলাপি ঋণের নীতি প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন।
অভিজ্ঞ ব্যাংকার মোহাম্মদ নূরুল আমিন বলেন, নিত্যপণ্য আমদানির কয়েকটি বড় কোম্পানির কারণে দাম হঠাৎ বেড়ে যাচ্ছে। এসব নিয়ন্ত্রণ করা গেলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কম, যা দেশের ৮০ শতাংশ অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর। মুদ্রানীতিতে এ বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথমার্ধে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৭.২ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে, যা আগের তুলনায় কম। এর আগের মুদ্রানীতিতে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯.৮ শতাংশ।

