দেশীয় সুতা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ সুরক্ষায় কটন সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা বাতিল বা প্রত্যাহারের সুপারিশ করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের সুপারিশ বিবেচনায় নিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দিয়েছে মন্ত্রণালয়।
আজ রোববার (১৮ জানুয়ারি) এনবিআরের কাস্টমস নীতি বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করেন। এনবিআর চেয়ারম্যান বরাবর পাঠানো চিঠির সূত্রে জানা যায়, চলতি মাসের ৬ জানুয়ারি স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ হিসেবে ১০ থেকে ৩০ কাউন্ট সুতা আমদানিকে বন্ড সুবিধার বাইরে রাখার সুপারিশ করা হয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় দেশীয় সুতা উৎপাদন খাত রক্ষায় ওই সুপারিশে সমর্থন দিয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে রপ্তানি পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা অব্যাহত রাখা এবং স্থানীয় শিল্প, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সংরক্ষণের স্বার্থে বাংলাদেশ কাস্টমস ট্যারিফের আওতায় ১০ থেকে ৩০ কাউন্ট কটন সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করা জরুরি। পাশাপাশি আমদানি বিল অব এন্ট্রিতে বাণিজ্যিক বর্ণনায় কটন সুতার কাউন্ট স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে সব কাস্টম হাউসকে নির্দেশনা দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৪ শতাংশ আসে টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস খাত থেকে। এর মধ্যে প্রায় ৫৫ শতাংশ রপ্তানি আয় হয় নিট গার্মেন্টস খাত থেকে। রপ্তানি খাতকে উৎসাহিত করতে সরকার আশির দশক থেকে এ শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে বন্ড সুবিধার আওতায় শুল্কমুক্ত সুবিধা দিয়ে আসছে। নিট গার্মেন্টস শিল্পে কাঁচামাল হিসেবে সুতা এই বন্ড সুবিধায় আমদানি হয়ে থাকে।
তৈরি পোশাক শিল্পের রপ্তানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশীয় উদ্যোক্তারা প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প গড়ে তুলেছেন। এর মাধ্যমে সুতা ও কাপড় উৎপাদনের অবকাঠামো তৈরি হয়েছে এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে দেশীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো কটন সুতা ও ব্লেন্ডেড ইয়ার্ন সরবরাহের মাধ্যমে দেশের সামগ্রিক চাহিদা পূরণে সক্ষম।
সূত্র জানায়, নিট গার্মেন্টস শিল্পে ব্যবহৃত সুতার বড় একটি অংশ দেশীয় উৎপাদনকারীরা সরবরাহ করতে পারছেন। পার্শ্ববর্তী দেশে ৩০ কাউন্টের প্রতি কেজি সুতার ন্যূনতম মূল্য ২.৯৩ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশের উৎপাদন খরচের কাছাকাছি। দেশের স্থানীয় বাজারে প্রতি কেজি সুতা বিক্রি হচ্ছে প্রায় ২.৮৫ মার্কিন ডলারে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে পার্শ্ববর্তী দেশগুলো এই খাতে সহায়ক শিল্পনীতি গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে কম দামে জমি বরাদ্দ, বিক্রয়ের ওপর আয়কর অব্যাহতি, দক্ষতা উন্নয়নে বিশেষ আর্থিক সুবিধা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন রয়েছে। এসব কারণে তারা প্রতি কেজি সুতায় প্রায় ৩০ সেন্ট সমপরিমাণ সহায়তা পাচ্ছে। ফলে উৎপাদন খরচের তুলনায় ৩০ থেকে ৩৮ সেন্ট কম দামে, অর্থাৎ গড়ে ২.৫০ থেকে ২.৬০ মার্কিন ডলারে বাংলাদেশে সুতা রপ্তানি করতে পারছে।
অন্যদিকে স্থানীয় উৎপাদনকারীরা উৎপাদন দক্ষতা বাড়িয়ে খরচ কমানোর চেষ্টা করলেও প্রণোদনাপ্রাপ্ত বিদেশি দামের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছেন না। এতে দেশীয় উদ্যোক্তারা আর্থিক চাপের মুখে পড়ছেন এবং তাদের বিনিয়োগ ঝুঁকিতে পড়ছে।
বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত দুই অর্থবছরে বন্ড সুবিধায় সুতা আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর ফলে দেশীয়ভাবে উৎপাদিত সুতার বিক্রি কমে গেছে। বর্তমানে অনেক সুতা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার মাত্র ৬০ শতাংশ ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে। এতে শিল্পখাতটি বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।
ইতোমধ্যে দেশীয় প্রায় ৫০টি বড় সুতা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানা গেছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে আরও প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। উদ্যোক্তারা মনে করছেন, এতে নিকট ভবিষ্যতে নিট গার্মেন্টস শিল্প আমদানিনির্ভর হয়ে পড়তে পারে।
এর ফলে গার্মেন্টস শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা কমে যাওয়া, লিড টাইম বৃদ্ধি, মূল্য সংযোজন হ্রাস এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ তৈরির ঝুঁকি রয়েছে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে জরুরি ভিত্তিতে ১০ থেকে ৩০ কাউন্ট সুতা আমদানিকে বন্ড সুবিধার বাইরে রাখার সুপারিশ করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

