চট্টগ্রাম বন্দরে খালাসের পর ইস্টার্ন রিফাইনারির শোর ট্যাংকে নেওয়ার সময় প্রায় ১৪ কোটি টাকার ক্রুড অয়েল উধাও হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি) বলছে, দুটি জ্বালানি তেলবাহী জাহাজ থেকে খালাসের পুরো প্রক্রিয়ায় অস্বাভাবিক শর্ট লেন্ডিং হয়েছে। তবে এ অভিযোগ মানতে নারাজ ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসি (ইআরএল)।
চট্টগ্রাম বন্দরের তথ্য অনুযায়ী, সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাস আল খাইমা বন্দর থেকে ৯৯ হাজার ৮৯৩ টন ক্রুড অয়েল নিয়ে ‘নরডিক ফ্রিডম’ জাহাজটি ২০২৫ সালের ৪ অক্টোবর সকাল ৯টা ৪০ মিনিটে কুতুবদিয়া অ্যাংকরে পৌঁছায়। একইভাবে, ২০২৫ সালের ২৪ মার্চ সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ১ লাখ ৯ হাজার ৭৪১ টন ক্রুড অয়েল নিয়ে ‘নরডিক স্কিয়ার’ জাহাজটি বাংলাদেশে আসে। বিএসসি জানায়, কর্ণফুলী নদীর পতেঙ্গা ডলফিন জেটি থেকে ইস্টার্ন রিফাইনারির শোর ট্যাংকের দূরত্ব মাত্র ১ দশমিক ৮ কিলোমিটার। অথচ এই অল্প দূরত্বেই দুই জাহাজের ক্রুড অয়েল খালাসে প্রায় পৌনে ১৪ কোটি টাকার তেল কমে গেছে।
যেভাবে হিসাব মিলছে না:
খালাস সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও বিএসসির তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিদেশি লোডিং পোর্টে জাহাজে তেল তোলার সময় পরিমাপ করে হ্যাজ সিল করে দেওয়া হয়। এই পরিমাণকে বিল অব লেডিং বা বিএল ধরা হয়। দুই জাহাজে বিএল অনুযায়ী মোট ক্রুড অয়েলের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৯ হাজার ৫৮৪ দশমিক ০৯০ টন।
দেশে পৌঁছানোর পর কুতুবদিয়া অ্যাংকরে জাহাজ মালিক, সরবরাহকারী ও গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের যৌথ সার্ভেতে পাওয়া যায় ২ লাখ ৯ হাজার ১৩৬ দশমিক ৫৯০ টন। এরপর মাদার ভ্যাসেল থেকে লাইটার জাহাজে করে পতেঙ্গা ডলফিন জেটিতে নেওয়ার সময় যৌথ সার্ভেতে পরিমাপ হয় ২ লাখ ১০ হাজার ৮৯৭ দশমিক ১১২ টন।
কিন্তু ডলফিন জেটি থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে ইআরএলের শোর ট্যাংকে নেওয়ার পর পরিমাপে পাওয়া যায় মাত্র ২ লাখ ৭ হাজার ২২১ দশমিক ৯৪৬ টন। জ্বালানি তেল পরিবহন ও স্থানান্তরের সময় তাপমাত্রাজনিত কারণে কিছু পার্থক্য হতে পারে। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী এটি যৌথ সার্ভেতে হিসাব করা হয়। বিপিসির ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য সর্বোচ্চ ওশান লস ধরা হয় শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ।
কোটি টাকার ক্ষতির হিসাব:
বিএসসির হিসাবে, বিএল পরিমাণ থেকে শোর ট্যাংকে নেওয়া পর্যন্ত দুই জাহাজে মোট শর্ট লেন্ডিং হয়েছে ২ হাজার ৩৬২ দশমিক ১৪৪ টন। ওশান লস বাদ দিলে নেট শর্ট লেন্ডিং দাঁড়ায় ১ হাজার ৩১৪ দশমিক ২২ টন। তবে কুতুবদিয়া অ্যাংকরে যৌথ সার্ভের পরিমাণ থেকে শোর ট্যাংকের হিসাব ধরলে কমেছে ১ হাজার ৯১৪ দশমিক ৬৪৪ টন।
সিআইএফ মূল্য প্রতি টন ৫৮৬ ডলার ৪২ সেন্ট এবং প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ধরে এই পরিমাণ ক্রুড অয়েলের আর্থিক মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ১৩ কোটি ৮১ লাখ টাকা। ওশান লস বাদ দিয়ে হিসাব করলেও সম্ভাব্য ক্ষতির অঙ্ক প্রায় ৯ কোটি ৪৮ লাখ টাকা।
লাইটারিং বিল আটকে আছে:
এই জটিলতার কারণে দুই জাহাজের লাইটারিং বিল বাবদ ১৮ লাখ ৭৯ হাজার ৪৯০ ডলার ৭৭ সেন্ট এখনো পরিশোধ করেনি বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ২৩ কোটি টাকা। জরুরি ভিত্তিতে এই অর্থ পরিশোধের জন্য গত ১৩ জানুয়ারি বিপিসিকে চিঠি দিয়েছে বিএসসি।
বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক বলেন, জেটি থেকে শোর ট্যাংকে তেল নিতে এ ধরনের অস্বাভাবিক লস হওয়ার কথা নয়। বিষয়টি নিয়ে তারা চরম সমস্যায় আছেন। তিনি এ বিষয়ে বিপিসির চেয়ারম্যানকে তিনবার চিঠি দিয়েছেন বলেও জানান।
বিপিসির ভূমিকা ও বাস্তবতা:
বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় ৭২ লাখ টন জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে। এর ৯২ শতাংশ আমদানি করতে হয়। আমদানি করা ক্রুড পরিশোধন করে বছরে প্রায় ১৫ লাখ টন জ্বালানি পাওয়া যায়। এই পুরো ক্রুড পরিবহনের দায়িত্বে রয়েছে বিএসসি।
চট্টগ্রাম বন্দরের নাব্যতা ৮ থেকে ১৪ মিটারের কম হওয়ায় বড় ক্রুডবাহী জাহাজ সরাসরি বন্দরে ঢুকতে পারে না। ফলে বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্রে মাদার ভ্যাসেল নোঙর করে লাইটারেজের মাধ্যমে তেল খালাস করতে হয়।
শর্ট লেন্ডিংয়ের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী শরীফ হাসনাত বলেন, জাহাজ থেকে ক্রুড খালাসের সময় কনফিগারেশনজনিত নানা জটিলতা হয়। তবে তাদের সিস্টেমে কোনো সমস্যা নেই।
তিনি বলেন, ডলফিন জেটিতে সার্ভে হয় না, সার্ভে হয় তাদের ট্যাংকে। জয়েন্ট সার্ভেতে সবকিছু ঠিক থাকার পরও যদি শোর ট্যাংকে কমে যায়, তাহলে বিএসসি ইআরএলকে দায়ী করতে পারে না। কয়েক মাস ধরেই শোর ট্যাংকে ধারাবাহিক লস দেখানো হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।
বিএসসিকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, যারা শর্ট লেন্ডিংয়ের অভিযোগ করছে, তারাই প্রমাণ করুক কোথায় লস হচ্ছে। গাফিলতির প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এসব ক্রুড কোনোভাবেই ট্যাংক ফুটো হয়ে বেরিয়ে যাওয়ার মতো নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তবে তিনি ইঙ্গিত দেন, জটিলতা সম্ভবত লাইটারিং পর্যায়েই। বিষয়টি আরও গভীরভাবে খতিয়ে দেখলে প্রকৃত কারণ বেরিয়ে আসবে।
সূত্র: জাগো নিউজ

