সরকারের ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ ঋণের চাপ কমানো এবং বাজেট বাস্তবায়নে গতি আনতে কার্যকর বাজেট বাস্তবায়ন পরিকল্পনা (বিআইপি) প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে অর্থ বিভাগ। এর মাধ্যমে বাজেট বাস্তবায়নে বিদ্যমান সমন্বয়, পরিকল্পনা ও মনিটরিংয়ের দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
অর্থ বিভাগ জানায়, উদ্যোগটি সফল হলে অর্থবছরের শেষ দিকে বিশেষ করে জুন মাসে অস্বাভাবিক ব্যয় নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে। পাশাপাশি সরকারি অর্থ ব্যবহারে দক্ষতা, শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
স্ট্রেংথেনিং পাবলিক ফিন্যান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রাম টু এনেবল সার্ভিস ডেলিভারি (এসপিএফএমএস) কর্মসূচির আওতায় আয়োজিত দুই দিনব্যাপী এক কর্মশালায় এসব বিষয় তুলে ধরা হয়।
২৩ ও ২৪ জানুয়ারি কক্সবাজারের একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত কর্মশালায় ১৮টি মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশ নেন।
কর্মশালায় আলোচকরা জানান, সরকারকে প্রতিবছর প্রায় এক লাখ কোটি টাকা অভ্যন্তরীণ ঋণ পরিশোধ করতে হয়। অর্থবছরের শুরুতে রাজস্ব আদায় কম থাকায় সরকারকে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ নিতে হয়। এতে আর্থিক চাপ আরও বেড়ে যায়।
এই বাস্তবতায় অর্থবছরের শুরু থেকেই বাজেট বাস্তবায়ন কার্যক্রম শুরু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে সময়মতো, কার্যকর ও ফলভিত্তিক বাজেট বাস্তবায়ন নিশ্চিত হবে। একই সঙ্গে সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার সম্ভব হবে বলে জানান বক্তারা।
কর্মশালায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অর্থ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (বাজেট ও সামষ্টিক অর্থনীতি) মো. হাসানুল মতিন। বিশেষ অতিথি ছিলেন অর্থ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ফেরদৌস রওশন আরা এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোস্তফা কামাল।
সভাপতিত্ব করেন অর্থ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (বাজেট) ও এসপিএফএমএস-এর জাতীয় কর্মসূচি পরিচালক ড. জিয়াউল আবেদীন। স্বাগত বক্তব্য দেন যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ ফারুক-উজ-জামান।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মো. হাসানুল মতিন বলেন, জুন মাসে সরকারের অস্বাভাবিক ব্যয় কমানোর সঙ্গে কার্যকর বাজেট বাস্তবায়ন পরিকল্পনার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। তিনি অগ্রাধিকার ও গুণগত খাতে বরাদ্দ দেওয়া অর্থ সঠিকভাবে ব্যয় হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত মূল্যায়নের ওপর গুরুত্ব দেন। অর্থবছরের শেষদিকে অতিরিক্ত ব্যয় সরকারের ঋণনির্ভরতা বাড়ায় বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
সভাপতির বক্তব্যে ড. জিয়াউল আবেদীন বলেন, কার্যকর বাজেট বাস্তবায়নের জন্য পরিচালন দক্ষতা বাড়ানো জরুরি। তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকই বিআইপি প্রণয়নে চলে যায়। এতে পরিকল্পনার কার্যকারিতা কমে। তাই বাজেট অনুমোদনের সময়সূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আগেভাগেই বিআইপি প্রক্রিয়া শুরু করা প্রয়োজন।
ফেরদৌস রওশন আরা বলেন, জাতীয় বাজেটের আকার বাড়লেও বাস্তবায়ন সক্ষমতা একই হারে বাড়েনি। তিনি বিআইপি’কে বাজেট বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও শৃঙ্খলা জোরদারের একটি কৌশলগত কাঠামো হিসেবে উল্লেখ করেন।
মোস্তফা কামাল বলেন, টেকসই ও মানসম্মত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে এবং সরকারি ব্যয়ে প্রকৃত মূল্য পাওয়া নিশ্চিত করতে কার্যকর বাজেট বাস্তবায়ন পরিকল্পনা অপরিহার্য।
কর্মশালার কারিগরি অধিবেশনে ‘কার্যকর বাজেট বাস্তবায়নে বিআইপির গুরুত্ব’ বিষয়ে আলোচনা হয়। অধিবেশনটি সঞ্চালনা করেন মোহাম্মদ ফারুক-উজ-জামান। উপস্থাপনা দেন অর্থ বিভাগের উপসচিব মো. জাকির হোসেন।
আলোচনায় জানানো হয়, বিআইপি বার্ষিক বাজেট বরাদ্দকে সময়ভিত্তিক ও কার্যক্রমভিত্তিক বাস্তবায়ন রোডম্যাপে রূপ দেয়। ক্রয় পরিকল্পনা, নগদ প্রবাহ এবং ত্রৈমাসিক ব্যয় লক্ষ্যের সঙ্গে বাজেট সংযুক্ত থাকায় বছরের শুরুতে বিলম্ব কমে এবং শেষ মুহূর্তে অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ হ্রাস পায়।
আরেকটি গ্রুপ সেশনে ‘বিআইপি বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা: চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ বিষয়ে আলোচনা হয়। সেশনটি পরিচালনা করেন অর্থ বিভাগের যুগ্ম সচিব মো. নজরুল ইসলাম।
চারটি দলে বিভক্ত হয়ে অংশগ্রহণকারীরা বিআইপি বাস্তবায়নের সমস্যা চিহ্নিত করেন এবং সমাধান প্রস্তাব দেন। আলোচনায় বিআইপি জারি বিলম্ব, বিভিন্ন সিস্টেমের সমন্বয়হীনতা, দক্ষতার ঘাটতি, প্রক্রিয়াগত জটিলতা এবং আইবাস++, ই-জিপি ও বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনার সঙ্গে দুর্বল সংযোগের বিষয়গুলো উঠে আসে।
অংশগ্রহণকারীরা সময়মতো বিআইপি জারি, সিস্টেম ইন্টিগ্রেশন জোরদার, সক্ষমতা উন্নয়ন এবং অর্থ বিভাগের নেতৃত্বে সমন্বয় বাড়ানোর সুপারিশ করেন।

