নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা গ্রহণ করবে নতুন সরকার। তবে তার আগে দেশের সামনে রয়েছে বহুমুখী অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ। অন্তর্বর্তী সরকার নতুন সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেছে।
মূল চ্যালেঞ্জের মধ্যে আছে চড়া মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা। বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিও রয়েছে শীর্ষ অগ্রাধিকার তালিকায়। শিল্প খাতকে শক্তিশালী করতে গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করাও জরুরি। এছাড়া রয়েছে ঋণের সুদহার কমানো, ডলারের যোগান বাড়িয়ে টাকার মান রক্ষা করা। বাজার ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরানো, রাজস্ব আয় বাড়ানো এবং আইনশৃঙ্খলার পরিস্থিতি উন্নত করাও গুরুত্বপূর্ণ। রপ্তানি বাজারের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, ব্যাংক খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং চলমান সংস্কার এগিয়ে নেওয়াও প্রাধান্য পাবে।
সাথে রয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে দরকষাকষির মাধ্যমে দেশের মানুষের জন্য সুবিধাজনক পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়। দেশি-বিদেশি সকলের দৃষ্টি এখন নতুন সরকারের দিকে। তারা কিভাবে দেশের অর্থনীতি এগিয়ে নেবে এবং কোন নীতি গ্রহণ করবে তা নিয়েও চরম আগ্রহ রয়েছে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, দীর্ঘ সময় ধরেই দেশের অর্থনীতিতে মন্দা চলছে। অন্তর্বর্তী সরকার অর্থনীতিকে চাঙা করতে পারেনি। তবে তারা অর্থনীতির লিকেজগুলো বন্ধ করতে সক্ষম হয়েছে।
ড. মুজেরী বলেন, নতুন সরকারকে অর্থনৈতিকভাবে মানুষকে স্বস্তি দেওয়ার পদক্ষেপ নিতে হবে। এজন্য বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে। শিল্প খাতকে শক্তিশালী করতে হবে। মূল্যস্ফীতি কমিয়ে পণ্যমূল্য যৌক্তিক পর্যায়ে রাখতে হবে। আইনশৃঙ্খলার পরিস্থিতিও উন্নত করতে হবে। এগুলোই সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি আরও উল্লেখ করেন, নতুন সরকার ক্ষমতায় এলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসার আশা করা যায়। তখন বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করতে হবে। উদ্যোক্তাদের মধ্যে আস্থা সৃষ্টির পাশাপাশি দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোও জরুরি।
এর আগে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত তিনটি ভোটারবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় ছিল আওয়ামী লীগ সরকার। পুরো সময়টাই লুটপাটের অভিযানে কাটে। হলমার্ক কেলেঙ্কারি দিয়ে যাত্রা শুরু হয়। এরপর বেসিক ব্যাংক জালিয়াতি, বিসমিল্লাহ গ্রুপ, অ্যানন টেক্স গ্রুপ, ক্রিসেন্ট গ্রুপের কেলেঙ্কারি ঘটে। একাধিক ব্যাংক দখল করেও লুটপাট চালানো হয়। বিপুল অঙ্কের টাকা বিদেশে পাচার হয় এবং আর্থিক খাত প্রায় অর্থশূন্য হয়ে পড়ে।
২০১৯ সাল থেকে অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব দেখা যায়। ২০২০ সালে করোনার ধাক্কা ও বৈশ্বিক মন্দার কারণে ২০২২ সালে অর্থনৈতিক সংকট আরও প্রকট হয়। এই অবস্থা চলতে থাকে আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময় পর্যন্ত। অর্থনীতির এই সংকটের মধ্যে ছাত্র ও জনগণের তীব্র আন্দোলন শুরু হয়। অবশেষে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পদত্যাগে বাধ্য হয়। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট।
জুলাই আন্দোলন মূলত তরুণ প্রজন্মের বেকারত্বের সমস্যা থেকে শুরু হয়। কর্মসংস্থানের ৯৫ শতাংশ বেসরকারি খাতে, সরকারি খাতে মাত্র ৫ শতাংশ। দীর্ঘ সময়ের অর্থনৈতিক মন্দায় বেসরকারি খাতে চাকরি সংকুচিত হয়ে যায়। ফলে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন অনেক চাকরিপ্রার্থী প্রত্যাশিত কাজ পাননি। বিনিয়োগে মন্দার কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যের পথও ছিল বন্ধ। তখন একমাত্র বিকল্প ছিল সরকারি চাকরি। সরকারি খাতে নিয়োগের বড় অংশ ছিল কোটার আওতায়। সাধারণ বেকাররা চাকরি পেতে পারছিলেন না। এই অবস্থা থেকেই শুরু হয় কোটাবিরোধী আন্দোলন। একপর্যায়ে আন্দোলন সরকারের পতনে পরিণত হয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বভার গ্রহণের পর আশা করা হয়েছিল, তারা অর্থনীতিকে চাঙা করবে এবং বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করবে। তবে সরকার কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি। বিনিয়োগ সম্মেলন এবং উদ্যোক্তাদের আহ্বান সত্ত্বেও সাফল্য আসেনি। চলমান কারখানাগুলো সচল রাখতে সরকারের অসহযোগিতার অভিযোগ করেছেন উদ্যোক্তারা। গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট ও আইনশৃঙ্খলার অবনতি কিছু কারখানা বন্ধ হওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে কিছু ক্ষেত্রে সরকার সফল হয়েছে। নানামুখী পদক্ষেপে মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমানো সম্ভব হয়েছে। পতনশীল বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ উর্ধ্বমুখী। টাকা পাচার ও হুন্ডি রোধ করে ডলারের প্রবাহ বাড়ানো হয়েছে, ফলে টাকার মান স্থিতিশীল আছে। এছাড়া গত সরকারের বকেয়া বৈদেশিক ঋণের দায় শোধ করে চাপ কমানো হয়েছে। আইএমএফের সঙ্গে শক্ত দরকষাকষি করেছে। ব্যাংক খাতে লুটপাট বন্ধ করে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা হয়েছে। তবে এখনও ব্যাংকে স্বাভাবিকতা পুরোপুরি ফিরে আসেনি। সংস্কার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক মইনুল ইসলাম বলেন, নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিনিয়োগ বৃদ্ধি, জিডিপির প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত করা। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে। এখন যেখানে-সেখানে হামলা এবং মব সৃষ্টি হচ্ছে, তা বন্ধ করতে হবে।
অধ্যাপক মইনুল ইসলাম আরো বলেন, নতুন সরকার ক্ষমতায় এলে মব সৃষ্টিকারী মৌলবাদী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কঠোর হতে হবে। তখনই উদ্যোক্তাদের আস্থা ফিরে পাবে এবং বিনিয়োগ বাড়বে।
ফেব্রুয়ারির মধ্যভাগে দায়িত্ব নেবে নতুন সরকার। তবে তারা অর্থনীতির জন্য ‘সুখকর’ পরিস্থিতি পাচ্ছে না। দেশের অর্থনীতিকে সচল করতে এবং বেকারত্ব কমাতে নতুন সরকারকে বহুমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। মূল চ্যালেঞ্জের মধ্যে প্রথমে আছে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। ২০২২ সালের আগস্ট থেকে ২০২৩ সালের মে পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে ছিল। অক্টোবরে তা ৮.১৭ শতাংশে নেমে আসে। তবে নভেম্বরে বেড়ে ৮.২৯ শতাংশ হয়। ডিসেম্বরে আরও বেড়ে ৮.৪৯ শতাংশে পৌঁছে। নির্বাচনের কারণে অনুৎপাদনশীল খাতে টাকার প্রবাহ বাড়ার ফলে জানুয়ারিতেও মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে।
ফেব্রুয়ারি-মার্চে নির্বাচন, রোজা ও ঈদের বাড়তি চাহিদার কারণে এ হার আরও বাড়ার আশঙ্কা আছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে হলে ডলারের বিপরীতে টাকার মান স্থিতিশীল রাখতে হবে এবং পণ্য ও সেবার মূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এটি বড় চ্যালেঞ্জ, কারণ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ডলারের দাম বাড়ানোর দিকেই চাপ দিচ্ছে।
অধ্যাপক মইনুল ইসলাম বলেন, টাকার মান স্থিতিশীল রাখতে হলে রেমিট্যান্স বাড়াতে হবে। হুন্ডি বাধা হিসেবে কাজ করতে পারে। আওয়ামী লীগ আমলের হুন্ডিবাজদের পালিয়ে যাওয়ায় হুন্ডি কমেছে এবং ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স বেড়েছে। নতুন সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে যাতে হুন্ডি আবার সক্রিয় না হয়। এছাড়া রপ্তানি আয় বাড়ানোর পদক্ষেপও নিতে হবে।
বর্তমানে রপ্তানি আয় নিম্নমুখী। নতুন সরকারের জন্য এ খাতকে চাঙা করাটাও বড় চ্যালেঞ্জ। এজন্য কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানো প্রয়োজন। শিল্প খাতে বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুতের সরবরাহ নিশ্চিত করাও জরুরি। বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা নতুন সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
প্রবাদ আছে, ‘বাজারে পণ্যের দাম বাড়ে, জনগণের কাছে সরকারের দাম কমে।’ দেশের ভোক্তারা দীর্ঘদিন বাজার যন্ত্রণা ভুগেছেন। বিগত সরকারের সময়ে ভোক্তাদের আয় কমেছে, খরচ বেড়েছে। ফলে তারা সঞ্চয় ভেঙে ও ঋণ নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেছেন। এখনও স্বস্তি পাননি। নতুন সরকারকে পণ্যের দাম যৌক্তিক পর্যায়ে রাখতে বাজার নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে হবে। এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
কর্মসংস্থান বাড়াতে হলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। বর্তমান সরকার গত দেড় বছরে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারেনি। নতুন সরকারকে তা নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য দ্রুত আইনশৃঙ্খলা উন্নয়ন, শিল্পে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ, ঋণের সুদহার কমানো এবং ব্যাংকের ঋণ বিতরণের সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে, যাতে তারা বিনিয়োগে উৎসাহিত হন।
দেশি বিনিয়োগ বেড়ে গেলে বিদেশি বিনিয়োগও বৃদ্ধি পাবে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বরে বিদেশি বিনিয়োগ মূলধন হিসেবে এসেছে মাত্র ১৪ কোটি ডলার। কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য এ বিনিয়োগ বৃদ্ধি করাই একমাত্র বিকল্প। গত চার বছরে ঋণের সুদহার ধারাবাহিকভাবে বাড়ানো হয়েছে। চড়া সুদের কারণে ঋণের খরচ বেড়ে গেছে। বিনিয়োগ বাড়ছে না, এটার অন্যতম কারণ এ। ঋণের সুদ কমালে টাকার প্রবাহ বেড়ে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে বলে সুদ কমানো হচ্ছে না। তবে চড়া সুদের কারণে শিল্প খাত ধুঁকছে। বিনিয়োগ কমে কর্মসংস্থান সংকুচিত হচ্ছে।
উদ্যোক্তারা সুদের হার কমানোর জোর দাবি জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, সুদ কমলে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে, কর্মসংস্থান বাড়বে এবং ভোক্তাদের আয় বেড়ে মূল্যস্ফীতি সামাল দেওয়া যাবে। পাশাপাশি বাজারে সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে এলে পণ্যের দাম সহনীয় থাকবে।
বর্তমানে পুলিশ প্রশাসন ভঙ্গুর। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত করা নতুন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ। নিরাপত্তা না থাকলে বিনিয়োগ আসবে না, চলমান শিল্প সম্প্রসারণ থমকে যাবে। আওয়ামী লীগের পতনের পর চাঁদাবাজি ও দখলবাজি বেড়েছে। নির্বাচনের পর দলীয় নেতাকর্মীরা আগ্রাসী হতে পারে। তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারকে কঠোর হতে হবে।
ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা নতুন সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ কিন্তু এখনই ব্যাংক কোম্পানি আইন সংস্কার নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে তীব্র বিরোধে জড়িয়ে পড়েছে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি)। নতুন সরকারের পক্ষে বড় ব্যবসায়ীদের চাপ সামলে খাতের সংস্কার করা কঠিন। সংস্কার না হলে ব্যাংক খাত মেরুদণ্ড সোজা করতে পারবে না।
বিগত সরকারের সময়ে লুটপাটের অর্থ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। খেলাপির পরিমাণ বেড়ে ৬ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। বাড়তি খেলাপির কারণে ব্যাংক খাতের সব সূচক নিম্নমুখী। খেলাপি ঋণের চাপ কমানোও বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ আন্তর্জাতিক ঋণ মান যাচাইকারী সংস্থাগুলো বাংলাদেশের রেটিং কমিয়ে দিতে পারে। বৈদেশিক ব্যবসায় বিদেশি ব্যাংকগুলো গ্যারান্টি ফি বা অতিরিক্ত চার্জ আরোপ করতে পারে। এতে ব্যবসার খরচ আরও বাড়বে।
রাজনৈতিক সরকারের সময়ে নিয়মকানুন প্রয়োগে শিথিলতা থাকে। বিশেষ করে রাজনৈতিক চাপের কারণে বিধিবিধান কার্যকর করা কঠিন হয়। ফলে নতুন সরকার ক্ষমতায় এলে ঋণ বিতরণের চাপ বাড়বে। ব্যাংক খাতে ঋণ শৃঙ্খলা না রাখলে খাত আবার সংকটে পড়তে পারে।
নতুন সরকার ক্ষমতায় এলে ব্যবসা-বাণিজ্যে তাদের লোকও ঢুকবে। এতে আমদানির চাহিদা বাড়বে। যদি আমদানির নামে টাকা পাচার শুরু হয়, ডলারের সংকট দেখা দিতে পারে। বর্তমানে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ছে, তবে তা স্বস্তিদায়ক নয়। রোববার নিট রিজার্ভ ২৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি ছিল। চলতি অর্থবছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এটিকে ৩৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করতে চায়।
করোনার সময় থেকে রাজস্ব আয় মন্দা ভুগছে। বিগত সরকার টাকা ছাপিয়ে ব্যয় নির্বাহ করেছে, ফলে মূল্যস্ফীতি বেড়ে গেছে। বর্তমান সরকার টাকা ছাপাচ্ছে না; বরং আগের সময়ে ছাপানো টাকা বাজার থেকে তুলে নিচ্ছে। নতুন সরকার ক্ষমতায় এলে তারা বড় ধরনের রাজস্ব ঘাটতির মুখে পড়বেন। সরকারি কর্মীদের নতুন পে-স্কেল এবং উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থ ছাড়ের কারণে ব্যয় বাড়বে। যদি বর্ধিত হারে রাজস্ব আহরণ সম্ভব না হয়, সরকারকে ঋণ নিতে হবে। তবে ব্যাংকের অবস্থাও ভালো নয়। বেসরকারি খাত যথাযথ ঋণ পাবে না। সরকার যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে টাকা ছাপানো শুরু করে, অর্থনীতি আবার সমস্যায় পড়বে।
নতুন সরকারের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এর সঙ্গে দরকষাকষি। অন্তর্বর্তী সরকার আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা এগিয়ে নিতে পারেনি। ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে চলমান সংস্কার বাস্তবায়নের অঙ্গীকার আদায় করতে চায় আইএমএফ। শর্তগুলো কঠোর। এর মধ্যে রয়েছে ডলারের দাম বাড়ানো ও টাকার মান কমানো। এটি করলে মূল্যস্ফীতি বাড়বে এবং ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাবে।
আইএমএফের শর্ত অনুযায়ী জ্বালানি, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানো, ভর্তুকি কমানো, সঞ্চয়পত্রের সুদহার ও বিক্রি কমানোও প্রয়োজন। তবে সমাজের স্বল্প আয়ের অনেক মানুষই সঞ্চয়পত্রের আয় দিয়ে সংসার চালান। তাদের ওপর এ পদক্ষেপের প্রভাব পড়বে। ফলে সরকার ভোক্তার কাছে অজনপ্রিয় হয়ে যেতে পারে।
এই অবস্থায় আইএমএফের সঙ্গে দরকষাকষিতে দক্ষতা ও দেশপ্রেম দেখানো অপরিহার্য। তবে সম্প্রতি প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে, নতুন সরকার ক্ষমতায় এলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে। তখন সরকারি ব্যয় ও বিনিয়োগ বাড়বে, যা শিল্প খাতকে চাঙা করবে।

