চরম সংকটের মুখে দেশের লবণশিল্প। জমির খাজনা ও উৎপাদন উপকরণের দাম বাড়লেও লবণের বাজার মূল্য কম থাকায় বিপাকে পড়েছেন চাষিরা।
লবণের দাম উৎপাদন খরচের চেয়ে কম হওয়ায় এবার অনেক চাষি নতুন মৌসুমে মাঠ প্রস্তুতই করেননি। এখনো ১০ থেকে ১৫ শতাংশ লবণক্ষেত খালি পড়ে আছে। গত বছর দেশে ৬৯ হাজার ৫২১ একর জমিতে লবণ চাষ হয়েছিল। তার আগের বছরে চাষ হয়েছিল ৬৮ হাজার একর জমিতে।
চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের বিভিন্ন উপজেলার চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, লবণ চাষের জমি ইজারা হয় প্রতি কানি (৪০ শতাংশ) ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকায়। জমির পানির সহজ প্রাপ্যতা, লবণ পরিবহন সুবিধা ও উৎপাদন ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে ইজারা মূল্য ওঠানামা করে। এ ছাড়াও শ্রমিক খরচ প্রতি কানিতে প্রায় ৫০ হাজার টাকা, পলিথিন খরচ ১০ হাজার টাকা এবং পানির খরচ ১০ হাজার টাকা। দালালদের প্রতি মণ লবণের জন্য আরও ৩০ টাকা দিতে হয়। এতে একজন চাষির মোট খরচ দাঁড়ায় প্রায় এক লাখ ১০ হাজার টাকা প্রতি কানি জমিতে।
অন্যদিকে, প্রতি কানি জমিতে গড়ে ৩৫০ মণ লবণ উৎপাদন হয়। প্রতি মণ ২৫০ টাকায় বিক্রি করলে আয়ের হিসাব দাঁড়ায় প্রায় ৯০ হাজার টাকা। ফলে চাষির ক্ষতি প্রতি কানিতে ২০ হাজার টাকার বেশি।
কুতুবদিয়ার উপজেলার বড়ঘোপ ইউনিয়নের লবণচাষি শাহানুর রহমান শামীম বলেন, “আমরা অসহায়। জমিতে এক মৌসুমে যত লবণ উৎপাদন হয়, তার বিক্রি দিয়েও খরচ উঠছে না। এক মণ লবণের দাম মাত্র ২৫০ টাকা। আমাদের বিকল্পও নেই, তাই এই দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছি।”
চাষিরা আরও অভিযোগ করছেন, দালালরা লবণের ওজন নিয়েও প্রতারণা করছে। যেখানে এক মণ লবণ থাকা উচিত ৪০ কেজি, সেখানে ৫০ কেজি হিসাব দেখানো হচ্ছে। এর মধ্যে ১০ কেজি ‘পানির ওজন’ দেখিয়ে কোনো মূল্য দেওয়া হয় না। এছাড়া চাষের শুরুতে দালালরা প্রতি কানিতে ২০ হাজার টাকা অগ্রিম দেয়, পরে প্রতি মণ ১০ টাকা কেটে রাখে।
সংরক্ষণের কোনো ব্যবস্থা নেই:
দেশের লবণচাষিরা বিক্রি না হলে বা দাম কমে গেলে লবণ সংরক্ষণে সমস্যায় পড়েন। আধুনিক কোনো সংরক্ষণ ব্যবস্থা এখনও চালু হয়নি। চাষিরা লবণ মাঠেই মাটিতে গর্ত খুঁড়ে সংরক্ষণ করেন। এভাবে রাখা লবণের অন্তত ১০ শতাংশ নষ্ট হয়ে যায়, যা কৃষকের শ্রম ও ঘামে উৎপাদিত মূল্য নষ্ট করে।
কৃষকরা জানান, যদি সরকার লবণ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সহযোগিতা করতো অথবা বড় লবণ কোম্পানিগুলো সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে লবণ ক্রয় করতো, তবে তারা কিছু অতিরিক্ত আয় করতে পারতেন।
চাঁদার আতঙ্কে ক্ষতিগ্রস্ত চাষিরা:
পেকুয়া উপজেলার একাধিক লবণচাষি সংবাদকর্মীদের জানিয়েছেন, পেকুয়া বাজারের ওপর নির্মিত সেতুর জন্য লবণবোঝাই গাড়িকে ৫০০ টাকা চাঁদা দিতে হয়। স্থানীয় এক প্রভাবশালী নেতা এই টাকা আদায় করেন। চাঁদা না দিলে গাড়ি আটকে রাখা বা বিভিন্ন হয়রানির শিকার হতে হয়।
চাষিরা আরও অভিযোগ করেছেন, নদী থেকে লবণ মাঠে পানি প্রবেশ করাতে অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে। স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি পানির পাইপ ব্যবহারের জন্য প্রতি কানিতে ৩০০ টাকা নেন। পেকুয়ার রাজাখালী এলাকার প্রায় ৮৭৯ কানি লবণ মাঠের জন্য ৬ মাসে মোট আড়াই লাখ টাকা আদায় করা হয়। চাষিরা বলছেন, আগে এটি জমিদারের দায়িত্বে থাকলেও আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নেতারা ইজারার নামে পানির লাইনের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর বর্তমান ব্যবস্থাটি চালু হয়েছে।
এই এলাকার লবণ মাঠের মালিক রহমান আলী (৫৫) জানান, “আমি ১৯৯২ সালে শেষবার বিসিকের লোকজনকে এখানে আসতে দেখেছি। এরপর আর কেউ খোঁজ নেয়নি।” পেকুয়া রাজাখালীর লবণচাষি আবুল হোসেন বলেন, “১৯৮১ সালে বেসিক আমাদের ৫০০ টাকা করে সহায়তা দিয়েছিল। তখনকার সময়ে সেটা অনেক বড় সহায়তা ছিল। এরপর আর কোনো সহযোগিতা পাইনি।” চাষিরা সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন—লবণের ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ করা হোক, দালাল ও প্রভাবশালীদের শোষণ বন্ধ হোক, সরকারি নজরদারি ও বিসিকের কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করা হোক।
কারখানার লবণ ব্যবহার হ্রাস পেয়েছে:
বিসিকের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, গত বছর দেশে লবণের চাহিদা ছিল ২৬ লাখ ১০ হাজার টন। অথচ উৎপাদন হয়েছে মাত্র ২২ লাখ ৫২ হাজার টন। এর ফলে হিসাবমতে প্রায় সাড়ে চার লাখ টন লবণের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এই ঘাটতির মধ্যে মানুষের খাদ্য হিসেবে ব্যবহার হওয়ার কথা ছিল ১৩ লাখ টন। শিল্প কারখানায় ব্যবহার হওয়ার কথা ছিল ১২ লাখ টন। তবে বাস্তবে শিল্প কারখানায় ব্যবহৃত হয়েছে মাত্র ৮ লাখ টন। ফলে প্রায় চার লাখ টন লবণ অপ্রয়োগী অবস্থায় রয়ে গেছে।
কর্তার মতে, তার আগের বছরের তুলনায় মজুত লবণ প্রায় দুই লাখ টন বেশি ছিল। অর্থাৎ দেশে উৎপাদিত লবণ চাহিদার চেয়ে বেশি থাকার পরও সরকার এক লাখ টন লবণ আমদানি অনুমোদন দেয়। এ সিদ্ধান্তের প্রভাব পরে পাইকারি বাজারে পড়ে। তবে অনুমোদন পেলেও কেউ বাস্তবে লবণ আমদানি করতে এলসি খোলেনি। কারণ যেসব দেশ থেকে লবণ আমদানি সম্ভব, সেসব দেশে দাম বাংলাদেশের চেয়ে বেশি। পরে কৃষকদের আন্দোলনের মুখে সরকার আমদানির সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে।
লবণের মূল্য ওঠানামা
২০১০ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের লবণের বাজার একাধিকবার বড় ধরনের ওঠানামা দেখেছে। উৎপাদন খরচ, জ্বালানি মূল্য, পরিবহন খরচ, মৌসুমি চাহিদা এবং বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে এই সময় লবণের দাম কখনো কমেছে, কখনো হঠাৎ বেড়েছে।
চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০১০ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে লবণের বাজার মোটামুটি স্থিতিশীল ছিল। এ সময় প্রতি মণ লবণ বিক্রি হতো গড়ে ১৮০ থেকে ২২০ টাকায়। উৎপাদন ও চাহিদার ভারসাম্য থাকায় বড় দরপতন বা অস্বাভাবিক দাম বেড়ে যাওয়ার ঘটনা হয়নি।
২০১৫ সালের পর লবণের দাম ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জমি সংকট এবং উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির কারণে প্রতি মণ লবণের দাম দাঁড়ায় প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায়। ২০১৯ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত সময় লবণের জন্য সবচেয়ে ভালো বাজার হিসেবে ধরা হয়। বিশেষ করে ২০২১-২২ মৌসুমে প্রতি মণ লবণের দাম ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকায় পৌঁছায়। এতে চাষিরা লাভবান হলেও ভোক্তা পর্যায়ে দাম বাড়ায় উদ্বেগ সৃষ্টি হয়।
রেকর্ড উৎপাদন:
২০২৩-২৪ মৌসুমে দেশে লবণের রেকর্ড উৎপাদন হয়। অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে বাজারে ধস নেমে আসে। তখন প্রতি মণ লবণের দাম ৩০০ টাকার নিচে নেমে যায়। অনেক জায়গায় বিক্রি হয় ২৬০ থেকে ২৮০ টাকায়। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ মৌসুমে লবণের দাম আরও কমে যায়। এখন প্রতি মণ লবণ বিক্রি হচ্ছে ২৫০ টাকায়, যা উৎপাদন খরচের চেয়েও কম।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপরিকল্পিত উৎপাদন বৃদ্ধি, পর্যাপ্ত সংরক্ষণ সুবিধার অভাব এবং মৌসুমভিত্তিক বাজার নিয়ন্ত্রণ না থাকা—এই তিন কারণেই লবণের বাজারে ওঠানামা হচ্ছে। তারা মনে করেন, লবণের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকারকে ক্রয়, সংরক্ষণ সুবিধা এবং রপ্তানির উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় ভবিষ্যতে চাষিরা লবণ উৎপাদনে আগ্রহ হারাতে পারেন।
বিসিকের আঞ্চলিক পরিচালক খালেদ মাহমুদ জানান, “বিসিকের পক্ষ থেকে লবণচাষিদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ এবং সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়া হয়। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে খাস জমি চাষিদের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়, যার ইজারা মূল্য খুবই নগণ্য। কিন্তু ব্যক্তি মালিকের কাছ থেকে জমি ইজারা নিলে দাম বেড়ে যায়। এটি লবণের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির একটি বড় কারণ।”
তিনি আরও জানান, সন্দ্বীপে লবণের নতুন সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। নতুন চর জেগেছে, যা হাজার একরের বেশি হবে। চলতি বছর কয়েক শত একর জমিতে লবণ চাষ শুরু করার চেষ্টা চলছে। ইতোমধ্যে ৯৫ জন চাষিকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। খালেদ মাহমুদ বলেন, “সন্দ্বীপে আগেও লবণ চাষ হতো। পরে লবণ মাঠ সাগরে বিলীন হয়ে যাওয়ায় চাষ বন্ধ হয়ে যায়। এবার নতুন চর জাগার ফলে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।”

