দেশজুড়ে এলপিজি ও এলএনজি নিয়ে যখন হাহাকার চলছে, ঠিক তখনই অন্য একটি জ্বালানি সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে দেশ। ডিজেল, পেট্রোল ও অন্যান্য তরল জ্বালানির মজুত নিয়ন্ত্রণ নিয়ে হঠাৎই সর্তক সংকেত পাওয়া গেছে। এই সংকট মোকাবিলায় দেশের তরল জ্বালানি আমদানি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) কার্যত নীরব অভিযান শুরু করেছে।
বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, দেশের নিয়মমাফিক জ্বালানির মজুত থাকা উচিত ৪৫ দিন। কিন্তু বর্তমানে ডিজেলের মজুত কমে গেছে এক চতুর্থাংশের নিচে। বিশেষ করে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে চাহিদা বেড়েছে। সরবরাহ চেইন স্বাভাবিক রাখা নিয়েও তৈরি হয়েছে সংশয়। বিপিসি দাবি করছে, “সংকট সাময়িক। আমদানি করা জাহাজগুলো সময়মতো দেশে এলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।
মজুতের হিসাব কী বলছে: বর্তমান তথ্য অনুযায়ী:
- ডিজেল: ৮ দিনের মজুত
- উড়োজাহাজের জ্বালানি জেট ফুয়েল: ৭ দিন
- পেট্রোল: ১০ দিন
- অকটেন: ২৮ দিন
- ফার্নেস অয়েল: ৫২ দিন
- কেরোসিন: ৭০ দিন
তবে চট্টগ্রাম-ঢাকা পেট্রোলিয়াম পাইপলাইনে ফতুল্লা ডিপোতে ডিজেলের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এর ফলে গত দুই মাস ধরে দুটি ডিজেল ট্যাঙ্ক সিলগালা অবস্থায় রয়েছে। কাগজে-কলমে মজুত থাকলেও ব্যবহারযোগ্য পরিমাণ মাত্র সাত দিনের মতো।
বিপিসির পরিচালক (অপারেশন ও পরিকল্পনা) একেএম আজাদুর রহমান বলেন, সংকট কিছু হয়েছিল, আশা করি তা দ্রুত কাটবে। সামনে জাহাজের শিডিউল ঠিক মতো এলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।
বিশ্ববাজারের প্রভাব নয়, নতুন তথ্যই সংকটের কারণ:
বিশ্ব বাজারে জ্বালানি তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়নি। এছাড়া বাংলাদেশের সরবরাহকারীরা নিয়মিত বিল পরিশোধ করলেও হঠাৎ তরল জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। বিশ্বস্ত সূত্র বলছে, সমস্যার পেছনে রয়েছে এল আর (লং লার্জ) ভেসেলে জ্বালানি সরবরাহের কৌশল।
স্বাভাবিক নিয়মে প্রতি পার্সেলে ৩০–৩৫ হাজার টন জ্বালানি সরবরাহ হয়। কিন্তু এল আর ভেসেলে এক লাখ টনের জ্বালানি আনা গেলে জাহাজ ভাড়া কম হয় এবং সরবরাহকারীরা প্রিমিয়াম আয় পায়। অভিযোগ উঠেছে, বেশি লাভের জন্য কৌশলে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়েছে। বিপিসি এ সংকট দ্রুত কাটানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তবে পরিস্থিতি এখনো সতর্ক নজরদারির মধ্যে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ও তার অঙ্গ প্রতিষ্ঠানগুলো ৬৮ লাখ ৩৫ হাজার টন জ্বালানি তেল বিক্রি করেছে। এর মধ্যে সর্বাধিক ব্যবহার হয়েছে পরিবহন খাতে। বিপিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী:
- পরিবহন খাতে: ৬৩.৪১%
- কৃষি: ১৫.৪১%
- শিল্প: ৫.৯৬%
- বিদ্যুৎ উৎপাদনে: ১১.৬৭%
- গৃহস্থালি: ০.৯৬%
- অন্যান্য খাতে: ২.৫৯%
- ব্যবহৃত জ্বালানির মধ্যে ডিজেলই শীর্ষে। বিশদে দেখা যায়:
- ডিজেল: ৬২.৬৯%
- ফার্নেস অয়েল: ১৪.৩৪%
- পেট্রোল: ৬.৩২%
- অকটেন: ৫.৯০%
- কেরোসিন: ১%
- জেট ফুয়েল: ৮.১৯%
- অন্যান্য: ১.৫৬%
দেশব্যাপী মোট ২৭টি ডিপো থেকে এসব জ্বালানি সরবরাহ করা হয়। সরবরাহ করা জ্বালানির মধ্যে প্রায় ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) দ্বারা পরিশোধন করা হয়। বাকি চাহিদা পূরণে বিপিসি আমদানি করে। বর্তমানে বিপিসির অঙ্গ প্রতিষ্ঠানগুলোতে মোট মজুত ক্ষমতা ১৫ লাখ ৭০ হাজার মেট্রিক টন। দেশের জ্বালানি ব্যবহার এবং সরবরাহের ধারা বিবেচনায় বিপিসি নিয়মিতভাবে ৪৫ দিনের চাহিদার সমপরিমাণ মজুত রাখে।
তবে হঠাৎ দেখা দেওয়া তরল জ্বালানি সংকট কিছুটা উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিপিসি জানাচ্ছে, জাহাজের সরবরাহ শিডিউল ঠিকভাবে চলে এলে সংকট অল্প সময়ের জন্য সীমিত থাকবে।
২ ফেব্রুয়ারির তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিপিসির অঙ্গ প্রতিষ্ঠানসহ ২৭টি ডিপোতে ডিজেলের মোট মজুত ক্ষমতা রয়েছে ৬ লাখ ৪ হাজার ৬৩ টন। এই সময়ের ডিজেলের প্রকৃত মজুত দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭৫ হাজার ৪৫৬ টন, কারণ মোট মজুতের ১০ শতাংশ (১৯ হাজার ৪৯৫ টন) ডেডস্টক হিসেবে চিহ্নিত, যা ব্যবহার করা যায় না।
বিপিসির হিসাব অনুযায়ী, এই মজুত দিয়ে গড় বিক্রির ধারায় ৮ দিনের সরবরাহ দেওয়া সম্ভব। তবে সরবরাহ চেইনে কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছে। চট্টগ্রাম-ঢাকা পেট্রোলিয়াম পাইপলাইনে ডিজেল পরিবাহনের সময় অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে। এর প্রেক্ষিতে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা ডিপোতে যমুনা অয়েলের দুটি ট্যাংক সিলগালা করা হয়েছে। ওই ট্যাংকে বর্তমানে প্রায় ১০ হাজার টন ডিজেল রয়েছে। ফলে বিপিসি প্রাথমিকভাবে সাতদিনের সামান্য বেশি সরবরাহ দিতে পারছে।
এই বিষয়ে যমুনা অয়েল কোম্পানির মহাব্যবস্থাপক (বিপণন) মো. মাসুদুল ইসলাম বলেন, “ফতুল্লা ডিপোর দুটি ট্যাংক সিলগালা অবস্থায় রয়েছে। তদন্ত প্রক্রিয়া এখনও শেষ হয়নি। মন্ত্রণালয়ের অনুমতি পেলে ট্যাংকগুলো থেকে ডিজেল সরবরাহ দেওয়া সম্ভব হবে।”
জেট ফুয়েল:
বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, জেট এ-১ ফুয়েলের মজুত ক্ষমতা ৬১,৬৮১ টন। ২ ফেব্রুয়ারি মজুত ছিল ১৮,৫৪০ টন, যার মধ্যে ১,৮৫৪ টন ডেডস্টক বাদে সরবরাহযোগ্য মজুত ১৬,৬৮৬ টন। গড় চাহিদা অনুযায়ী (প্রতি দিন ২,২৯৭ টন) এই মজুত ৭ দিন চলবে।
পেট্রোল:
পেট্রোলের মোট মজুত সক্ষমতা ৩৬,২৬০ টন, কিন্তু মজুত আছে ২২,৩৩৩ টন। ডেডস্টক বাদে সরবরাহযোগ্য পরিমাণ ২০,১০০ টন, যা গড় দৈনিক বিক্রি (১,৯২২ টন) অনুযায়ী ১০ দিন চলবে।
বর্তমানে বিপিসিকে জ্বালানি তেল সরবরাহ করছে বিদেশি ৯টি প্রতিষ্ঠান, যেগুলো জিটুজি ও উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে মনোনীত। এর মধ্যে রয়েছে:
- সিঙ্গাপুর: পেট্রোচায়না ইন্টারন্যাশনাল, পিটিটি ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডিং, ইউনিপেক সিঙ্গাপুর
- মালয়েশিয়া: পিটিএলসিএল
- ইন্দোনেশিয়া: বিএসপি-জাপিন
- কুয়েত: কেপিসি ট্রেডিং লিমিটেড
- সংযুক্ত আরব আমিরাত: এমিরেটস ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি
- থাইল্যান্ড: ওকিউ ট্রেডিং লিমিটেড
- ভারত: ইন্ডিয়ান অয়েল করপোরেশন লিমিটেড (আইওসিএল)
বিগত সরকারের আমলে বৈদেশিক মুদ্রা সংকটের কারণে কিছু বিল পরিশোধ বিলম্বিত হয়েছিল। বিপিসির মহাব্যবস্থাপক (অর্থ) মুহাম্মদ মোরশেদ হোসাইন আজাদ জানাচ্ছেন, ২০২৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত সব বকেয়া (প্রায় ৫৭০ মিলিয়ন ডলার) পরিশোধ করা হয়েছে। এরপর থেকে কোনো বিদেশি সরবরাহকারীর বিল বকেয়া নেই।
বিপিসি, পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েলের কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, দেশের জ্বালানি সরবরাহে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট সক্রিয়। তারা এলআর ভেসেলে জ্বালানি সরবরাহ কমানোর কৌশল প্রয়োগ করছে, যার কারণে ডিজেল ও জেট ফুয়েলের সংকট তৈরি হয়েছে।
এক কর্মকর্তা বলেন, ডিজেলের সংকট হলে পুরো পরিবহন ব্যবস্থা স্থবির হবে। জেট ফুয়েল সরবরাহ না হলে দেশি-বিদেশি উড়োজাহাজের কাজ ব্যাহত হবে। এতে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
সংকট সাময়িক হলেও দেশের পরিবহন ও উড়োজাহাজ শিল্পে প্রভাব পড়তে পারে, যা সরকারের দ্রুত হস্তক্ষেপের প্রয়োজন দেখাচ্ছে।
বিপিসির এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, “৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রতিদিন একটি করে ৩০ হাজার টনের পার্সেল আসবে। এর মধ্যে একটিতে ২৫ হাজার টন জেট ফুয়েল থাকবে।
একেএম আজাদুর রহমান, বিপিসির পরিচালক (অপারেশন ও পরিকল্পনা) বলেন, “সংকট কিছু হয়েছিল। আশা করি সংকট হবে না। সামনে জাহাজের শিডিউল যথানিয়মে এলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।
এক সরবরাহকারী কারসাজির অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এক সরবরাহকারীকে দেওয়া কার্যাদেশ অনুযায়ী একটি পার্সেলের শিডিউল মিস হয়েছে। তারপরও আমাদের যা মজুত রয়েছে, নতুন পার্সেল এলে কোনো সমস্যা হবে না।
এর মাধ্যমে বিপিসি আশা করছে, পরবর্তী পার্সেলগুলোর আগমনে দেশব্যাপী ডিজেল ও জেট ফুয়েলের সরবরাহ স্বাভাবিক হবে এবং পরিবহন ও উড়োজাহাজ সংক্রান্ত সেবা ব্যাহত হবে না।

