দেশের রাজনীতিতে সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে শেখ হাসিনা সরকারের সময় শুরু হওয়া মেগা প্রকল্প ও আন্তর্জাতিক চুক্তি। ওই সময় নিয়ে ব্যাপক অভিযোগ ছিল—রাষ্ট্র পরিচালনায় অস্বচ্ছতা, কমিশননির্ভর দুর্নীতি, এবং জনস্বার্থ উপেক্ষা করে একের পর এক বড় প্রকল্পের অনুমোদন। বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব প্রকল্প দেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি করেছে, বৈদেশিক ঋণ বেড়েছে, পরিবেশগত ঝুঁকি বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সাধারণ মানুষের জীবন–জীবিকাকে সংকটে ফেলে দিয়েছে।
গণ–অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকারের পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান দায়িত্ব ছিল এসব প্রকল্প ও চুক্তি পুনর্বিবেচনা করা, সম্পূর্ণ প্রকাশ করা এবং জাতীয় স্বার্থের বিরুদ্ধে যেসব চুক্তি অযৌক্তিক বা ক্ষতিকর, সেগুলো বাতিলের ব্যবস্থা করা।
কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। অন্তর্বর্তী সরকার পূর্ববর্তী সরকারের বিতর্কিত চুক্তি বহাল রেখেছে। তদুপরি, নতুন করে দীর্ঘমেয়াদি এবং প্রশ্নবিদ্ধ চুক্তি করা হচ্ছে। এসব চুক্তির মেয়াদ অনেক ক্ষেত্রে তিরিশ, চল্লিশ, পঞ্চাশ বছরের বেশি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব চুক্তি শুধু অর্থনৈতিক ভার তৈরি করছে না, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতার ওপরও গভীর প্রভাব ফেলে।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের এখতিয়ারের মধ্যে এমন দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত নেওয়া সাধারণত ঠিক নয়। গণ–অভ্যুত্থানের পর যে নৈতিক ও রাজনৈতিক মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা করা সরকারের দায়িত্ব ছিল, তার উল্টো উদাহরণ এই পদক্ষেপ স্থাপন করছে। ফলে দেশীয় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রশ্ন সৃষ্টি হচ্ছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের নিয়ন্ত্রণ ও চুক্তি প্রসঙ্গ নতুন করে দেশব্যাপী আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। বিশেষ করে লালদিয়া ও পানগাঁও টার্মিনাল নিয়ে দীর্ঘদিনের আপত্তি ও প্রতিবাদের পরও সরকার থেমে থাকেনি। এখন দেশের প্রধান বন্দর নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বিদেশি একটি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করার দিকে দৃঢ়ভাবে এগোচ্ছে।
এতে বন্দরের শ্রমিকরা সরাসরি আন্দোলনে নেমেছেন। তারা কর্মবিরতিতে রয়েছেন, চাকরিচ্যুতির হুমকি পাচ্ছেন, সভা–সমাবেশে নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হচ্ছেন এবং নির্বিচার বদলির শিকার হচ্ছেন। তবে এ আন্দোলন শুধুই শ্রমিকদের নয়। এটি জাতীয় স্বার্থ রক্ষার আন্দোলন হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করাচ্ছেন, দেশের জনগণ শ্রমিকদের এই ঝুঁকি নেওয়ার জন্য কৃতজ্ঞ থাকতে হবে।
নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠান। গত ছয় মাসে এর দক্ষতা ও সক্ষমতা আরও বেড়েছে। সরকার যে যুক্তি দেখাচ্ছে, সক্ষমতা বাড়াতে বিদেশি অপারেটর প্রয়োজন, তা বাস্তবতার সঙ্গে মেলেনি। দক্ষতা বাড়ানোর পথে প্রধান বাধা মূলত কাস্টমস ব্যবস্থাপনা, জাহাজজট এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। এসব সমস্যা সমাধান করা সরকারের নীতিগত ও প্রশাসনিক দায়িত্ব ছিল। প্রয়োজনীয় সংস্কার ও বিনিয়োগের মাধ্যমে জাতীয় সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব ছিল, আর্থিক সক্ষমতার অভাব ছিল না। কিন্তু সে পথে না গিয়ে, সরকার অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় টেন্ডার ছাড়াই বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে বন্দরের নিয়ন্ত্রণ তুলে দিচ্ছে।
চুক্তির ফলে সরকারের আয়ও কমতে পারে। ইতিমধ্যে আমদানি ও রপ্তানিতে বিভিন্ন ধরনের মাশুল বাড়ানো হয়েছে। এর প্রভাব সরাসরি আমদানি ব্যয় বাড়ানো, রপ্তানি প্রতিযোগিতা কমানো এবং জাতীয় অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করা। সরকার সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য মাশুল বৃদ্ধি প্রয়োজন বলে দাবি করছে, কিন্তু টার্মিনাল প্রতিবছর দুই হাজার কোটি টাকার বেশি উদ্বৃত্ত সৃষ্টি করছে। এই তহবিল দিয়েই প্রয়োজনীয় উন্নয়ন সম্ভব। ফলে সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে করা যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, জাতীয় নির্বাচনের ঠিক আগে এই চুক্তি চূড়ান্ত করার তাড়াহুড়া। সরকারের দায়িত্ব ছিল নির্বাচন সুষ্ঠু করা, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং প্রশাসনকে নিরপেক্ষ রাখা। তারপরও শ্রমিক, বিশেষজ্ঞ ও বন্দর ব্যবহারকারীদের আপত্তি উপেক্ষা করা হচ্ছে। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ এই অবকাঠামো কেন আবুধাবিভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানকে হস্তান্তর করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে, তা প্রশ্নবিদ্ধ। এই পরিস্থিতিতে উদ্ভূত প্রশ্ন, শেষ পর্যন্ত কাদের স্বার্থ সরকারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ?
চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র। দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ আমদানি ও রপ্তানি এই বন্দর দিয়েই হয়। তাই এই বন্দরের ওপর বিদেশি কোম্পানির কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার দিক থেকেও ঝুঁকিপূর্ণ। সরকারের যুক্তি দেওয়া হয়, বিশ্বের বহু দেশে বিদেশি কোম্পানি বন্দর পরিচালনা করে। তবে সেসব দেশের বাস্তবতা ভিন্ন। সেখানে শত শত বন্দর রয়েছে এবং বিদেশি অংশগ্রহণ সীমিত, যা শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল। সিঙ্গাপুর, ভারত, মালয়েশিয়া বা চীনের বন্দরগুলোতে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্রের হাতে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশে জাতীয় সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তা দুর্বল দেখিয়ে বিদেশি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হচ্ছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের বাইরে অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যান্য চুক্তিও উদ্বেগজনক। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত শুল্কসংক্রান্ত চুক্তি তার একটি উদাহরণ। ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতি আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। এই পরিস্থিতিতে দর–কষাকষি ও পুনর্বিবেচনার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সরকার গোপনীয়তার সঙ্গে চুক্তি চূড়ান্ত করেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই চুক্তি কার্যত অধীনতামূলক; বাংলাদেশের মানুষকে সমরাস্ত্রসহ উচ্চ মূল্যের অপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানে বাধ্য করছে এবং ভবিষ্যতে বাণিজ্যচুক্তির স্বাধীনতা সীমিত করতে পারে।
সরকারের অগ্রাধিকারও আলোচনার বিষয়। বিপুল ব্যয়ে এলএনজি আমদানি, চীন, জাপান, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে অস্ত্রচুক্তি এবং সামরিক সরঞ্জাম নির্মাণ তৎপরতা চোখে পড়ছে। অথচ শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক খাতে বরাদ্দ আগের সরকারের মতোই সীমিত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের মানুষকে বঞ্চিত করে বিশ্বের অস্ত্র ব্যবসায়ীদের স্বার্থ পূরণ করা হচ্ছে।
আরও উদ্বেগজনক হলো চুক্তিগুলোর পেছনে থাকা ব্যক্তিদের ভূমিকা। কিছু উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারীর অতিরিক্ত উৎসাহ বিপজ্জনক; তাঁরা যেন বিদেশি কোম্পানির লবিস্ট হিসেবে কাজ করছেন। তাদের মধ্যে অনেকের বিদেশি নাগরিকত্ব বা দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকার বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ। এই তাড়াহুড়ার পেছনে রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা, ব্যক্তিগত স্বার্থ, কমিশন, নাকি বিদেশি চাপ—সবকিছুই অনুসন্ধান দাবি করছে।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, দেশের প্রধান বন্দরের নিয়ন্ত্রণ ও বহুমুখী চুক্তি শুধু অর্থনীতিকেই প্রভাবিত করছে না; এটি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, জাতীয় স্বার্থ এবং সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতাকেও ঝুঁকির মুখে ফেলে।
অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব ছিল স্পষ্ট—ক্ষতিকর চুক্তি স্থগিত করা, নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের পথ তৈরি করা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, সরকার গোপনীয়তা, অস্বচ্ছতা ও জনস্বার্থবিরোধী সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতায় আগের সরকারের পথেই এগোচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে এই পথের চেয়ে আরও বেশি রেকর্ড স্থাপন করতে তারা উদ্যমী। বিশ্লেষকরা বলছেন, এভাবে সরকারের তৎপরতা গণ–অভ্যুত্থানের নৈতিক ভিত্তিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে চট্টগ্রাম বন্দর সংক্রান্ত সব চুক্তির তৎপরতা অবিলম্বে স্থগিত করে বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ফিরিয়ে আনা জরুরি। এইভাবে স্বাক্ষরিত চুক্তি বৈধতা পাবে না। জাতীয় স্বার্থ সংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়ে প্রকাশ্য আলোচনার দায়িত্ব আগামী নির্বাচিত সংসদের ওপর বাকি থাকা উচিত।
নির্বাচনের মাঠে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তুলছেন—গণতন্ত্র, স্বচ্ছতা ও জাতীয় স্বার্থের বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ দলগুলো কেন সরকারের জাতীয় স্বার্থবিরোধী চুক্তি তৎপরতা বন্ধের দাবি করছে না। রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করা অপরিহার্য। যারা সত্যিকারের গণতান্ত্রিক রূপান্তর ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশে বিশ্বাসী, তাদের নীরবতা ভাঙতে হবে। পাশাপাশি ব্যবসায়ীদেরও স্বার্থের কারণে এই চুক্তির বিরুদ্ধে কথা বলা জরুরি।
পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের দায়িত্ব হবে—সব চুক্তির শ্বেতপত্র প্রকাশ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা তদন্ত এবং নিশ্চিত করা যে অনুসন্ধান শেষ হওয়ার আগে কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি দেশ ছাড়তে না পারে। বিশ্লেষকরা বলছেন, রাষ্ট্রীয় স্বার্থ রক্ষার এই ন্যূনতম দায়বদ্ধতাই এখন সময়ের সবচেয়ে জরুরি দাবি।

