দেশে মূল্যস্ফীতির হার টানা তিন মাস ধরে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখাচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) গতকাল ৮ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত তথ্যে দেখা গেছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে সাধারণ মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮.৫৮ শতাংশে। এটি গত বছরের মে মাসের পর সর্বোচ্চ।
বিবিএসের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.১৭ শতাংশ। নভেম্বর মাসে তা বেড়ে ৮.২৯ শতাংশে উন্নীত হয় এবং ডিসেম্বরের শেষে দাঁড়ায় ৮.৪৯ শতাংশে। জানুয়ারির এই বৃদ্ধির ফলে চলতি বছরের শুরুতেই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা আরও স্পষ্ট হলো। তুলনামূলকভাবে, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে এই হার ছিল ৯.৯৪ শতাংশ।
বিশেষভাবে খাদ্যপণ্যের দাম জানুয়ারিতে বেড়ে ৮.২৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে, খাদ্যবহির্ভূত (নন-ফুড) পণ্যের মূল্যস্ফীতি ৮.৮১ শতাংশে রেকর্ড করা হয়েছে। বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, সরবরাহ শৃঙ্খল অব্যবস্থাপনা, বাজার ব্যবস্থাপনায় অদক্ষতা এবং নির্বাচনের আগে নগদ অর্থের প্রবাহ বৃদ্ধিই মূলত এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার কারণ। অতিরিক্ত নগদ প্রবাহ চাহিদা বাড়িয়ে পণ্যের দাম বৃদ্ধির দিকে পরিচালিত করছে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, এই পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার উপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে নিম্ন এবং মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে বেশি প্রভাব অনুভব করছে। বাজার বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না এলে আগামী মাসগুলোতে আরও চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্যহীনতার কারণে দাম আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) জানাচ্ছে, বিশ্ববাজারে টানা পাঁচ মাস ধরে খাদ্যপণ্যের দাম কমেছে। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের কারণে দেশে বৈদেশিক মুদ্রার অবস্থা ভালো রয়েছে, শীত মৌসুমের আবহাওয়াও অনুকূল। এসব ইতিবাচক প্রেক্ষাপট থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশে দাম বৃদ্ধির প্রবণতা কমেনি। ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার দেশের মানুষের প্রধান প্রত্যাশা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন ১৮ মাসের মেয়াদে বাজারে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে কোনো কার্যকর ফলাফল দেখা যায়নি।
আন্তর্জাতিক দিক থেকে বাংলাদেশ থেকে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির গড় হার ছিল ৪.৫ শতাংশ। স্ট্যাটিস্টার ও জেপি মরগান রিসার্চের তথ্য দেখায়, বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি কমে ৩–২ শতাংশের মধ্যে নেমেছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলংকা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সফল হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ভারতের নভেম্বরে মূল্যস্ফীতি ০.৭১ শতাংশে নেমে আসে। শ্রীলংকায় বছরের অর্ধেকের বেশি সময় ঋণাত্মক ধারায় মূল্যস্ফীতি বিরাজ করলেও ডিসেম্বরের শেষে ২.১০ শতাংশে নেমে আসে। পাকিস্তানও ২০২৫ সালে বছরের শেষ মাসে মূল্যস্ফীতি ৫.৬ শতাংশে নামাতে সক্ষম হয়েছে।
দেশে মূল্যস্ফীতি ২০২২ সালের পর থেকে ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। ডলার সংকটের কারণে টাকার অবমূল্যায়ন ঘটেছে; মাত্র আড়াই বছরে প্রতি ডলারের মান বেড়ে ১২০ টাকা ছাড়িয়ে যায়। এ সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২০২৩ সাল থেকে সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি প্রণয়ন করে এবং সুদহার ১০ শতাংশে উন্নীত করে। তবুও দাম নিয়ন্ত্রণে আসেনি। বিদায়ী বছরের নভেম্বর, ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে সবজি, চাল, ডাল, চিনি, আটা, মাছ-মাংস এবং এলপিজি গ্যাসের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। শীত মৌসুমে সবজির দাম কমলেও তা ক্রেতা পর্যায়ে প্রতিফলিত হয়নি। ফলে মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশিত মাত্রায় কমেনি।
পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব আলেয়া আক্তার বলেন, “বিবিএস তথ্য সংগ্রহ করে প্রতিবেদন প্রকাশ করে, বিশ্লেষণ নীতিনির্ধারকরা করেন। মূল্যস্ফীতির জন্য দেশের ১৫৪টি বাজারের তথ্য নেয়া হয়।”
অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার মাত্র দুই দিন পর ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের দায়িত্বকালীন ১৮ মাসের মূল্যস্ফীতির পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০২৪ সালের আগস্টে এটি ছিল ১০.৪৯ শতাংশ। নভেম্বরে বেড়ে ১১.৩৮ শতাংশে পৌঁছায়। ২০২৫ সালে কমতে শুরু করে এবং ডিসেম্বরে ৮.৪৯ শতাংশে নেমে আসে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে এটি আবারো বেড়ে ৮.৫৮ শতাংশে দাঁড়ায়।
খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি:
বিবিএস জানিয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে সাধারণ মূল্যস্ফীতির বৃদ্ধির প্রধান চালক ছিল খাদ্যপণ্যের দাম। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮.২৯ শতাংশে, যা ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ছিল ৭.৭১ শতাংশ। তবে তুলনামূলকভাবে দেখা যায়, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল আরও বেশি, ১০.৭২ শতাংশ। অন্যদিকে, খাদ্যবহির্ভূত (নন-ফুড) পণ্যের মূল্যস্ফীতি জানুয়ারিতে সামান্য কমে ৮.৮১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এর আগে ডিসেম্বর ২০২৫-এ নন-ফুড মূল্যস্ফীতি ছিল ৯.১৩ শতাংশ, আর ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ছিল ৯.৩২ শতাংশ।
খাদ্যপণ্যের দামের ওঠানামা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জন্য এই বৃদ্ধি চাপ তৈরি করছে। অন্যদিকে, নন-ফুড পণ্যের দাম সামান্য কমার ফলে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির ভারসাম্য কিছুটা রক্ষা পেয়েছে।
গ্রাম ও শহরে দামের পার্থক্য:
বিবিএস জানাচ্ছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে দেশের গ্রামীণ ও শহর এলাকায় মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি ভিন্ন আকারে প্রতিফলিত হয়েছে। গ্রামীণ এলাকায় সাধারণ মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮.৬৩ শতাংশে। এর আগে ডিসেম্বরে এটি ছিল ৮.৪৮ শতাংশ। গত বছরের জানুয়ারির তুলনায় (১০.১৮%) এখনও কিছুটা কম। খাদ্যপণ্যের দাম গ্রামে বেড়ে ৮.১৮ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ডিসেম্বরের ৭.৬৭ শতাংশের তুলনায় বৃদ্ধি। অন্যদিকে, খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতি গ্রামে ৯.০৪ শতাংশ হয়েছে।
শহর এলাকায় জানুয়ারিতে সাধারণ মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮.৫৭ শতাংশ, যা ডিসেম্বরে ৮.৫৫ শতাংশ ছিল। শহরের খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮.৬১ শতাংশে, যেখানে ডিসেম্বরের মান ছিল ৭.৮৭ শতাংশ। নন-ফুড বা খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের দাম শহরে সামান্য কমে ৮.৫৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তবে গত বছরের জানুয়ারিতে শহরে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ৯.৮৯ শতাংশ, যা বর্তমানে কিছুটা কম।
গ্রাম ও শহরের মধ্যে খাদ্য ও নন-ফুড পণ্যের দামের ওঠানামা স্থানীয় সরবরাহ ও চাহিদার ওপর নির্ভরশীল। শহরে নন-ফুড পণ্যের দাম সামান্য কমলেও গ্রামে তা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সামগ্রিকভাবে দেশব্যাপী মূল্যস্ফীতিকে প্রভাবিত করছে।
মজুরি ও দামের ভারসাম্যহীনতা:
২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে দেশের মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮.০৮ শতাংশ। এটি ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ৮.০৭ শতাংশের তুলনায় সামান্য বেশি। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, টানা ৪৮ মাস ধরে মজুরি বৃদ্ধির হার সর্বদা মূল্যস্ফীতির তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। অর্থাৎ সাধারণ মানুষ আয়ের দিক থেকে মূল্যস্ফীতির চাপের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কৃষি খাতে মজুরি বৃদ্ধির হার ৮.১২ শতাংশ, শিল্পখাতে ৭.৯৮ শতাংশ এবং সেবা খাতে ৮.২৪ শতাংশ।
মজুরি বৃদ্ধির এই ধীরগতি যদি অব্যাহত থাকে, তবে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা আরও ক্ষীণ হবে এবং চলমান মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়বে। বিশেষ করে নিম্ন ও স্থির আয়ের মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ওপর এর প্রভাব মারাত্মক হতে পারে।
মোস্তফা কে. মুজেরির বিশ্লেষণ:
ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইএনএম)-এর নির্বাহী পরিচালক মোস্তফা কে. মুজেরি সতর্ক করে বলছেন, বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে মূল্যস্ফীতি কমানোর কার্যকর উদ্যোগের ফল এখনও দৃশ্যমান নয়। তিনি মনে করছেন, সামনে আসা নির্বাচন, সরকারি নির্বাচনি ব্যয়, প্রার্থীদের প্রচারণা ব্যয় এবং প্রবাসীদের রেমিট্যান্সের কারণে বাজারে নগদ অর্থের প্রবাহ বেড়েছে। এর প্রভাব বিশেষভাবে খাদ্যপণ্যের ওপর পড়ছে।
তবে একই সময়ে সরবরাহ ব্যবস্থা ও বিপণন কাঠামোর উন্নতি হয়নি। তিনি জানান, “সামনে রমজান থাকায় দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কিছু পণ্যের ওপর শুল্ক কমানো হলেও বাজারে তা বিশেষ প্রভাব ফেলেনি। কৃষক ন্যায্য দাম না পেলেও ভোক্তা পর্যায়ে দাম বেশি থাকছে। এই মধ্যবর্তী বাজার কাঠামোর সংস্কার ছাড়া খাদ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।

মোস্তফা মুজেরি আরও বলেন, শুধুমাত্র নীতিসুদ বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এর জন্য বাজার ব্যবস্থাপনা ও আমদানি ব্যবস্থায় কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন। তিনি মনে করেন, নতুন সরকারকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাজার ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা, সরবরাহ শৃঙ্খলা উন্নত করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও উৎপাদন বাড়ানো—এগুলোতে বিশেষ নজর দিতে হবে। নইলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
ড. জাহিদ হোসেনের পর্যবেক্ষণ:
বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির প্রধান কারণ হলো খাদ্য মূল্যস্ফীতি। তিনি বলেন, “খাদ্যবহির্ভূত খাতে সামগ্রিকভাবে বড় বৃদ্ধি না থাকলেও হাউজিং, গ্যাস, বিনোদন ও সংস্কৃতি এবং বিবিধ উপখাতে মূল্যচাপ লক্ষ্য করা গেছে। সরবরাহ ও চাহিদা—উভয় দিক থেকেই মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ রয়েছে।”

ড. জাহিদ হোসেন আরও উল্লেখ করেছেন, জানুয়ারি মাসে এলপিজি ও গ্যাস সংকটের কারণে সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছিল। অন্যদিকে, নির্বাচনী ব্যয়ের কারণে চাহিদাপক্ষ থেকেও মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। তবে এই সময়ে বিনিময় হার স্থিতিশীল ছিল এবং সরকারি ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়নি।
তিনি সতর্ক করে বলেন, যেহেতু মূল্যস্ফীতি কমার সুস্পষ্ট প্রবণতা দেখা যাচ্ছে না, তাই বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত নীতিসুদ বর্তমান অবস্থানে রাখা এবং বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখার নীতি অব্যাহত রাখা।
নীতিসুদ বাড়ানো বা কমানো ছাড়াও বাজার ব্যবস্থাপনা, সরবরাহ শৃঙ্খলা এবং নির্বাচনকালীন নগদ প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের মতো কাঠামোগত পদক্ষেপ জরুরি। এ ছাড়া খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে।

