চট্টগ্রাম বন্দরে শ্রমিক-কর্মচারীদের অনির্দিষ্টকালীন ধর্মঘট সাতদিনের জন্য (৯-১৫ ফেব্রুয়ারি) স্থগিত করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। তবে শ্রমিক নেতারা এই সময়ের মধ্যে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সমাধান চেয়েছেন। অন্যথায় তারা ১৬ ফেব্রুয়ারি নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
সরকারি ও বেসরকারি খাতের হিসাব অনুযায়ী, সাতদিনের ধর্মঘটের কারণে বন্দর ও কাস্টমস মিলিয়ে মোট ১ হাজার ৮৫৫ কোটি ৪০ লাখ ১২ হাজার টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
গত ৩১ জানুয়ারি থেকে ৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত (৬ ও ৭ ফেব্রুয়ারি ছাড়া) শ্রমিক-কর্মচারীরা সাতদিনের ধর্মঘট পালন করেছেন। তাদের মূল দাবিগুলো ছিল— নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) চুক্তি বাতিল, বন্দর চেয়ারম্যানের প্রত্যাহার, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে বদলি, চার্জশিট, সাময়িক বরখাস্ত ও পদাবনতি বাতিল, এবং আন্দোলনরত শ্রমিক নেতাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ বন্ধ। ধর্মঘটে নেতৃত্ব দিয়েছেন চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক মোহাম্মদ হুমায়ূন কবীর ও ইব্রাহীম খোকন।
গত রবিবার (৮ ফেব্রুয়ারি) রাতে শ্রমিক নেতারা কর্মসূচি চালানোর ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু মধ্যরাতে তারা সাতদিনের জন্য ধর্মঘট স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেন। এ সময় পাঁচটি সমস্যার সমাধান চাওয়ার শর্তও রাখা হয়।
শ্রমিক নেতাদের পাঁচটি দাবি:
১. চট্টগ্রাম বন্দরের ৫ জন কর্মচারীর গ্রেপ্তার ও হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার।
২. চট্টগ্রাম বন্দরের ১৫ জন কর্মচারীর বাংলাদেশে বিভিন্ন বন্দরে হয়রানিমূলক বদলি বাতিল।
৩. আন্দোলনরত কর্মচারীদের নানাবিধ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বাতিল।
৪. আন্দোলনরত কর্মচারীদের বাসা বরাদ্দ বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা।
৫. ১৬ জন কর্মচারীর সাময়িক বরখাস্তসহ অন্যান্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বাতিল।
মোহাম্মদ হুমায়ূন কবীর বলেন, “চট্টগ্রাম বন্দরে এনসিটি চুক্তি না করার সিদ্ধান্ত বর্তমান সরকারের আমলে নিশ্চিত হয়েছে। তবে হয়রানিমূলক মামলা, বদলি, শাস্তি, বাসা বরাদ্দ বাতিল ও সাময়িক বরখাস্ত বিষয়ে আমাদের নেতাদের সঙ্গে সন্তোষজনক আলোচনা প্রয়োজন।” তিনি জানান, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও রমজানের পণ্য খালাসের স্বার্থে ধর্মঘট ৯ ফেব্রুয়ারি সকাল ৮টা থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত স্থগিত রাখা হয়েছে। পাঁচটি সমস্যা সমাধান না হলে ১৬ ফেব্রুয়ারি সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
সাত দিনের ক্ষতির হিসাব:
চট্টগ্রাম বন্দর গত বছর ৫ হাজার ৪৬০ কোটি টাকা আয় করেছে। প্রতিদিন গড়ে ১৫ কোটি টাকা আয় হিসেবে, সাত দিনের ধর্মঘটের ফলে সরকার ১০৫ কোটি টাকার রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হয়েছে। চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস বছরে গড়ে ৭০ হাজার কোটি টাকা আয় করে। ধর্মঘটের কারণে গত সাত দিনে তারা ১ হাজার ৩৪৪ কোটি টাকা আয় থেকে বঞ্চিত হয়েছে। ফলে বন্দর ও কাস্টমসের মিলিত ক্ষতি দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪৪৯ কোটি টাকা।
বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন জানিয়েছেন, সাত দিনের ধর্মঘটে ৫৪ হাজার কনটেইনার বন্দরে আটকা পড়ে। জাহাজগুলো জেটিতে ভিড়তে না পারায় ১১৪টি জাহাজ পণ্য খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে। এ পণ্যের মধ্যে রয়েছে খেজুর, ফলমূল, চিনি, তেল, গম, ডাল ও শিল্পের কাঁচামাল। পণ্য সময়মতো খালাস না হওয়ায় আমদানিকারকদের একটি জাহাজের জন্য দৈনিক ১৬ লাখ থেকে ১৮ লাখ টাকা অতিরিক্ত মাশুল দিতে হয়েছে। এতে ৭ দিনে তাদের অতিরিক্ত খরচ হয়েছে ১৩৮ কোটি ৩৪ লাখ টাকা।
বিজিএমইএ জানিয়েছে, ধর্মঘটের কারণে পোশাক খাতের আমদানি ও রপ্তানি প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার পণ্য আটকে গেছে। চট্টগ্রামে ২১টি বেসরকারি ডিপোতে দৈনিক আয় গড়ে ৮ কোটি টাকা। সাত দিনের কর্মবিরতিতে ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৫৬ কোটি টাকা। সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, তারা ২০০ কোটি টাকার বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে।
আন্তঃজিলা মালামাল পরিবহন সংস্থা ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান মালিক সমিতির হিসাব অনুযায়ী, ধর্মঘটে প্রতিদিন ১২ হাজার গাড়ির মালিকের ক্ষতি হয়েছে ৯ কোটি ৭৭ লাখ ১৬ হাজার টাকা। সাত দিনে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬৮ কোটি ৪০ লাখ ১২ হাজার টাকায়।
সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক কাজী মাহমুদ ইমাম বিলু বলেন, “সঠিক ক্ষতির পরিমাণ হিসাব করা কঠিন। তবে পোশাক খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কাঁচামাল খালাস ও প্রস্তুত পোশাক জাহাজীকরণ নির্ধারিত সময়ে সম্ভব হয়নি।”
আন্তঃজিলা মালামাল পরিবহন সংস্থা ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক চৌধুরী জাফর আহ্মদ বলেন, আমাদের গাড়ির দৈনন্দিন খরচ রয়েছে। ধর্মঘটের কারণে কোটি কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে। বিশেষ করে বেসরকারি ডিপোগুলোতেও পরিবহনে বড় ধাক্কা লেগেছে।”

