অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা হালনাগাদ, দাম নির্ধারণ এবং নীতিমালা প্রণয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত অন্তর্বর্তী সরকার গ্রহণ করেছে, তবে তা তাড়াহুড়ো ও শিল্পমালিকদের সঙ্গে কোনো পরামর্শ ছাড়াই করা হয়েছে। ওষুধ খাতের মালিকরা সতর্ক করেছেন, এসব পদক্ষেপ দেশের ওষুধ শিল্পে অস্থিরতা বাড়াতে পারে এবং প্রকৃত ব্যবসায়ীরা লোকসান ভোগ করতে পারেন।
বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির মহাসচিব ও ডেল্টা ফার্মা লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মো. জাকির হোসেন জানান, দেশীয়ভাবে উৎপাদিত ওষুধের মাধ্যমে দেশের চাহিদার বড় অংশ পূরণ হয় এবং ১৫০টির বেশি দেশে ওষুধ রপ্তানি করা হয়। ডলারের হার বৃদ্ধির কারণে কাঁচামালের খরচ বেড়ে যাওয়ায় ওষুধ উৎপাদনের ব্যয়ও বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি বলেন, “দেশে উৎপাদিত বেশির ভাগ ওষুধ ন্যূনতম লাভের ভিত্তিতে বিক্রি হয়। সরকার ওষুধ শিল্পমালিকদের সঙ্গে আলোচনা না করে দাম নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে বেশির ভাগ কারখানা লোকসানে পড়বে এবং অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হতে পারে।”
ড. জাকির হোসেন প্রশ্ন তুলেছেন, যারা এই নীতিমালা প্রণয়ন করেছেন, তাদের মধ্যে প্রকৃত ওষুধ শিল্পমালিক কতজন আছেন এবং কারখানার বাস্তব অভিজ্ঞতা ছাড়া তারা কীভাবে উৎপাদনের খরচ সঠিকভাবে বুঝবেন। তিনি আরও বলেন, “অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা হাতে পাওয়ার পর আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিবাদ জানানো হবে। অযৌক্তিক দাম নির্ধারণ হলে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
উল্লেখযোগ্য হলো, নতুন নীতিমালায় ১৩৫টি ওষুধ অন্তর্ভুক্ত করে মোট অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের সংখ্যা ২৯৫ করা হয়েছে। এই ওষুধগুলো দেশের ৮০ শতাংশ মানুষ ব্যবহার করেন। তালিকাভুক্ত ওষুধের মধ্যে ক্যানসার, ডায়াবেটিস ও অন্যান্য সংক্রামক এবং অসংক্রামক রোগের ওষুধ রয়েছে।
মূল্য সমন্বয় নিয়ে সরকারের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো চার বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে দাম সমন্বয় করতে পারবে। নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, জেনেরিক ওষুধের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৩৩ শতাংশ পর্যন্ত দাম বাড়ানো যাবে। পুনঃপ্যাকেটজাত বাল্ক সার্জিক্যাল ওষুধের দাম ১.৫০ টাকা থেকে ২ টাকা পর্যন্ত এবং মুখে খাওয়ার অ্যান্টিবায়োটিকের দাম ২.৩০ থেকে ৩.০৬ টাকায় বৃদ্ধি পাবে। স্টেরাইল ও হরমোন-স্টেরয়েড ওষুধের সর্বোচ্চ মূল্য সর্বোচ্চ ৩২.৯ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে।
কাঁচামালের আমদানি নিয়ন্ত্রণেও নতুন শর্ত যোগ করা হয়েছে। ডিজিজিএ থেকে অনাপত্তিপত্র ছাড়াই কাঁচামাল আমদানির অনুমতি থাকবে না। দেশে পর্যাপ্ত কাঁচামাল না থাকলে বা স্থানীয় কাঁচামালের দাম আন্তর্জাতিক দরের চেয়ে ২০ শতাংশ বেশি হলে অনাপত্তিপত্র দেওয়া হবে। আবেদন জমা দেওয়ার সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রক্রিয়া শেষ করার নির্দেশ রয়েছে।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আব্দুল মুক্তাদির জানিয়েছেন, নতুন নীতিমালা শিল্প খাতকে যথাযথভাবে সম্পৃক্ত না করেই প্রণয়ন করা হয়েছে। তিনি সতর্ক করেছেন, “এটি বাস্তবায়িত হলে অনেক ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যেতে পারে।”
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম মনে করান, সরকারের এই সিদ্ধান্ত ওষুধ খাতে অস্থিরতা সৃষ্টি করবে। তিনি বলেন, “ওষুধ শিল্পমালিকদের সঙ্গে পরামর্শ না করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত ছিল না। দেশের স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের চাপের মধ্যে এসব পদক্ষেপ সমগ্র শিল্প খাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।”

