আগামী সপ্তাহের নির্বাচন-উত্তর সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে—এ রাজনৈতিক রূপান্তরকে কীভাবে বাস্তব অর্থনৈতিক পরিবর্তনে রূপ দেয়া যায়। বিশেষ করে শিল্পনীতি এমনভাবে পুনর্গঠন করতে হবে, যাতে তা ক্ষমতাকেন্দ্রিক স্বার্থ, স্বল্পমেয়াদি প্রবৃদ্ধির মোহ কিংবা সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর চাপে বন্দি না থাকে; বরং দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা, কর্মসংস্থান এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির ভিত্তি গড়ে তোলে।
বাংলাদেশে দীর্ঘ দুঃশাসনের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব শুধু একটি সরকারের পতন নয়; বরং রাষ্ট্র পরিচালনার পুরনো দর্শন ও রাজনৈতিক বন্দোবস্তের অবসান ঘটিয়ে একটি নতুন রাষ্ট্রীয় পথচলার দাবি স্পষ্ট করে দিয়েছে। এ অভ্যুত্থান মানুষের মধ্যে যে প্রত্যাশা তৈরি করেছে, তা কেবল রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়—এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামোগত সংস্কারের প্রশ্ন।
সে প্রেক্ষাপটে আগামী সপ্তাহের নির্বাচন-উত্তর সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে—এ রাজনৈতিক রূপান্তরকে কীভাবে বাস্তব অর্থনৈতিক পরিবর্তনে রূপ দেয়া যায়। বিশেষ করে শিল্পনীতি এমনভাবে পুনর্গঠন করতে হবে, যাতে তা ক্ষমতাকেন্দ্রিক স্বার্থ, স্বল্পমেয়াদি প্রবৃদ্ধির মোহ কিংবা সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর চাপে বন্দি না থাকে; বরং দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা, কর্মসংস্থান এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির ভিত্তি গড়ে তোলে। এ বাস্তবতায় প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—নির্বাচন-পরবর্তী সরকারের শিল্পনীতি কি আগের মডেলের সামান্য সংস্করণ হবে, নাকি এটি হবে একটি সাহসী ও কৌশলগত রূপান্তরের সূচনা?
পুরনো শিল্প মডেলের সীমাবদ্ধতা: গত এক দশকে শিল্পনীতির নামে মূলত জমি বরাদ্দ, করছাড়, ব্যাংক ঋণ ও আমদানিনির্ভর উৎপাদনের ওপর নির্ভর করা হয়েছে। কিছু শিল্পগোষ্ঠী বড় হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেই প্রবৃদ্ধি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রযুক্তি স্থানান্তর কিংবা স্থানীয় সক্ষমতা গঠনে টেকসই অবদান রাখতে পারেনি। আজও বাংলাদেশের রফতানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ একটি মাত্র খাতের ওপর নির্ভরশীল। এই একমুখী নির্ভরতা যে কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, তা বৈশ্বিক মন্দা ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার সময় বারবার প্রমাণিত হয়েছে।
শিল্পনীতির লক্ষ্য বদলানো জরুরি: নির্বাচন-পরবর্তী সরকারের শিল্পনীতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু জিডিপি প্রবৃদ্ধি নয়, বরং ঝুঁকি হ্রাস, স্থানীয় সক্ষমতা তৈরি এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা অর্জন। শিল্পনীতি মানে কেবল বিনিয়োগ আহ্বান বা বড় প্রকল্প ঘোষণা নয়। রাষ্ট্র কীভাবে উদ্যোক্তার ঝুঁকি কমাবে, প্রযুক্তি শেখার সুযোগ তৈরি করবে এবং ন্যায্য প্রতিযোগিতার পরিবেশ নিশ্চিত করবে—এ প্রশ্নগুলোর স্পষ্ট উত্তরই একটি কার্যকর শিল্পনীতির ভিত্তি।
অগ্রাধিকার খাত নির্ধারণে দেরি করা যাবে না: নির্বাচনের পর প্রথম এক বছরের মধ্যেই সরকারকে স্পষ্ট করতে হবে—আগামী এক দশকে বাংলাদেশ কোন কোন খাতে সক্ষমতা গড়ে তুলতে চায়। সব খাতে একসঙ্গে এগোনো বাস্তবসম্মত নয়। বরং সীমিত কয়েকটি খাতে গভীর মনোযোগই কার্যকর ফল দিতে পারে। সে জন্য সরকারকে শিল্প খাতে অগ্রাধিকার ঠিক করতে হবে।
বাস্তবসম্মত অগ্রাধিকার হতে পারে—
- বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি (ইভি) ও ব্যাটারি অ্যাসেম্বলি
- ড্রোন ও লাইট এভিয়েশন কম্পোনেন্ট
- কৃষিভিত্তিক প্রসেসিং ও কোল্ড চেইন
- মেডিকেল ডিভাইস ও ডায়াগনস্টিক সরঞ্জাম
- সেমিকন্ডাক্টর প্যাকেজিং ও টেস্টিং (ফুল ফ্যাব নয়)
এ খাতগুলোতে ধাপে ধাপে সক্ষমতা তৈরি করা গেলে বাংলাদেশ বৈশ্বিক শিল্পমূল্য শৃঙ্খলে বাস্তব অবস্থান নিতে পারবে।
রাষ্ট্রের ভূমিকা: মালিক নয়, সহায়ক: নতুন শিল্পনীতিতে রাষ্ট্রের ভূমিকা হবে সহায়ক—মালিক নয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব উদ্যোক্তার জায়গায় বসা নয়, বরং—
- সুস্পষ্ট নীতিগত দিকনির্দেশনা দেয়া
- আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা কার্যকরভাবে কমানো
- অবকাঠামো ও দক্ষ মানবসম্পদ নিশ্চিত করা
- প্রযুক্তি পরীক্ষার জন্য ল্যাব, টেস্টিং ও সার্টিফিকেশন সুবিধা গড়ে তোলা
রাষ্ট্র যদি নিজেকে উদ্যোক্তার সহযোগী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তবে প্রকৃত শিল্পায়নের পথ খুলবে।
আর্থিক ব্যবস্থার সংস্কার ছাড়া শিল্পায়ন অসম্ভব:
শিল্পনীতির সবচেয়ে বড় অন্তরায় হলো রাজনৈতিক প্রভাবাধীন আর্থিক ব্যবস্থা। খেলাপি ঋণ, প্রভাবশালী গোষ্ঠীর বিশেষ সুবিধা এবং দীর্ঘমেয়াদি শিল্প ঋণের অভাব—এ বাস্তবতা পরিবর্তন না হলে কোনো শিল্পনীতিই সফল হবে না। নির্বাচন-পরবর্তী সরকার যদি ব্যাংক খাতকে রাজনৈতিক চাপমুক্ত করতে না পারে, তবে শিল্পনীতি কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
মানবসম্পদ ও প্রযুক্তিই মূল শক্তি: শিল্প মানেই শুধু কারখানা নয়—মানুষই আসল শক্তি। তাই শিল্পনীতির সঙ্গে থাকতে হবে—
- কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষার আধুনিকায়ন
- শিল্প-বিশ্ববিদ্যালয় যৌথ গবেষণা
- স্থানীয় প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদ তৈরিতে লক্ষ্যভিত্তিক বিনিয়োগ
যে দেশ নিজের মানুষকে প্রযুক্তি শেখাতে পারে না, সে দেশ শিল্পে আত্মনির্ভর হতে পারে না।
সময় সীমিত, সিদ্ধান্ত জরুরি:
২০২৬ থেকে ২০৩০—এই সময়কালটি বাংলাদেশের জন্য একটি নির্ণায়ক জানালা। এ সময়ে সঠিক শিল্পভিত্তি গড়ে তুলতে ব্যর্থ হলে দেশটি দীর্ঘদিন নিম্ন-মধ্যম আয়ের ফাঁদে আটকে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে। নির্বাচনের পর সরকার যদি আবার স্বল্পমেয়াদি জনপ্রিয়তা, প্রদর্শনমূলক প্রকল্প আর পুরনো সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর চাপে পড়ে—তবে জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা অপূর্ণই থেকে যাবে।
পরিশেষে, শিল্পনীতি এখন আর বিলাসিতা নয়—এটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের প্রশ্ন। সাহসী, নির্বাচিত খাতভিত্তিক ও বাস্তবসম্মত শিল্পনীতি ছাড়া নির্বাচন-পরবর্তী বাংলাদেশ সামনে এগোতে পারবে না। সুযোগ এখনো আছে। কিন্তু সময় আর অপেক্ষা করছে না।
মহিউদ্দিন আহমেদ: কানাডা প্রবাসী লেখক; গ্রন্থ ‘শিল্প রূপান্তরেই বদলে যাবে বাংলাদেশ’
সূত্র: বণিক বার্তা

