বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতি এক অদ্ভুত অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাপক বেকারত্ব এবং স্বর্ণের চড়া দর আন্তর্জাতিক বাজারকে দমিয়ে দিয়েছে। এই আর্থিক চাপের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে লোহিত সাগরের তলদেশে ইন্টারনেট কেবল কাটা পড়ার মতো প্রযুক্তিগত বিপর্যয়। গত বছর এই কারণে আন্তঃমহাদেশীয় ইন্টারনেট সেবায় বড় ধরনের বিঘ্ন দেখা দেয়। শুধু তাই নয়, সাইবার সিকিউরিটি সফটওয়্যার আপডেটের ত্রুটির কারণে বিশ্বব্যাপী হাজার হাজার বিমান ও ব্যাংক সেবা বন্ধ হয়ে যায়। এর প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক বাণিজ্যের লজিস্টিকস ও আর্থিক লেনদেনে, যা ক্ষতির পরিধি আরও বাড়িয়েছে।
দুবাইভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান রোল্যান্ড বার্জারের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান বিশ্বে পলিক্রাইসিস বা বহুমুখী সংকট স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মহামারী, জলবায়ু পরিবর্তন, যুদ্ধ এবং প্রযুক্তিগত বিপর্যয় একই সময়ে সংঘটিত হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির পার্টনার মোহাম্মদ ইয়ামুত বলেন, “যখন একাধিক সংকট একসঙ্গে আসে, তখন প্রভাব মারাত্মক হয়। মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব, জলবায়ু পরিবর্তন ও যুদ্ধের মতো সমস্যা মানুষের জীবনমানকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে এবং দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতাও সীমিত করছে।”
পলিক্রাইসিস মোকাবিলায় উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো—আবুধাবি, দুবাই, রিয়াদ ও দোহার মতো শহরগুলো—দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার মাধ্যমে নেতৃত্ব দিচ্ছে। আইএমডি বিজনেস স্কুলের ফিন্যান্সের অধ্যাপক আরতুরো ব্রিস জানান, “সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলো ভবিষ্যতের জন্য বড় ধরনের আর্থিক বিনিয়োগের ঝুঁকি নিচ্ছে। এটি এক ‘বিগ গ্যাম্বল’ বা বড় বাজি।” উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, “২০১৭ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাত বিশ্বের প্রথম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন করেছে, যা এ ধরনের ঝুঁকি গ্রহণের সাহস প্রদর্শন করে। ইউরোপের অনেক দেশ সাধারণত এত বড় ঝুঁকি নিতে চায় না।”
উপসাগরীয় দেশগুলো প্রযুক্তি ব্যবহারেও অনেক এগিয়ে। আবুধাবি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ভূস্থানিক (জিওস্প্যাশিয়াল) প্রযুক্তি ব্যবহার করে বন্যা ও পরিবেশগত ঝুঁকির ওপর নজর রাখছে। এতে বিপর্যয় আসার আগেই সতর্কতা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে এবং ঘরবাড়ি ও অবকাঠামোর বড় ধরনের ক্ষতি রোধ করা যাচ্ছে। সৌদি আরবের রিয়াদে বড় প্রকল্পগুলোর সমন্বয়ের জন্য ডাটা অ্যানালিটিকস ব্যবহার করা হচ্ছে। দুবাইয়ের ‘২০৪০ আরবান মাস্টার প্ল্যান’-এর আওতায় চালকবিহীন যানবাহন ও স্মার্ট বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থা (স্মার্ট গ্রিড) তৈরি করা হচ্ছে। এসব উদ্যোগ বহুমুখী সংকটের ঝুঁকি কমিয়ে ব্যবসার পরিবেশকে স্থিতিশীল রাখছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রথাগত সংকট ব্যবস্থাপনা আর কার্যকর নয়। অধ্যাপক আরতুরো ব্রিস বলেন, “ভবিষ্যৎ আগের মতো অনুমানযোগ্য নয়। তাই শুধু নির্দিষ্ট ঝুঁকি প্রতিরোধের পরিকল্পনা নয়, এমন একটি কাঠামো দরকার যা অজানা পরিস্থিতিতেও দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে পারে। পলিক্রাইসিসের এই যুগে যারা প্রযুক্তিতে সাহসী বিনিয়োগ করবে এবং পরিবর্তনকে গ্রহণ করবে, তারাই বৈশ্বিক বাণিজ্যে টিকে থাকবে।”

