আজ (১২ ফেব্রুয়ারির) নির্বাচনের পর নতুন সরকার দায়িত্ব নিতে যাচ্ছে। দায়িত্বের শুরুতেই তাদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে গ্যাস ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি।
সাম্প্রতিক সময়ে উৎপাদন ও আমদানি বাড়ায় লোডশেডিং আগের তুলনায় কমেছে। তবে শিল্প খাতে জ্বালানির ঘাটতি দীর্ঘদিনের। গৃহস্থালির লাখো গ্রাহক লাইনে গ্যাস না পেলেও নিয়মিত বিল দিচ্ছেন। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, বাড়তি চাহিদার মুখে সংকট আবার তীব্র হতে পারে।
ফেব্রুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহ থেকে রোজা শুরু হবে। শীত বিদায় নিয়ে তাপমাত্রা বাড়বে। সামনে বোরো ধানের সেচ মৌসুম। একই সময়ে নতুন সরকার দায়িত্ব নিলে বন্ধ থাকা অনেক শিল্পকারখানা চালু হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। ফলে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের চাহিদা দ্রুত বাড়বে। কিন্তু সরবরাহ সীমিত থাকলে ঘাটতি আরও প্রকট হতে পারে।
বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান পরিস্থিতি নিয়ে খুব বেশি উদ্বিগ্ন নন। তাঁর মতে, গত গরমেও বড় সংকটের আশঙ্কা ছিল। শেষ পর্যন্ত মাঝারি মাত্রার লোডশেডিং করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া গেছে। আসন্ন মৌসুমেও একইভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
তবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগ একাধিক বৈঠক করেও পুরোপুরি স্বস্তিদায়ক সমাধান পায়নি। কোম্পানিগুলোর বড় অঙ্কের বকেয়া, ভর্তুকির চাপ এবং জ্বালানি আমদানির সীমাবদ্ধতা বড় বাধা হয়ে আছে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সদস্য (উৎপাদন) জহুরুল ইসলাম জানান, গত বছর এপ্রিল-মে মাসে চাহিদা ১৭ হাজার ২০০ মেগাওয়াটে উঠেছিল। তখন প্রায় এক হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হয়। এবার একই সময়ে চাহিদা ১৮ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পরিকল্পনায় কিছু লোডশেডিং ধরেই প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র চালাতে দৈনিক ১২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস চাওয়া হয়েছে। পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, তারা এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ করতে পারবে। ফলে ঘাটতির আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
বর্তমানে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতে দৈনিক ৭৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ হয়। ফেব্রুয়ারিতে তা আরও ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট বাড়ানোর কথা। পেট্রোবাংলার একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, ফেব্রুয়ারি ও মার্চে দৈনিক ৮০০ থেকে ৮৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস দেওয়া সম্ভব। এপ্রিল থেকে জুনে তা এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুটে নেওয়ার পরিকল্পনা আছে। তবে বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস বাড়ালে গৃহস্থালিতে সরবরাহ কমে যায়। এতে রান্নার জন্য এলপিজির ওপর নির্ভরতা বাড়ে।
সরকারি সূত্রে জানা গেছে, শীত শেষ হওয়ার আগেই কোনো কোনো দিনে এক হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং হয়েছে। ২৯ জানুয়ারি সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ১১০৮ মেগাওয়াট। সেদিন বেলা ২টায় ১১ হাজার ৫০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন ছিল ৯ হাজার ৮৯০ মেগাওয়াট।
তুলনায় ২০২৫ সালের ২৯ জানুয়ারি সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ১২০ মেগাওয়াট। ওই দিন সকাল ৯টায় ১০ হাজার ৩০৯ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন হয়েছিল ১০ হাজার ১৮৩ মেগাওয়াট। এখন অনেক জেলা ও উপজেলা শহরে দিনে দুই থেকে তিনবার এক ঘণ্টা করে বিদ্যুৎ যাচ্ছে।
কয়লাচালিত কয়েকটি বড় তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন জটিলতায় রয়েছে। এর মধ্যে রামপালের ১৩২০ মেগাওয়াট এবং চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে এস আলম গ্রুপের ১৩২০ মেগাওয়াট কেন্দ্র উল্লেখযোগ্য।
অন্যদিকে এলপিজি আমদানিতেও ঘাটতি দেখা দিয়েছে। ডিসেম্বর থেকে সরবরাহে টান পড়ে। নির্ধারিত ১ হাজার ৩৫০ টাকার ১২ কেজির সিলিন্ডার আড়াই হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে। পরে দাম কিছুটা কমলেও এখনো নির্ধারিত মূল্যের ওপরে রয়েছে।
সরকার জানুয়ারিতে ১ লাখ ৬৭ হাজার টন এলপিজি আমদানির পরিকল্পনা করেছিল। বাস্তবে এসেছে ১ লাখ ৫ হাজার টন। ফেব্রুয়ারিতে ১ লাখ ৮৪ হাজার টন আমদানির লক্ষ্য ধরা হয়েছে। তবে বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় রয়েছে।
গবেষক অধ্যাপক মুশতাক হোসাইন খান বলেন, গত ১৫ বছরে উচ্চমূল্যের বিদ্যুৎ চুক্তি ও দুর্নীতির প্রভাব এখন স্পষ্ট। বর্তমানে যে ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে তা তুলে দিলে বিদ্যুতের দাম প্রায় ৮৬ শতাংশ বাড়াতে হবে। এতে শিল্প ও সাধারণ গ্রাহক বড় চাপের মুখে পড়বে।
এক আলোচনায় বিএনপির নেতা ও সাবেক জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে উচ্চ ব্যয়ের বোঝা এখন জনগণের ওপর। লোডশেডিং সহ্য হবে না, আবার দাম বাড়ালেও প্রতিবাদ হবে। তিনি জাতীয় ঐকমত্য, কাঠামোগত সংস্কার ও জবাবদিহিমূলক শাসনের ওপর জোর দেন।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী মহাসচিব এহসানুল মাহবুব জুবায়েরও যৌথ নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়নের অঙ্গীকারের কথা বলেন।
সব মিলিয়ে নতুন সরকারের জন্য বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত হবে একটি কঠিন সমীকরণ। বাড়তি চাহিদা, সীমিত জোগান, ভর্তুকির চাপ এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানি—সবকিছু মিলিয়ে পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক করা সহজ হবে না। স্বল্পমেয়াদি লোডশেডিং দিয়ে সামাল দেওয়া গেলেও দীর্ঘমেয়াদে কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া টেকসই সমাধান মিলবে না।

