দক্ষিণ এশিয়ায় মূল্যস্ফীতি এখন নীতিনির্ধারকদের প্রধান মাথাব্যথা। তবে সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, এ লড়াইয়ে প্রতিবেশী দেশগুলো যেখানে অনেকটা স্বস্তিতে, সেখানে বাংলাদেশ এখনো চাপে।
ভারতে খুচরা পর্যায়ের ভোক্তা মূল্যস্ফীতি নেমে এসেছে ২ দশমিক ৭৫ শতাংশে। দেশটির পরিসংখ্যান মন্ত্রণালয় জানুয়ারি মাসের এই তথ্য প্রকাশ করেছে। গ্রামীণ এলাকায় মূল্যস্ফীতি ২ দশমিক ৭৩ শতাংশ এবং শহরে ২ দশমিক ৭৭ শতাংশ। সর্বভারতীয় ভোক্তা খাদ্য মূল্যসূচক অনুযায়ী খাদ্য মূল্যস্ফীতি ২ দশমিক ১৩ শতাংশ। গ্রামে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১ দশমিক ৯৬ শতাংশ এবং শহরে ২ দশমিক ৪৪ শতাংশ। তথ্যটি প্রকাশ করেছে দ্য বিজনেস লাইন!
অন্যদিকে বাংলাদেশে একই সময়ে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ। এ তথ্য প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। ফলে দেখা যাচ্ছে, ভারতের তুলনায় বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি প্রায় তিন গুণ বেশি। শুধু তাই নয়, নভেম্বর ও ডিসেম্বরেও মূল্যস্ফীতি বেড়েছিল। অর্থাৎ টানা কয়েক মাস ধরেই চাপ অব্যাহত।
দক্ষিণ এশিয়ার তুলনামূলক চিত্র:
পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, অনেক দেশই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পেরেছে। জানুয়ারিতে পাকিস্তানে মূল্যস্ফীতি ছিল ৫ দশমিক ৮ শতাংশ এবং শ্রীলঙ্কায় ২ দশমিক ৩০ শতাংশ। নেপালে ২ দশমিক ৪২ শতাংশ এবং মালদ্বীপে দশমিক ১৬ শতাংশ। এক বছর আগেও পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কায় মূল্যস্ফীতি ছিল আরও বেশি। সেই তুলনায় পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।
ভারতে জানুয়ারিতে আবাসন খাতে মূল্যস্ফীতি ছিল ২ দশমিক ০৫ শতাংশ। দেশটির ৪৩৪টি শহর, ১ হাজার ৪৬৫টি গ্রামীণ বাজার এবং ১ হাজার ৩৯৫টি শহুরে বাজার থেকে পণ্যের দাম সংগ্রহ করে এই হিসাব করা হয়েছে। পাশাপাশি ২৫ লাখের বেশি জনসংখ্যার ১২টি অনলাইন বাজার বা শহরকে নতুন সিপিআই ব্যবস্থায় যুক্ত করা হয়েছে। সাপ্তাহিক ভিত্তিতে ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম থেকেও দাম সংগ্রহ করা হচ্ছে। ফলে মূল্যস্ফীতির হিসাব আরও বিস্তৃত ও প্রযুক্তিনির্ভর হয়েছে।
মূল্যস্ফীতি আসলে কী:
মূল্যস্ফীতি হলো একটি নির্দিষ্ট মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় পণ্য ও সেবার দাম কত বেড়েছে তার শতকরা হিসাব। যেমন ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ১০০ টাকায় যে পণ্য ও সেবা কেনা যেত, এক বছর পর তা কিনতে যদি লাগে ১০৮ টাকা ৫৮ পয়সা, তাহলে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ। অর্থাৎ একই আয়ে কম পণ্য কেনা সম্ভব হয়।
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয় ২০২৪ সালের আগস্টে। তখন মূল্যস্ফীতি ছিল প্রায় সাড়ে ১০ শতাংশ। গত দেড় বছরে তা সাড়ে ১১ শতাংশ থেকে কমিয়ে সাড়ে ৮ শতাংশের ঘরে আনা হয়েছে। তবে আট মাস ধরে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ঘরেই আটকে আছে। সহনীয় পর্যায়ে নামানো যায়নি।
এই সময়ে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বিভিন্ন সময় মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ বা ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যের কথা বলেছিলেন। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে সেই লক্ষ্য পূরণ হয়নি।
এর প্রভাব পড়ছে মধ্যবিত্ত ও সীমিত আয়ের মানুষের ওপর। প্রকৃত আয় কমে যাওয়ায় বাজারে নিত্যপণ্য কেনা কঠিন হয়ে উঠছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে, কিন্তু আয় একই হারে বাড়েনি।
গতকাল জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। নতুন সরকারের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো সাড়ে ৮ শতাংশের বেশি মূল্যস্ফীতিকে সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনা। প্রতিবেশী দেশগুলোর অভিজ্ঞতা দেখায়, কার্যকর নীতি ও বাজার ব্যবস্থাপনা থাকলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। তবে তা সহজ হবে না।

