দেশে সাড়ে তিন বছরের বেশি সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি জেঁকে বসেছে। কঠোর মুদ্রানীতি, আমদানি পণ্যে করছাড় এবং বাজার নিয়ন্ত্রণে নেয়া নানা উদ্যোগের পরও দাম বৃদ্ধির হার কমানো সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে খাদ্যমূল্যস্ফীতির চাপে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত।
বাংলাদেশে খাদ্যমূল্যস্ফীতির প্রায় ৬৩ শতাংশই আমিষজাতীয় খাদ্যপণ্য থেকে আসে। রমজান ও ঈদকে সামনে রেখে এই পণ্যের চাহিদা আরও বাড়তে পারে। ইতিমধ্যেই গত এক মাসে প্রায় সব ধরনের আমিষপণ্যের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। যদি এই পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা না যায়, তবে সার্বিক মূল্যস্ফীতি আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ের তথ্য নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ‘ইনফ্লাশন ডায়নামিকস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খাদ্যমূল্যস্ফীতির ৬২.৮ শতাংশই এই সময়ে আমিষজাতীয় খাদ্যপণ্যের কারণে হয়েছে। এই পণ্যের মধ্যে রয়েছে গরু, খাসি, হাঁস ও মুরগির মাংস, মাছ ও শুঁটকি, ডাল, দুধ ও পনির। সবজির দাম কম থাকায় খাদ্যমূল্যস্ফীতিতে সবজির অবদান ছিল ঋণাত্মক। মসলা ও রান্নার অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কিছুটা বেড়েছে, তবে ভোজ্যতেলের প্রভাব সামান্য কমেছে। আলোচ্য প্রান্তিকে খাদ্যশস্যের অবদান ছিল ৪২.৪ শতাংশ।
গত বছরের একই সময়ের তুলনায় মূল্যস্ফীতি ক্রমবর্ধমান। অক্টোবর-ডিসেম্বর সময়ে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৮ শতাংশের বেশি। খাদ্যমূল্যস্ফীতি অক্টোবরে ৭.০৮, নভেম্বরে ৭.৩৬ এবং ডিসেম্বরে ৭.৭১ শতাংশে পৌঁছায়। সর্বশেষ জানুয়ারিতে খাদ্যমূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮.২৯ শতাংশে দাঁড়ায়। একই সময়ে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৫৮ শতাংশ।
বাজার সংশ্লিষ্টরা জানান, শীত মৌসুমের শুরু থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত সবজির বাজার চড়া ছিল। ডিসেম্বরের শেষের দিকে কৃষক পর্যায়ে কিছুটা দাম কমলেও তা ক্রেতাদের পর্যায়ে পৌঁছায়নি। চাল, ডাল, চিনি, আটা, মাছ-মাংস ও এলপিজি গ্যাসসহ অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বেড়েছে। এর ফলে আশা অনুযায়ী মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি।
দেশে এক মাস ধরে অধিকাংশ আমিষজাতীয় পণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, খুচরা বাজারে চাষের রুই মাছের কেজিপ্রতি দাম এখন ৩৫০-৪৮০ টাকা, যেখানে এক মাস আগে ছিল ৩২০-৪২০ টাকা। চাষের কাতল মাছের দাম বেড়ে হয়েছে ৩৫০-৪৮০ টাকা। তেলাপিয়া মাছের কেজিপ্রতি দাম গত এক মাসে বেড়ে ২০০-২৫০ টাকায় পৌঁছেছে।
মাছের পাশাপাশি মাংসের দামও বাড়ছে। ব্রয়লার মুরগির কেজিপ্রতি দাম ১৮০-২০০ টাকা, কক বা সোনালি মুরগি বিক্রি হচ্ছে ৩৩০-৩৫০ টাকায়। দেশী মুরগির দাম বেড়ে ৬৫০-৭০০ টাকা, গরুর মাংস ৭৫০-৭৮০ টাকা এবং খাসির মাংস ১,২০০-১,৩০০ টাকায় পৌঁছেছে। এক মাস আগে এই দামগুলো যথাক্রমে কম ছিল।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য প্রায় দুই বছর ধরে নীতি সুদহার ১০ শতাংশে রাখা হলেও তার প্রভাব দেখা যায়নি। ব্যাংক ঋণের সুদহার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪-১৫ শতাংশ। দীর্ঘমেয়াদী উচ্চ সুদহারের মধ্যেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসেনি, বরং বিনিয়োগ কমে গেছে। ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তারা সুদহার কমানোর দাবি করলেও বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদ অপরিবর্তিত রেখেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর জানান, ‘মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশিত মাত্রায় নামানো ছাড়া বাকি সূচকগুলোতে মুদ্রানীতি কার্যকর হয়েছে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ও ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএম) নির্বাহী পরিচালক ড. মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, ‘নীতি সুদ বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি কমানো সম্ভব হয়নি। রমজান মাসে আমিষপণ্যের দাম আরও বাড়তে শুরু করেছে। নতুন সরকারকে বাজার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।’
দেশে ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে মূল্যস্ফীতির গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী। ২০২২-২৩ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৯.০২ শতাংশ, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৯.৭৩ শতাংশ, এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেড়ে ১০.০৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কিছুটা কমলেও এখনো ৮ শতাংশের ওপরে রয়েছে।
ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে মানুষের প্রধান প্রত্যাশা ছিল মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। কিন্তু ১৮ মাসের শাসনামলে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা দেখা গেছে। নতুন দায়িত্ব নেওয়া সরকারকে এই চাপ মোকাবেলা করতে হবে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘খাদ্য মূল্যস্ফীতি কাঠামোগত কারণে বেড়ে গেছে। পণ্য পরিবহন ও বাজারে চাঁদাবাজি কমানো, শুল্কনীতি যৌক্তিক করা এবং বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা দরকার। একই সঙ্গে অলিগার্কদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণের সুযোগ বন্ধ করতে হবে। শক্তিশালী রাজনৈতিক সরকারই এসব কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারে। নতুন সরকার একে কার্যকর করবেন বলে আমরা আশা রাখি।’

