সারা বিশ্বের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একসময় যেখানে অধিকাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে জীবন যাপন করত, আজ সেই চিত্র অনেকটাই বদলেছে। ইউরোপ ও আমেরিকা দীর্ঘ সময় আগে থেকেই অর্থনৈতিকভাবে উন্নতি করেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ভারত ও চীনের বিপুলসংখ্যক মানুষ দারিদ্র্যসীমা থেকে বেরিয়ে এসেছে। বিশেষ করে শেষ চার দশকে এই প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়েছে।
বিশ্বে মধ্যবিত্তের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাজারের আকারও সম্প্রসারিত হয়েছে। নতুন নতুন কোম্পানি ব্যবসায় প্রবেশ করেছে এবং প্রতিটি কোম্পানি মানুষের কোনো না কোনো চাহিদা পূরণে নিয়োজিত। প্রতিবছরই বৈশ্বিক জিডিপি বা মোট দেশজ উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে, এবং সেই সঙ্গে বড় হচ্ছে বেসরকারি কোম্পানিগুলোর আকারও।
বিশেষ করে চীনের অভাবনীয় উন্নতির কারণে দেখা যাচ্ছে, সম্পদের দিক থেকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় কোম্পানিগুলোর মধ্যে এখন বেশির ভাগই চীনের। কোম্পানির মোট সম্পদ বলতে বোঝায় তার সব চলতি ও অচল সম্পদের সমষ্টি। এর মধ্যে থাকে মজুত পণ্য, নগদ অর্থ ও নগদ সমতুল্য সম্পদ, স্থাবর সম্পত্তি, যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামাদি। চলুন দেখে নিই সম্পদের ভিত্তিতে বিশ্বের শীর্ষ ১০ কোম্পানি কোনগুলো:
০১. আইসিবিসি, দেশ: চীন, সম্পদ: ৭.৩ ট্রিলিয়ন ডলার:
মোট সম্পদের দিক থেকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় কোম্পানি হচ্ছে চীনের পিপলস রিপাবলিক ব্যাংক অব চায়না (আইসিবিসি)। ২০১৯ সালে ফোর্বস গ্লোবাল দুই হাজার বৃহৎ কোম্পানির তালিকায় শীর্ষে ছিল এই ব্যাংক।
চীনের ভেতরে আইসিবিসির শাখা আছে ১৬ হাজার, আর দেশের বাইরে আরও চার শতাধিক শাখা রয়েছে। গ্রাহকের সংখ্যা প্রায় ৭২ কোটি, যার মধ্যে করপোরেট গ্রাহক রয়েছে ১ কোটি ৭০ লাখ। চীনের ব্যবসা-বাণিজ্যের বড় অংশই এই ব্যাংকের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আইসিবিসির উন্নতি ও সম্প্রসারণও সমানভাবে বেড়েছে। ব্যাংকের মোট সম্পদ বর্তমানে ৭.৩ ট্রিলিয়ন ডলার, যা এটিকে সম্পদের দিক থেকে বিশ্বের শীর্ষে অবস্থান করায়।
০২. অ্যাগ্রিকালচার ব্যাংক অব চায়না, দেশ: চীন, সম্পদ: ৬.৭৬ ট্রিলিয়ন ডলার:
১৯৫১ সালে প্রতিষ্ঠিত অ্যাগ্রিকালচার ব্যাংক অব চায়না প্রধান কার্যালয় বেইজিংয়ে অবস্থিত এবং এটি চীনের চারটি বৃহৎ ব্যাংকের মধ্যে একটি। মোট সম্পদের ভিত্তিতে এটি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ব্যাংক ও কোম্পানি।
ব্যাংকটি মূলত গ্রামীণ অর্থায়ন ও কৃষি খাতের জন্য বিশেষায়িত। দেশে এটির ২৩ হাজার ৭০০-এর বেশি শাখা আছে, যা গ্রামীণ অঞ্চলের মানুষের জন্য সহজে আর্থিক সেবা নিশ্চিত করে। গত এক বছরে ব্যাংকের সম্পদ ৩২.৭৪ শতাংশ বেড়েছে। এছাড়া এটি চীনের সাংহাই ও হংকং শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত, যা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করছে।
০৩. চায়না কনস্ট্রাকশন ব্যাংক, দেশ: চীন, সম্পদ: ৬.২০ ট্রিলিয়ন ডলার:
১৯৫৪ সালে প্রতিষ্ঠিত চায়না কনস্ট্রাকশন ব্যাংক প্রধান কার্যালয় বেইজিংয়ে অবস্থিত এবং এটি চীনের চারটি বৃহৎ ব্যাংকের অন্যতম। ব্যাংকটি কেবল করপোরেট ব্যাংকিং নয়, ব্যক্তিগত ব্যাংকিং সেবাও প্রদান করে।
দেশের মধ্যে এটির ১৩ হাজার ৬০০ শাখা রয়েছে। এছাড়া আন্তর্জাতিকভাবে হংকং, সিঙ্গাপুর, লন্ডন, নিউইয়র্ক, টোকিও, সিডনি ও ফ্রাঙ্কফুর্টে শাখা আছে, যা ব্যাংকটিকে বৈশ্বিক ব্যবসায়িক নেটওয়ার্কে শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে এসেছে। চায়না কনস্ট্রাকশন ব্যাংক সাংহাই ও হংকং স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত, যা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য এটিকে আরও প্রভাবশালী করেছে।
০৪. ব্যাংক অব চায়না, দেশ: চীন, সম্পদ: ৫.২৭৪ ট্রিলিয়ন ডলার:
১৯১২ সালে প্রতিষ্ঠিত ব্যাংক অব চায়না চীনের চারটি বৃহৎ ব্যাংকের মধ্যে অন্যতম। প্রধান কার্যালয় বেইজিংয়ে অবস্থিত এই ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময়, বাণিজ্যিক অর্থায়ন ও আন্তর্জাতিক ব্যাংকিংয়ে বিশেষজ্ঞ।
বিশ্বব্যাপী প্রায় ৬০টি দেশে ৬০০-এর বেশি শাখা রয়েছে এই ব্যাংকের। এছাড়া এটি সাংহাই ও হংকং স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত, যা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য এটিকে আরও দৃঢ় অবস্থানে রাখে। ব্যাংক অব চায়না চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ বা অঞ্চল ও পথ উদ্যোগেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে, যা বৈশ্বিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সংযোগে সহায়ক।
০৫. জেপি মরগ্যান অ্যান্ড চেজ, দেশ: যুক্তরাষ্ট্র, সম্পদ: ৪.৫৬ ট্রিলিয়ন ডলার:
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বিনিয়োগ ব্যাংক জেপি মরগান চেজ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৭৯৯ সালে। প্রধান কার্যালয় নিউ ইয়র্কে অবস্থিত এই ব্যাংক ১০০টির বেশি দেশে কার্যক্রম পরিচালনা করে।
ব্যাংকটি ব্যক্তি, করপোরেট এবং বিভিন্ন দেশের সরকারকে ব্যাংকিং, বিনিয়োগ ও সম্পদ ব্যবস্থাপনার সেবা প্রদান করে। তবে এটি শুধুমাত্র বাণিজ্যিক সেবা দিয়ে সীমাবদ্ধ নয়; বিশ্ব অর্থনীতি নিয়ে নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যা বিনিয়োগকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিনিয়োগসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অনেকেই এই ব্যাংকের প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করেন।
০৬. ফ্যানি মে, দেশ: যুক্তরাষ্ট্র, সম্পদ: ৪.৩৩ ট্রিলিয়ন ডলার:
ফ্যানি মে বা পূর্ণ নাম দ্য ফেডারেল ন্যাশনাল মর্টগেজ অ্যাসোসিয়েশন যুক্তরাষ্ট্র সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রতিষ্ঠিত। প্রতিষ্ঠানটির মূল লক্ষ্য হলো বন্ধকি ঋণকে সিকিউরিটিতে রূপান্তর করা, যাতে ঋণ কেনাবেচার বাজার সম্প্রসারিত হয়। ফলে আবাসন খাতে তারল্য বৃদ্ধি পায় এবং ব্যাংকগুলো নতুন করে ঋণ প্রদানের ক্ষমতা অর্জন করে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে আবাসন খাতের আর্থিক গতিশীলতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
০৭. ফ্রেডি ম্যাক, দেশ: যুক্তরাষ্ট্র, সম্পদ: ৩.৪৩ ট্রিলিয়ন ডলার:
ফ্রেডি ম্যাক বা পূর্ণ নাম ফেডারেল হোম লোন মর্টগেজ করপোরেশন, ১৯৭০ সালে মার্কিন কংগ্রেসের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠানটি সরাসরি ঋণ প্রদান না করে, বরং ব্যাংক ও ঋণদাতার কাছ থেকে মর্টগেজ কেনে এবং সেগুলো বন্ধকি ঋণ-সমর্থিত সিকিউরিটিতে রূপান্তর করে বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করে।
ফলে ঋণদাতাদের নতুন ঋণ দেওয়ার ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। ফ্রেডি ম্যাক মার্কিন আবাসন বাজারে স্থিতিশীলতা, তারল্য এবং নিম্ন-মধ্যম আয়ের পরিবারের জন্য গৃহঋণের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করে। ২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের পরও এটি বিশেষ তত্ত্বাবধানে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
০৮. ব্যাংক অব আমেরিকা, দেশ: যুক্তরাষ্ট্র, সম্পদ: ৩.৪০৩ ট্রিলিয়ন ডলার:
ব্যাংক অব আমেরিকা হল যুক্তরাষ্ট্রের একটি বহুজাতিক ব্যাংক, যা ১৯০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রধান কার্যালয় চার্লট, নর্থ ক্যারোলাইনা-তে অবস্থিত।
ব্যাংকটি ব্যক্তিগত ব্যাংকিং, করপোরেট ব্যাংকিং, বিনিয়োগ ব্যাংকিং, সম্পদ ও ধনসম্পদ ব্যবস্থাপনায় বিশেষজ্ঞ। বর্তমানে এটি প্রায় ৭ কোটি গ্রাহককে ব্যাংকিং সেবা প্রদান করছে এবং যুক্তরাষ্ট্রে ৩ হাজার ৬০০টি শাখা পরিচালনা করছে। ব্যাংক অব আমেরিকা ঋণ ও বিনিয়োগের মাধ্যমে ব্যবসা ও গৃহঋণ বাজারে তারল্য বজায় রাখে, যা মার্কিন অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সহায়ক।
০৯. বিএনপি পারিবাস, দেশ: ফ্রান্স, সম্পদ: ৩.৩৫ ট্রিলিয়ন:
বিএনপি পারিবাস ইউরোপের অন্যতম বৃহৎ ব্যাংকিং গ্রুপ, যার প্রধান কার্যালয় ফ্রান্সে অবস্থিত। গ্রুপটি ৬৪টি দেশে কার্যক্রম পরিচালনা করে এবং কর্মীর সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৭৮ হাজার।
ব্যাংকটি রিটেইল ব্যাংকিং, করপোরেট অর্থায়ন, বিনিয়োগ ব্যাংকিং ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা সেবা প্রদান করে। খুচরা ব্যাংকিং শাখাগুলো গ্রাহকদের সঞ্চয়, ঋণ, ক্রেডিট কার্ড এবং ছোট ব্যবসার ব্যাংকিং সেবা সরবরাহ করে। বিএনপি পারিবাস ফ্রান্স ও ইউরোপীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং বৈশ্বিক বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক নেটওয়ার্কে এর প্রভাব শক্তিশালী।
১০. এইচএসবিসি, দেশ: যুক্তরাজ্য, সম্পদ: ৩.২৩ ট্রিলিয়ন ডলার:
এইচএসবিসি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ব্যাংক ও আর্থিক পরিষেবা গোষ্ঠী। ১৮৬৫ সালে হংকংয়ে প্রতিষ্ঠিত এই ব্যাংকের মূল লক্ষ্য ছিল এশিয়া ও ইউরোপে বাণিজ্যিক অর্থায়ন। বর্তমানে এর প্রধান কার্যালয় লন্ডনে অবস্থিত।
বিশ্বের ৬২টি দেশে প্রায় ৪ কোটি ১০ লাখ গ্রাহককে সেবা প্রদান করে এই ব্যাংক। ব্যাংকের ব্যবসার মূল লক্ষ্য এশিয়া ও যুক্তরাজ্য, তবে এর কার্যক্রম আন্তর্জাতিক। এটি খুচরা ব্যাংকিং, করপোরেট ব্যাংকিং, বিনিয়োগ ব্যাংকিং, সম্পদ ও ধনসম্পদ ব্যবস্থাপনা সেবা প্রদান করে। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এইচএসবিসির প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ।

