রাজনৈতিক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের মধ্য দিয়ে আজ শেষ হচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ। নতুন সরকার দায়িত্ব নিচ্ছে এক কঠিন অর্থনৈতিক বাস্তবতায়। তাদের কাঁধে উঠছে ২৩ লাখ কোটি টাকারও বেশি ঋণের ভার।
দায়িত্ব গ্রহণের শুরুতেই অর্থনীতির বড় চ্যালেঞ্জ সামনে পাচ্ছে নতুন সরকার। সংশ্লিষ্টদের মতে, বিশেষ করে ব্যাংকিং খাত থেকে উচ্চ হারে ঋণ নেওয়ার প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ২০২৫ সালেও ব্যাংকিং উৎস থেকে সরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ৩২ শতাংশের বেশি। ফলে অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা নতুন সরকারের জন্য সহজ হবে না।
বাংলাদেশ ব্যাংক-এর তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে দেশি ও বিদেশি উৎস মিলিয়ে সরকারের মোট ঋণ দাঁড়িয়েছে ২২ লাখ ৫০ হাজার ৯০৪ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর সময়ে সরকার ব্যাংকিং উৎস থেকে নিয়েছে ৬১ হাজার ১৪৮ কোটি টাকা।
এ সময় বৈদেশিক উৎস থেকেও এসেছে ঋণ। নিট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ১০৭ কোটি ৪০ লাখ ডলার। প্রতি ডলার ১২২ টাকা ধরে এর সমপরিমাণ দাঁড়ায় ১৩ হাজার ১০৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসেই দেশি ও বিদেশি উৎস মিলিয়ে সরকার নিয়েছে ৭৪ হাজার ২৫১ কোটি টাকার ঋণ। সব মিলিয়ে গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৩ লাখ ২৫ হাজার ১৫৫ কোটি টাকা।
নতুন সরকারের জন্য এই বিপুল ঋণের চাপ বড় পরীক্ষা হয়ে উঠছে। রাজস্ব আহরণ, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং ঋণ ব্যবস্থাপনায় কার্যকর কৌশল না নিলে অর্থনীতিতে চাপ আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সরকারি ব্যয় ও ঋণ বাড়লে সুদহার সাধারণত ঊর্ধ্বমুখী হয়। তখন বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ ও ভোগ চাপে পড়ে। অর্থনীতির ভাষায় একে বলা হয় ‘ক্রাউডিং আউট ইফেক্ট’। বর্তমানে দেশের অর্থনীতিতেও এমন প্রবণতা স্পষ্ট।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতের বিতরণ করা মোট ঋণ দাঁড়িয়েছে ২৩ লাখ ৮৪ হাজার ৯৬৮ কোটি টাকায়। আগের বছরের একই সময়ে এ অঙ্ক ছিল ২১ লাখ ৫১ হাজার ১৭৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে ঋণ বেড়েছে ২ লাখ ৩৩ হাজার ৭৯৪ কোটি টাকা। প্রবৃদ্ধি প্রায় ১১ শতাংশ। এই বাড়তি ঋণের বড় অংশ নিয়েছে সরকার। মোট বৃদ্ধি পাওয়া ঋণের ৫৭ শতাংশ বা ১ লাখ ৩৩ হাজার ৭৫৩ কোটি টাকা গেছে সরকারি খাতে।
বাংলাদেশ ব্যাংক-এর তথ্য বলছে, গত বছরের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকিং উৎস থেকে সরকারের নেওয়া ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৪৯ হাজার ৩২৬ কোটি টাকা। আগের বছর এ অঙ্ক ছিল ৪ লাখ ১৫ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা। অন্যদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাংক ঋণ কমেছে। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে এ খাতে ঋণের পরিমাণ ৫ দশমিক ৩৯ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৪৭ হাজার ৬১৮ কোটি টাকায়।
মুদ্রানীতিতে যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল, বাস্তবে তার চেয়েও বেশি ঋণ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথমার্ধে ব্যাংক খাত থেকে সরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছিল সাড়ে ২০ শতাংশ। কিন্তু তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৮ দশমিক ৯ শতাংশে। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ঋণ চাহিদা বেশি থাকায় অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধে ব্যাংকিং উৎস থেকে সরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য কিছুটা বাড়িয়ে ২১ দশমিক ৬ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।
সরকারের ঋণ বাড়ার পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করেছেন অর্থ বিভাগের সাবেক জ্যেষ্ঠ সচিব মাহবুব আহমেদ। তিনি বলেন, বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় সম্ভব হয়নি। এ লক্ষ্যমাত্রা প্রায়ই পূরণ করা যায় না। পাশাপাশি ঋণ পরিশোধ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বকেয়া পরিশোধে বড় অঙ্কের অর্থ গুনতে হয়েছে। সঞ্চয়পত্রের দায় ও পরিচালন ব্যয়ও বেড়েছে। এসব কারণে ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার পরিমাণ বেড়েছে।
তিনি আরও বলেন, যেসব খাতে ব্যয় কমানোর কথা ছিল তা কার্যকর করা যায়নি। বেসরকারি খাতেও নতুন বিনিয়োগ আশানুরূপ হয়নি। বিনিয়োগ কম থাকলে ঋণ প্রবৃদ্ধি কম হওয়াই স্বাভাবিক।
উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকার সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে। এ কারণে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৭ দশমিক ২ শতাংশ। সেটিও অর্জিত হয়নি। তবে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি বাড়তে পারে বলে মনে করছেন তিনি। একই সঙ্গে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন, যাতে প্রয়োজন ছাড়া ঋণ বিতরণ না হয়।
দেশের বেসরকারি খাতে কয়েক বছর ধরে বিনিয়োগ স্থবিরতার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। চলতি অর্থবছরে পরিস্থিতি আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। গত বছরের জুলাইয়ে ঘোষিত মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছিল মাত্র ৭ দশমিক ২ শতাংশ। কিন্তু ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এই প্রবৃদ্ধি মাত্র ৬ দশমিক ১ শতাংশে সীমিত রয়েছে।
সেসময় দেশের বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৭ লাখ ৮৮ হাজার ২৪ কোটি টাকায়। এক বছর আগে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের শেষে এ অঙ্ক ছিল ১৬ লাখ ৮৫ হাজার ২৭১ কোটি টাকা। ফলে এক বছরের ব্যবধানে ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ১ লাখ ২ হাজার ৭৫৩ কোটি টাকা।
উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য প্রায় দুই বছর ধরে নীতি সুদহার ১০ শতাংশে রাখা হয়েছে। এর ফলে ব্যাংক ঋণের সুদহার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪-১৫ শতাংশে। দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ সুদহার কার্যকর থাকলেও মূল্যস্ফীতি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় নিয়ন্ত্রণে আসেনি। বরং দেশের অর্থনীতিতে বিনিয়োগ খরা চলছে। ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তারা সুদহার কমানোর দাবি জানিয়েও সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রেখেছে। তবে নতুন মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি জুন পর্যন্ত ৮ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রাখা হয়েছে। এর আগে অর্থবছরের শুরুতে জুন পর্যন্ত ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য ধরা হয়েছিল।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজ-এর প্রেসিডেন্ট ও ন্যাশনাল পলিমার ইন্ডাস্ট্রিজ-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক রিয়াদ মাহমুদ বণিক বণিক বার্তাকে বলেন, “বেসরকারি খাত ইতিমধ্যেই স্থবির। এ সময়ে ব্যাংকের পক্ষ থেকেও রক্ষণাত্মক ভূমিকা দেখা গেছে। দুই বছর আগে দেশের ব্যাংক খাত প্রায় খাদের কিনারায় চলে গিয়েছিল। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঋণগ্রহীতাদের ওপর নজরদারি বাড়িয়েছে। ফলে যারা ঋণ নিয়েছেন, তারা নতুন ঋণ নিতে পারেনি। সাময়িকভাবে নতুন ঋণও কম নেওয়া হয়েছে, তবে দীর্ঘমেয়াদে এ পরিস্থিতি চলতে দেওয়া ঠিক হবে না।”
তিনি আরও বলেন, “নির্বাচনের পর পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরতে শুরু করেছে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের মধ্যেও আস্থা ফিরে আসবে। অতীতে যা ঘটেছে, তার পুনরাবৃত্তি আশা করি না।
বর্তমানে দেশে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ ও ঋণ প্রবৃদ্ধি ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। এমনকি কভিডকালেও এ হার এতটা নিচে নেমে যায়নি। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের মূলধনের অন্যতম উৎস হলো পুঁজিবাজার। কিন্তু বিনিয়োগ খরার কারণে উদ্যোক্তারা পুঁজিবাজার থেকেও মূলধন সংগ্রহে আগ্রহী হচ্ছেন না। নতুন শিল্প-কারখানা গড়ে না ওঠায় শিল্পের প্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানিও কমেছে। ফলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও রফতানি আয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত শিল্প খাতের মূল তিনটি উপকরণ — মূলধন যন্ত্রপাতি, মধ্যবর্তী পণ্য ও কাঁচামাল — আমদানি এলসি খোলা এবং নিষ্পত্তির প্রবণতা নিম্নমুখী।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথমার্ধে শিল্পের মূলধন যন্ত্রপাতি আমদানি এলসি খোলার পরিমাণ বেড়েছে ২৩ দশমিক ৬৪ শতাংশ, কিন্তু নিষ্পত্তির হার কমে গেছে ১৬ শতাংশে। মধ্যবর্তী পণ্যের এলসি খোলার পরিমাণ ১ দশমিক ৭৯ শতাংশ কমেছে, নিষ্পত্তি ১৩ শতাংশ কমেছে। কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে এলসি খোলার পরিমাণ কমেছে ২ দশমিক ১৩ শতাংশ এবং নিষ্পত্তি কমেছে মাত্র ০.২২ শতাংশ। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ধারা বিনিয়োগ খরা, অর্থনৈতিক স্থবিরতা এবং ভোগ ব্যয় কমে যাওয়ার কারণে দেখা দিচ্ছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নির্বাচনী ইশতাহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে গেলে সরকারের ব্যয় আরও বেড়ে যাবে। পে-স্কেল বাস্তবায়ন করলেও বড় অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন হবে। ফলে নতুন সরকারকে দায়িত্ব গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে বাড়তি ব্যয়ের অর্থ জোগানের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বণিক বার্তাকে বলেন, “আমাদের অর্থনীতিতে এখন দুইটি নেতিবাচক বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। প্রথমত, সরকার ক্রমান্বয়ে ব্যাংকনির্ভর হচ্ছে। কর-জিডিপির অনুপাত কমার কারণে রাজস্ব আয়ে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, যার ফলে ব্যয় সক্ষমতা সংকুচিত হচ্ছে এবং সরকার ঋণ গ্রহণে বাধ্য হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, ব্যক্তি খাতের ঋণপ্রবাহ কমে যাচ্ছে। বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ প্রায় ১০ বছর ধরে জিডিপির ২৩-২৪ শতাংশে স্থির ছিল, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে জিডিপির ২২.৫ শতাংশে নেমে গেছে। অর্থাৎ ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ ও ঋণ দুটোই কমছে। নতুন বিনিয়োগ নেই, কারখানা সম্প্রসারণ হচ্ছে না, উৎপাদন বাড়ছে না। সব মিলিয়ে বিনিয়োগের খরা চলছে।”
ফাহমিদা খাতুন আরও বলেন, “নতুন সরকার দায়িত্ব নিলেই অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে। নির্বাচনের সময় দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে অর্থ প্রয়োজন। পে-স্কেল, নতুন কর্মসংস্থান এবং এক কোটি নতুন চাকরির প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে বিনিয়োগ অপরিহার্য। কিন্তু বিনিয়োগ না হলে কর্মসংস্থান কীভাবে হবে? অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আমরা কর্মসংস্থান কমতে দেখেছি। এছাড়া ব্যবসা সহজীকরণের ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, দুর্নীতি, বন্দরের সমস্যা এখনও অমীমাংসিত। সব মিলিয়ে নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব সমস্যার মুখোমুখি হবে।

