জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সরকার গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। রাজনৈতিক পালাবদলের এই সময়েই নজর যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রায় দেড় বছরের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের দিকে।
২০২৪ সালের আগস্টে নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতি গড়ে উঠলেও দেশের বিনিয়োগ খাতে প্রত্যাশিত গতি দেখা যায়নি। যদিও অর্থনীতির কিছু সূচকে স্থিতিশীলতা ফিরেছে, সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগে (এফডিআই) বাংলাদেশ এখনও প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় পিছিয়ে আছে। তখন বিশেষজ্ঞরা মনে করছিলেন, অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর সংস্কার এবং নতুন বিনিয়োগ জোয়ার আসবে—যা ছিল যৌক্তিক প্রত্যাশা।
বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নেতৃত্বে পরিবর্তন এনে সরকারি দিক থেকে কিছু চমক থাকলেও গত ১৬ মাসে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।
ফলে ছোট, মাঝারি ও বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কর্মসংস্থানের ক্ষতি ঘটেছে। বিনিয়োগ প্রস্তাবের নিবন্ধন কমেছে, নতুন বিদেশি ইকুইটি বেড়ে উঠেনি, এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহও এক অঙ্কে নেমে এসেছে। দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ এখনও প্রতিযোগিতামূলক পরিস্থিতির বাইরে থেকে যাচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির কিছু সূচকে স্থিতি ফিরলেও প্রত্যাশিত বিনিয়োগ দেখা যায়নি। বরং কিছু গুরুত্বপূর্ণ সূচক মন্থরতার বার্তা দিচ্ছে।
রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিনিয়োগকারীরা সাধারণত অপেক্ষা করেন, এবং দেখেন—নতুন সরকার কোন নীতি গ্রহণ করে। কিন্তু যদি সেই সময়ে দ্রুত নীতিগত সংস্কার, জ্বালানি নিরাপত্তা, বিচারিক স্বচ্ছতা ও প্রশাসনিক দক্ষতা নিশ্চিত করা যায়, আস্থার পুনর্গঠন ত্বরান্বিত হয় এবং বিনিয়োগ বাড়ে। গত দেড় বছরে বড় ধরনের সংস্কার না হওয়ায় বিনিয়োগে কাঙ্ক্ষিত গতি আসেনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ও যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউ ইয়র্ক কোর্টল্যান্ডের অর্থনীতির অধ্যাপক ড. বিরূপাক্ষ পাল বলেন, “বিনিয়োগ বৃদ্ধিই একটি সরকারের সক্ষমতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার প্রধান সূচক। তিনি উল্লেখ করেন, অন্তর্বর্তী সরকার কথার প্রতিযোগিতায় সক্রিয় হলেও কার্যকর নীতিনির্ধারণে ব্যর্থ হয়েছে। ১৯৮১ সালের পর থেকে এমন দুর্বল বিনিয়োগ পারফরম্যান্স আর দেখা যায়নি।
সরকারের পক্ষ থেকে জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থান পরবর্তী পরিস্থিতি বিনিয়োগ মন্দার কারণ হিসেবে তুলে ধরা হলেও ড. পাল বলেন, ‘‘অতীতে রাজনৈতিক পরিবর্তন, বিশ্ব আর্থিক সংকট বা মহামারির সময়ও বিনিয়োগে এত বড় পতন ঘটেনি। ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পরও ব্যক্তি বিনিয়োগ কমেনি, বরং বেড়েছে। ২০০৮-০৯ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের সময়ও ব্যক্তি বিনিয়োগের হার ২১-২২ শতাংশের নিচে নামেনি।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘অভ্যন্তরীণ ব্যক্তি বিনিয়োগ না বাড়লে বিদেশি বিনিয়োগও টেকসইভাবে বৃদ্ধি পায় না। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা স্থানীয় বিনিয়োগ প্রবণতাকেই আস্থার সূচক হিসেবে বিবেচনা করেন।’’ বর্তমান সরকারের আমলে অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগের আস্থা কমেছে—যা বিদেশি বিনিয়োগেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
এক-এগারোর সময়কার অন্তর্বর্তী সরকার, অর্থাৎ ফখরুদ্দীন আহমেদের নেতৃত্বাধীন সরকারের উদাহরণ টেনে ড. পাল বলেন, ‘‘সেই সময়ে বিনিয়োগ হার কমেনি, বরং ২১ থেকে ২২ শতাংশে উন্নীত হয়েছিল। আইনশৃঙ্খলা তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকায় বিনিয়োগে সহায়ক ভূমিকা রেখেছিল।’’
জিডিপিতে বেসরকারি খাতের অবদান হ্রাস পেয়েছে:
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ব্যক্তি বিনিয়োগ ২০১৯ সালে জিডিপির প্রায় ২৫ শতাংশে পৌঁছেছিল—যা ছিল সর্বোচ্চ। কোভিড-১৯-এর বছরেও এই বিনিয়োগ বড় ধাক্কা খায়নি। তবে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত গড়ে ২৪ শতাংশে থাকা ব্যক্তি বিনিয়োগ ২০২৫ সালের জুনে নেমে আসে ২২.৪৮ শতাংশে। এক বছরে প্রায় ১.৫ শতাংশ পয়েন্টের এই পতন গত চার দশকের মধ্যে নজিরবিহীন।
পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে জিডিপির অনুপাতে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগের হার ছিল ২৩.৫১ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা নেমে আসে ২২.৪৮ শতাংশে। একই সময়ে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিও প্রায় ১৯ শতাংশ কমে নেমে এসেছে ২৮১ কোটি ডলারে। শিল্প স্থাপন বা উৎপাদন সম্প্রসারণের অন্যতম সূচক এই আমদানি হ্রাস, যা বিনিয়োগে অনীহার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বেসরকারি ঋণ প্রবাহ ২০ বছরের সর্বনিম্ন স্তরে দাঁড়িয়েছে:
বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির গতি আরও ধীর হয়ে এসেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ডিসেম্বর শেষে এই প্রবৃদ্ধি মাত্র ৬.১০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে—গত ২০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর আগে সর্বনিম্ন রেকর্ড ছিল গত বছরের অক্টোবরে ৬.২৩ শতাংশ।
ব্যবসায়ী মহল মনে করছে, ব্যাংক ঋণের সুদহার ১৪-১৫ শতাংশে পৌঁছানো, গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতি এবং করের চাপ মিলিয়ে উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে অনীহার সৃষ্টি করেছে। এর প্রভাব সরাসরি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগের ওপর পড়ছে। এ পরিস্থিতি নির্দেশ করছে, বিনিয়োগ ও ঋণ প্রবাহে স্থবিরতা দেশের অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে এবং উদ্যোক্তাদের আস্থা পুনর্গঠনের জন্য জোরদার নীতিগত পদক্ষেপ প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে নিট সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) ছিল ১৪২ কোটি ডলার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এটি বেড়ে দাঁড়ায় ১৬৯ কোটি ডলার।
তবে বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই বৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে বিদেশি কোম্পানির পুনর্বিনিয়োগ করা মুনাফা এবং আন্তকোম্পানি ঋণ থেকে। নতুন ইকুইটি বিনিয়োগ নেমে এসেছে মাত্র ৫৫ কোটি ডলারে—গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। আগের বছরের তুলনায় এটি প্রায় ১৭ শতাংশ কম। এমনকি করোনাকালের সময়ও নতুন ইকুইটি ছিল ৭২ কোটি ডলার।
২০২৫ সালের প্রথম ৯ মাসে এফডিআই ৮০ শতাংশ বৃদ্ধির দাবি করা হলেও, বিশ্লেষকরা মনে করেন এটি আগের বছরের নিম্ন ভিত্তির কারণে উচ্চ দেখাচ্ছে। ওই সময়ে মোট এফডিআই ছিল ১৪১ কোটি ডলার, যার মধ্যে প্রায় ৪৫ কোটি ডলার নতুন ইকুইটি। অর্থাৎ, দেশের বাজারে নতুন বিদেশি বিনিয়োগের অবদান সীমিত, এবং বৃদ্ধির মূল চালিকা শক্তি ছিল বিদ্যমান বিদেশি প্রতিষ্ঠানের পুনর্বিনিয়োগ।
বিশ্বব্যাংকের তথ্যে দেখা গেছে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশ পেয়েছে মাত্র ১.৫৩ বিলিয়ন ডলারের সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই)। তুলনায় ভারত পেয়েছে ২৭ বিলিয়ন, ইন্দোনেশিয়া ২১ বিলিয়ন এবং ভিয়েতনাম ২০ বিলিয়ন ডলার। এমনকি পাকিস্তানও ২০২৪ সালে বাংলাদেশকে ছাড়িয়ে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার বেশি বিনিয়োগ টেনেছে। দুই বছর আগেও পাকিস্তান এফডিআই আকর্ষণে বাংলাদেশের পেছনে ছিল। নীতির ধারাবাহিকতা, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারার কারণে প্রতিযোগী দেশগুলো এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশকে এ ধরনের প্রক্রিয়াগত সক্ষমতা বাড়াতে না পারায় বিদেশি বিনিয়োগে দেশের অবস্থান পিছিয়ে গেছে।
বিডার নতুন নেতৃত্বের প্রভাব কতটা পড়েছে?
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সিঙ্গাপুরে কর্মরত ব্যাংকার আশিক চৌধুরীকে দেশে ফেরানো হয় এবং তাকে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) এর নির্বাহী চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ এর দায়িত্বও পান।
নিয়োগের পর তিনি বিনিয়োগ সম্মেলন, বিদেশ সফর ও প্রচারণায় সক্রিয় উপস্থিতি রাখেন। তবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিডায় নিবন্ধিত বিনিয়োগ প্রস্তাব কমেছে ৫৮ শতাংশ এবং বিদেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব কমেছে প্রায় ৫৬ শতাংশ। চার দিনের বিনিয়োগ সম্মেলনে ঘোষিত প্রস্তাবের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩,১০০ কোটি টাকা—যা বিশ্লেষকদের মতে প্রত্যাশার তুলনায় সীমিত।
বিডা জানিয়েছে, অতীতে অকার্যকর নিবন্ধনের প্রবণতা ছিল। এখন বাস্তবসম্মত যাচাই ও প্রক্রিয়ার কারণে নিবন্ধন কমেছে। কিন্তু অর্থনীতিবিদদের মতে, নিবন্ধন হ্রাস, ঋণপ্রবাহ কমা এবং যন্ত্রপাতি আমদানি কমার সঙ্গে মিলিয়ে সামগ্রিক বিনিয়োগের মন্থরতার চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
ব্যবসায়ীরা জানাচ্ছেন, অন্তর্বর্তী সময়ে বড় ধরনের কাঠামোগত সংস্কার দৃশ্যমান হয়নি। প্রধান বাধাগুলো ছিল—উচ্চ সুদহার, গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা, অগ্রিম ও উৎসে করের চাপ, বন্দর ব্যবস্থাপনায় সময় ও ব্যয় বৃদ্ধি এবং প্রশাসনিক জটিলতা। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিরাও রাজস্বনীতির পূর্বানুমানযোগ্যতা এবং নীতি ধারাবাহিকতার অভাবের কথা উল্লেখ করেছেন। ব্যবসা পরিবেশ সূচক (বিবিএক্স) অনুযায়ী, গত এক বছরে আইন-কানুনের তথ্যপ্রাপ্তি, অবকাঠামো, শ্রম নিয়ন্ত্রণ, বাণিজ্য সহজীকরণ, প্রযুক্তি গ্রহণ এবং পরিবেশগত মান—এই ছয়টি সূচকে অবনতি ঘটেছে।
ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি রূপালী হক চৌধুরী বলেন, “রাজস্বনীতি বিনিয়োগবান্ধব নয়, গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বেশি এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের দ্বিধায় ফেলছে।” অপরদিকে পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ মন্তব্য করেছেন, “সাহসী কাঠামোগত সংস্কার না হলে বিনিয়োগ পরিবেশে বড় পরিবর্তন আসবে না।”
বর্তমান পরিস্থিতিতে, গ্যাস সংকট, বন্দর ব্যবস্থাপনায় জট, উচ্চ অগ্রিম আয়কর, উৎসে কর এবং ব্যাংক ঋণের ব্যয়—সব মিলিয়ে ব্যবসা পরিচালনার খরচ বেড়ে গেছে। ফলে নতুন বিনিয়োগের পরিবর্তে বিদ্যমান ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী দাবি করেছেন, রাজনৈতিক অস্থিরতার পরও বিনিয়োগ একেবারে শূন্যে নামেনি, বরং কিছু ক্ষেত্রে বেড়েছে। তার মতে, এটি একটি ‘মিরাকল’। তবে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, নিট এফডিআই বৃদ্ধির চিত্র বিভ্রান্তিকর। নতুন বিনিয়োগ না বাড়লে দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও রফতানি সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে না।
আশিক চৌধুরী দাবি করেন, ২০২৫ সালের প্রথম ৯ মাসে বিদেশি বিনিয়োগ ৮০ শতাংশ বেড়েছে। সংখ্যাটি সঠিক হলেও প্রেক্ষাপট গুরুত্বপূর্ণ। তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে এফডিআই উল্লেখযোগ্যভাবে কমে দাঁড়ায় ৭৮ কোটি ডলারে। এরপর ২০২৫ সালের প্রথম ৯ মাসে তা বেড়ে ১৪১ কোটি ডলারে পৌঁছালে প্রবৃদ্ধি হার ৮০ শতাংশ দেখায়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ১৪১ কোটি ডলার কি ঐতিহাসিক গড়ের তুলনায় সন্তোষজনক? করোনাকালীন ২০২০ সালের প্রথম ৯ মাসেও এফডিআই এর চেয়ে বেশি ছিল। অর্থাৎ বৈশ্বিক স্থবিরতার সময়ের তুলনায় কম বিনিয়োগ পাওয়া গেলে প্রবৃদ্ধির হার উচ্চ দেখালেও বাস্তব অর্জন সীমিত।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিনিয়োগের গঠন। ২০২৫ সালের প্রথম ৯ মাসে আগত ১৪১ কোটি ডলারের মধ্যে প্রায় ৪৫ কোটি ডলার নতুন ইকুইটি বিনিয়োগ। বাকি অংশ এসেছে আন্তকোম্পানি ঋণ ও মুনাফার পুনর্বিনিয়োগ থেকে। অর্থাৎ বিদ্যমান বিদেশি কোম্পানিগুলোর অভ্যন্তরীণ পুনর্বিনিয়োগই প্রধান চালিকা শক্তি, এবং সম্পূর্ণ নতুন বিনিয়োগকারীর আগমন সীমিত।
নিবন্ধন হ্রাস: বিভ্রান্তি নাকি প্রকৃত সংকেত?
বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলছেন, আগের সরকারের সময়ে ‘উন্নয়নের জোয়ার’ দেখাতে অতিরিক্ত ও অকার্যকর বিনিয়োগ নিবন্ধন হতো। এখন সেই প্রক্রিয়া বন্ধ হওয়ায় নিবন্ধন কমেছে।
তবে বিনিয়োগ নিবন্ধন দীর্ঘদিন ধরেই বিনিয়োগ প্রবণতার প্রাথমিক সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৫-এও এই তথ্য অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। নিবন্ধন কমার পাশাপাশি বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ৭ শতাংশের নিচে নেমেছে এবং মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি ১৯ শতাংশ কমেছে।
জিডিপির অনুপাতে বেসরকারি বিনিয়োগের হারও কমেছে। অর্থাৎ শুধু নিবন্ধন নয়, ঋণপ্রবাহ, যন্ত্রপাতি আমদানি, কর্মসংস্থান এবং উৎপাদন সক্ষমতা—all এই সূচক একত্রে বিচার করলে দেখা যায়, সামগ্রিক বিনিয়োগ প্রবণতা মন্থর। শুধুমাত্র নিবন্ধনের সংখ্যা দেখে বিনিয়োগ বৃদ্ধির চিত্র বোঝা যায় না। প্রকৃত পরিস্থিতি বোঝার জন্য সব সূচক একত্রে দেখা জরুরি।
অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাদের কার্যক্রম আগস্ট-অক্টোবর থেকে শুরু হওয়ায় পুরো অর্থবছরের তথ্য দিয়ে মূল্যায়ন করলে ‘ফ্রেমিং ইফেক্ট’ তৈরি হয়। তবে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, জিডিপি, মূল্যস্ফীতি, রফতানি এবং এফডিআই—সব সূচকই অর্থবছরভিত্তিক বিশ্লেষণ করা হয়। ধারাবাহিকতা ও তুলনাযোগ্যতার জন্য এটি স্বীকৃত পদ্ধতি।
সামনের চ্যালেঞ্জ: নতুন সরকার দায়িত্ব নিতে যাচ্ছে। তাদের প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো হবে—
- জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা
- সুদহার যৌক্তিক পর্যায়ে আনা
- করব্যবস্থায় সরলতা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা
- বন্দর ও লজিস্টিক দক্ষতা বৃদ্ধি
- প্রশাসনিক সেবার পূর্ণ ডিজিটালাইজেশন
- আইনশৃঙ্খলা এবং নীতিগত ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা
বিনিয়োগ কেবল পরিসংখ্যানের বিষয় নয়—এটি কর্মসংস্থান, উৎপাদন এবং রফতানির ভিত্তি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নিট এফডিআই কিছুটা বেড়েছে, কিন্তু নতুন বিনিয়োগের গতি সীমিত থাকায় সামগ্রিক শিল্পায়ন এবং কর্মসংস্থানে প্রত্যাশিত চাঙাভাব আসেনি। রাজনৈতিক স্থিতি ফিরে আসার পর প্রশ্ন হচ্ছে, নতুন সরকার কি সাহসী কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারবে?

