দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে আলোর মুখ দেখতে শুরু করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের ইআরএল-২ প্রকল্প। প্রাথমিকভাবে প্রাক্কলিত ব্যয় ৪৩ হাজার কোটি টাকা দেখানো হলেও সরকারের উদ্যোগে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে ৩১ হাজার কোটি টাকার প্রশাসনিক অনুমোদন মিলেছে।
প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসি জানিয়েছে, জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) সভার পর ১০ ফেব্রুয়ারি এটি প্রশাসনিকভাবে অনুমোদিত হয়েছে।
ইস্টার্ন রিফাইনারির ব্যবস্থাপনা পরিচালক, প্রকৌশলী মো. শরীফ হাসনাত বলেন, “অবশেষে ইআরএল-২ প্রকল্প আলোর মুখ দেখছে। সরকার ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন আন্তরিকভাবে চাইছে, প্রকল্পটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হোক। এটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে আরও শক্তিশালী করবে। তরল জ্বালানিতে সরকার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখবে এবং কোনো সংকটকালীন পরিস্থিতিতেও সহজে করতে পারবে।”
ইআরএল-২ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে দেশের জ্বালানি আমদানির উপর নির্ভরতা কমবে। সরকার প্রয়োজনে স্থানীয়ভাবে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারবে, যা দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং শিল্পোৎপাদনকে দীর্ঘমেয়াদে সহায়তা করবে। সরকারি অনুমোদনের পর প্রকল্পের বাস্তবায়ন শুরু হলে, এটি দেশের জ্বালানি ব্যবস্থাকে আরও আত্মনির্ভরশীল করার ক্ষেত্রে একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে।
তিনি বলেন,
১০ ফেব্রুয়ারি সরকার প্রায় ৩১ হাজার কোটি টাকার ব্যয়ে প্রকল্পটিকে জিও (প্রশাসনিক অনুমোদন) দিয়েছে। এর মধ্যে সরকারের অংশ ৬০ শতাংশ এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)-এর অংশ ৪০ শতাংশ। প্রকল্পটি বাণিজ্যিক অপারেশন শুরু হওয়ার পাঁচ বছরের মধ্যে পুরো ব্যয় পূর্ণাঙ্গভাবে উঠে আসবে। ইআরএল-২ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালী হবে। সরকার পুরোপুরি তরল জ্বালানির উপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারবে এবং কোনো সংকটকালীন পরিস্থিতিতেও সহজে করা সম্ভব হবে।
দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন পেট্রোলিয়াম রিফাইনারি ইস্টার্ন রিফাইনারি। স্বাধীনতার ৪১ বছর পরও এ সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব হয়নি। বিপিসি এই প্রতিষ্ঠানটি নিয়ন্ত্রণ করে এবং দেশের পেট্রোলিয়াম জ্বালানি আমদানি, পরিশোধন ও বিপণন কার্যক্রম পরিচালনা করে।
ইস্টার্ন রিফাইনারি ১৯৬৬ সালে গুপ্তখাল, চট্টগ্রামে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৬৭ সালের ২৭ ডিসেম্বর বর্তমান প্ল্যান্ট স্থাপন হয় এবং ১৯৬৮ সালের ৭ মে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করে। ফ্রান্সের টেকনিপ কোম্পানি রিফাইনারি নির্মাণে সহায়তা করে। বর্তমানে রিফাইনারির বার্ষিক পরিশোধন ক্ষমতা ১৫ লাখ টন পেট্রোলিয়াম ক্রুড।
জ্বালানি সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিপিসি ২০১২ সালে “ইনস্টলেশন অব ইআরএল ইউনিট-২” প্রকল্প হাতে নেয়। শুরুর ব্যয় ধরা হয়েছিল ৭,৫০০ কোটি টাকা। ২০১৬ সালে একাধিকবার সংশোধনের পর এটি বেড়ে ১৬,৭৩৯ কোটি টাকা হয়। ফিড কন্ট্রাক্টর হিসেবে ফ্রান্সের টেকনিপ নিয়োগ করা হয়, যা প্রকল্পের ডিজাইন সম্পন্ন করে।
বর্তমানে “মডার্নাইজেশন অ্যান্ড এক্সপানশন অব ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল-২)” নামে ৪৩ হাজার কোটি টাকার সংশোধিত প্রকল্প প্রস্তাবনা মন্ত্রণালয়ে অনুমোদনের অপেক্ষায় ছিল। সরকারিভাবে অনুমোদনের পর প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশের জ্বালানি উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় একটি বড় পরিবর্তন আসবে।
প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট কনসালট্যান্ট (পিএমসি) হিসেবে ভারতীয় প্রতিষ্ঠান ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্ডিয়া লিমিটেড (ইআইএল) নিয়োগ পেয়েছে। ২০১৬ সালের ১৯ এপ্রিল বিপিসি এই চুক্তি করে। চুক্তি সই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু। ওইদিন মন্ত্রী জানান, পরবর্তী বছরের মধ্যে ইআরএল-২ প্রকল্পের ভৌত কাজ শুরু হবে।
কিন্তু দীর্ঘ ১০ বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পের মূল কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। সময় বিলম্বের কারণে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে যায়। ২০২২ সালের শেষের দিকে প্রকল্প ব্যয় পুনর্নির্ধারণ করা হয় ২৩,০৫৮ কোটি ৯৩ লাখ ৯২ হাজার টাকা। প্রস্তাবনায় ব্যয়ের ৭০ শতাংশ জিওবি এবং ৩০ শতাংশ বিপিসির নিজস্ব অর্থায়ন থেকে মেটানোর পরিকল্পনা করা হয়। ২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি অর্থ মন্ত্রণালয় জিওবি খাত থেকে ১৬,১৪২ কোটি ৯৯ হাজার টাকা ঋণ হিসেবে অনুমোদন দেয়। বাকি ৬,৯১৬ কোটি ৯২ লাখ ৯৩ হাজার টাকা বিপিসির নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যয় মেটানোর কথা ছিল।
পরবর্তী সময়ে ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে প্রকল্প প্রস্তাবনাটি ফের সংশোধন করা হয়। নতুন অনুমোদিত ব্যয় দাঁড়ায় ২৩,৭৩৬ কোটি ১০ লাখ ৬৩ হাজার টাকা। এর মধ্যে ৭০ শতাংশ অর্থায়ন জিওবি ফান্ড থেকে ১৬,৬৩৫ কোটি ২৬ লাখ ৭৯ হাজার টাকা এবং ৩০ শতাংশ অর্থায়ন বিপিসির নিজস্ব তহবিল থেকে ৭,১০১ কোটি ৮৩ লাখ ৮৪ হাজার টাকা। এই প্রস্তাবনা অর্থ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি বিভাগে জমা দেওয়া হয়েছে।
ইআরএল-২ প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা অবস্থায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা-র হস্তক্ষেপের পর এস আলম গ্রুপ প্ল্যান্ট নির্মাণে আগ্রহ প্রকাশ করে। ২০২৩ সালের ২৯ জানুয়ারি গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম স্বাক্ষরিত পত্রের মাধ্যমে সমঝোতা স্মারকের প্রস্তাবনা জমা দেন। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্রজনতার আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে হাসিনা সরকারের পতনের পর বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার সিদ্ধান্ত নেয়, প্রকল্পটি আবারও বিপিসির নিজস্ব ব্যবস্থায় বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এদিকে ২০২৩ সালের ১১ আগস্ট বিপিসি জ্বালানি ও খনিজ বিভাগে ‘মর্ডানাইজেশন অ্যান্ড এক্সপানশন অব ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল)’ নামে পুনর্গঠিত ডিপিপি পাঠায়। নতুন ডিপিপিতে প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় ৪৩,০৮৮ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি ঋণ হিসেবে অর্থায়ন হবে ৬০ শতাংশ এবং অবশিষ্ট ৪০ শতাংশ বিপিসির নিজস্ব আয় থেকে বহন করা হবে। সে হিসেবে প্রাক্কলিত ব্যয়ের ২৫,৮৫২ কোটি ৫১ লাখ টাকা জিওবি থেকে এবং ১৭,২৩৬ কোটি ২৯ লাখ টাকা বিপিসি বহন করবে বলে উল্লেখ করা হয় বিপিসি চেয়ারম্যান আমিন উল আহসান-এর স্বাক্ষরিত চিঠিতে। পরে দুই দফায় কাটছাঁট করে বর্তমানে প্রকল্প ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৩১,০০০ কোটি ৫৭ লাখ টাকায়। প্রকল্পের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে ২০৩০ সালের নভেম্বর পর্যন্ত।
ইআরএল সূত্রে জানা যায়, প্রকল্পটি চালু হলে রিফাইনারির ক্রুড অয়েল পরিশোধন ক্ষমতা প্রতি বছর ৪৫ লাখ মেট্রিক টন হবে। এটি দেশের মোট চাহিদার ৭৫ শতাংশ মেটাতে সক্ষম। ইআরএল-২ থেকে ফিনিশড প্রোডাক্ট হিসেবে উৎপন্ন হবে এলপিজি, গ্যাসোলিন ইউরো-৫, জেট এ-১, ডিজেল ইউরো-৫, গ্রুপ-৩ বেজ অয়েল, ফুয়েল অয়েল, বিটুমিন এবং সালফার।
বাংলাদেশে রিফাইনারি বা পরিশোধন কারখানার সক্ষমতা সীমিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রুড অয়েলের দাম কমলেও দেশের জন্য পর্যাপ্ত ক্রুড অয়েল আমদানি ও মজুদ করা সম্ভব হয় না। এতে একদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বৃদ্ধি পায়, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি পেলে এর প্রভাব সরাসরি স্থানীয় বাজার ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রুড অয়েলের দাম কম থাকলে তা দেশে এনে পরিশোধন করলে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় সম্ভব হত এবং আমদানিনির্ভরতা কমত। কিন্তু বর্তমানে দেশের রিফাইনারির সক্ষমতা সীমিত থাকায় মাত্র ১৫ লাখ টনের বেশি ক্রুড অয়েল আমদানি করা সম্ভব হয় না।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেয়। প্রস্তাবিত প্রকল্পের ফিজিবিলিটি স্ট্যাডি সম্পন্ন হয়েছে এবং ফ্রান্সের প্রতিষ্ঠান টেকনিপকে দিয়ে ফিড (ফ্রন্ট অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ডিজাইন) তৈরি করা হয়েছে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বছরে ৩০ লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল পরিশোধন করা সম্ভব হবে। এতে দেশের পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের চাহিদার ৪৫–৫০ শতাংশ পূরণ করা সম্ভব হবে। প্রকল্পে ক্রুড অয়েল বেন্ডিং সুবিধা থাকায় তেল আমদানিতে প্রতি ব্যারেল প্রায় ১৮–১৯ ডলার সাশ্রয় করা সম্ভব হবে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে সহায়ক হবে।

