প্রবল অভ্যন্তরীণ অর্থ সংকটের মধ্য দিয়ে নতুন সরকারের যাত্রা শুরু হয়েছে। আয়ের তুলনায় ব্যয় বেশি হওয়ায় সংকট আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। রাজস্ব আয় কমছে, বিনিয়োগে স্থবিরতা বিরাজ করছে, ব্যাংক খাত দুর্বল, মূল্যস্ফীতি এখনো ঊর্ধ্বমুখী—সব মিলিয়ে অর্থনীতির ভেতরের চিত্র খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। এমন বহুমুখী চাপে দায়িত্ব নেওয়ায় সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থনীতিতে গতি ফেরানো।
সূত্র জানায়, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ দিকেই অর্থনৈতিক মন্দা বাড়তে থাকে। ২০২০ সালে করোনার সময় তা প্রকট আকার ধারণ করে। ২০২২ সালে বৈশ্বিক মন্দা শুরু হলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংকট আরও তীব্র হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। তারা জাল-জালিয়াতি ও টাকা পাচার রোধে কিছুটা সফল হওয়ায় বৈদেশিক খাতে স্বস্তি ফিরে আসে এবং রিজার্ভও বাড়ে। তবে অভ্যন্তরীণ খাতে অস্বস্তি কাটেনি। বিনিয়োগে তীব্র মন্দা, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ সর্বনিম্নে নেমে যাওয়া, রাজস্ব আয়ে বড় পতন এবং ব্যাংক খাতের দুর্বলতা অর্থনীতিকে চাপের মধ্যে রেখেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বরে দেশে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ এসেছে মাত্র ৬৫ কোটি ডলার। এর মধ্যে নতুন পুঁজি বিনিয়োগ খুবই কম। দেশি উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগও কমেছে। ফলে ঋণের চাহিদা বাড়েনি। জুলাই-ডিসেম্বরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ বেড়েছে মাত্র ২ দশমিক ৩২ শতাংশ, যা স্মরণকালের সর্বনিম্ন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে লুটপাটে দুর্বল হয়ে পড়া ব্যাংক খাত এখন চাহিদা অনুযায়ী ঋণ জোগান দিতে পারছে না। এর প্রভাব পড়ছে সামগ্রিক অর্থনীতিতে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী মনে করেন, অর্থ সংকট দূর করতে হলে রাজস্ব আয় বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই। আর রাজস্ব বাড়াতে হলে ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি আনতে হবে। ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করতে হবে, আমদানি-রপ্তানি বাড়াতে হবে এবং ব্যাংক খাতকে গতিশীল করতে হবে। একই সঙ্গে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করাও জরুরি। কর্মসংস্থান বাড়লে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়বে, এতে সরকারের আয়ও বাড়বে। তিনি আরও বলেন, দুর্নীতি ও অপচয় অর্থ সংকটের বড় কারণ। এটি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারলে সরকারি হিসাবে অর্থের প্রবাহ বাড়বে এবং উদ্যোক্তাদের মধ্যে আস্থা ফিরে আসবে।
২০২২ সালের জুলাই থেকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। এর ফলে সুদের হার ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৬ শতাংশে পৌঁছেছে। একই সময়ে ডলারের দাম ৮৬ টাকা থেকে বেড়ে ১২৩ টাকায় উঠেছে, যা ব্যবসার খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে। বর্তমানে ডলারের দাম কিছুটা স্থিতিশীল থাকলেও রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় বাড়ানোর স্বার্থে তা কমানো হচ্ছে না। উদ্যোক্তারা ঋণের সুদের হার কমানোর দাবি জানালেও মূল্যস্ফীতি না কমায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক সে পথে হাঁটছে না।
আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের বড় অংশ বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরশীল। তাই স্বল্প সুদে ও সহজ শর্তে বৈদেশিক ঋণ প্রবাহ বাড়ানো প্রয়োজন। ২০২২ সাল থেকে ডলার সংকটের কারণে আমদানি ব্যবসায় মন্দা চলছে। যদিও এখন ডলারের জোগান কিছুটা বেড়েছে, তবুও আস্থার অভাবে আমদানি পুরোপুরি চাঙা হয়নি। আমদানি বাড়লে কাঁচামালের সরবরাহ বাড়বে, যা রপ্তানিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তবে গত পাঁচ মাস ধরে রপ্তানি আয় নিম্নমুখী, যা উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
অন্যদিকে রেমিট্যান্স প্রবাহে ইতিবাচক ধারা দেখা যাচ্ছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারিতে রেমিট্যান্স বেড়েছে ২১ দশমিক ৭৫ শতাংশ। শুধু জানুয়ারিতেই বেড়েছে ৪৫ শতাংশের বেশি। এই ধারা ধরে রাখতে হলে হুন্ডির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া এবং ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স সেবা আরও সহজ ও আকর্ষণীয় করতে হবে।
অর্থনীতির রক্ত সঞ্চালনের মতো কাজ করে ব্যাংক খাত, কিন্তু বর্তমানে এটি দুর্বল। কিছু ব্যাংক রপ্তানি আয়ের ডলার পরিশোধ করতেও সমস্যায় পড়ছে। খেলাপি ঋণ আদায় বাড়ানো, চলমান সংস্কার জোরদার করা এবং আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এখন অত্যন্ত জরুরি। ব্যাংক খাতে তারল্য বাড়লে ঋণের সুদ কমবে এবং ঋণ প্রবাহ বাড়বে। তখন উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন।
সব মিলিয়ে নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অর্থনীতিতে আস্থা ফিরিয়ে আনা। ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙা হলে, রেমিট্যান্স ও রপ্তানি বাড়লে এবং দুর্নীতির লাগাম টানা গেলে রাজস্ব আয় বাড়বে। আর রাজস্ব বাড়লেই ধীরে ধীরে সরকারের অর্থ সংকট কাটতে শুরু করবে। এখন দেখার বিষয়, সরকার কত দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে এবং অর্থনীতির স্থবির চাকা আবার কত দ্রুত ঘুরতে শুরু করে।

