দায়িত্ব নেওয়ার পরই বাজার ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে রমজান শুরু হওয়ায় এই চাপ আরও স্পষ্ট হয়েছে। নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে সাধারণ মানুষ, বিশেষত নিম্ন ও নির্দিষ্ট আয়ের পরিবারগুলো চাপে পড়েছে।
গত বুধবার মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে সরকারপ্রধান স্পষ্ট করে দেন, প্রথম তিন মাসের মধ্যেই দ্রব্যমূল্য ও মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে আনতে হবে। নির্বাচন-পরবর্তী অর্থনৈতিক চাপ, বৈশ্বিক অস্থিরতা এবং রমজান ঘিরে বাড়তি চাহিদা—সব মিলিয়ে বাজার এখনো স্থিতিশীল নয়। বৈঠকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, রমজানে জ্বালানির সরবরাহে ঘাটতি চলবে না। নিত্যপণ্যে কৃত্রিম সংকট তৈরি হলে ব্যবস্থা নিতে হবে। মাঠপর্যায়ে প্রশাসনকে সক্রিয় থাকতে বলা হয়েছে।
নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নে ১৮০ দিনের বিশেষ কর্মপরিকল্পনা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কোন মন্ত্রণালয় কী করবে, তার সুস্পষ্ট তালিকা দ্রুত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বাজার তদারকি জোরদার, সরবরাহ ব্যবস্থায় সমন্বয় বৃদ্ধি, মজুতদারির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনে আমদানিনীতিতে পরিবর্তনের বিষয়েও নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে।
তবে বাস্তবতা বলছে, রমজান শুরু হতেই কিছু পণ্যের দাম আবার বেড়েছে। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, শুধু ভ্রাম্যমাণ অভিযান দিয়ে সাময়িক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা আনতে হলে উৎপাদন, আমদানি, পরিবহন ও খুচরা বাজার—সব পর্যায়ে কার্যকর সমন্বয় দরকার। ডলারের বিনিময় হার, আমদানি ব্যয় এবং সরবরাহ শৃঙ্খলায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত না করলে কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে না। প্রথম তিন মাসে দৃশ্যমান অগ্রগতি হলে বাজারে ইতিবাচক বার্তা যাবে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-এর সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আগামী তিন মাসের কর্মপরিকল্পনায় বাজার ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দেওয়া যৌক্তিক সিদ্ধান্ত। কয়েক বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির ফলে মানুষের আর্থিক সুরক্ষা কমেছে। বাজার স্থিতিশীল হলে ভোগান্তি কিছুটা কমবে। তবে এজন্য উৎপাদন ও সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। আমদানি থেকে খুচরা পর্যায় পর্যন্ত পুরো শৃঙ্খলা নিয়মতান্ত্রিক ও স্বচ্ছভাবে পরিচালনা করতে হবে। সময়মতো আমদানি এবং পর্যাপ্ত মজুতও নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর নজরদারি জোরদার হলে ইতিবাচক ফল পাওয়া সম্ভব। উৎপাদন বৃদ্ধি ও বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত না হলে মূল্যস্ফীতির চাপ কমানো কঠিন হবে।
সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, আয়ের তুলনায় নিত্যপণ্যের দাম যেভাবে বেড়েছে তাতে জীবনযাত্রার ব্যয় অসহনীয় হয়ে উঠেছে। মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকেই দ্রব্যমূল্য সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনার অঙ্গীকার ইতিবাচক। তবে শুধু প্রশাসনিক পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়।
সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা, আমদানি-রপ্তানি নীতিতে সামঞ্জস্য আনা, বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা এবং মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির সমন্বয় জরুরি। প্রথম তিন মাসেই নতুন সরকারের দক্ষতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার পরীক্ষা হবে। সফল হলে আস্থা বাড়বে, ব্যর্থ হলে চাপ বাড়বে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, এ বছর সরবরাহ পরিস্থিতি তুলনামূলক ভালো। ডলারের দাম স্থিতিশীল থাকায় আমদানিতে সুবিধা হয়েছে। আগে যেখানে শতভাগ মার্জিনে এলসি খুলতে হতো, এখন ১০ থেকে ২০ শতাংশ মার্জিনেই সম্ভব হচ্ছে। বিদায়ী বাণিজ্য উপদেষ্টা দাবি করেছিলেন, রমজানের পণ্যে ঘাটতি নেই। বরং আমদানি আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি। কিন্তু বাজারে সেই স্বস্তি পুরোপুরি দেখা যায়নি। এতে প্রশ্ন উঠছে, সমস্যা কি সরবরাহে, নাকি বাজার ব্যবস্থাপনায়।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো-এর সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, গত তিন মাস ধরে মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। গত জানুয়ারিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ। ডিসেম্বর ও নভেম্বরে তা আরও বেড়েছিল। জানুয়ারিতে খাদ্য মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৮১ শতাংশ। টানা চার মাস খাদ্য মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী। ২০২৫ সালে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৭৭ শতাংশ। চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, চিনি ও সবজির দাম বাড়ায় মানুষের ক্রয়ক্ষমতায় চাপ তৈরি হয়েছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আগের অন্তর্বর্তী সরকার সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি নেয়, যা এখনো বহাল আছে। নীতি সুদহার বাড়ানো হয় এবং ঋণপ্রবাহ কমানোর চেষ্টা করা হয়। তবে প্রত্যাশিত ফল আসেনি বলে বিশ্লেষকদের মত। বরং বেসরকারি খাতে ঋণ কমায় বিনিয়োগ ও উৎপাদনে প্রভাব পড়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল কঠোর মুদ্রানীতির ওপর জোর দিলেও দেশীয় বাস্তবতায় উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়ানোর বিষয়টি সমান গুরুত্ব পাচ্ছে।
সব মিলিয়ে নতুন সরকারের সামনে এখন সময়ের কঠিন পরীক্ষা। প্রথম তিন মাসে বাজারে দৃশ্যমান স্বস্তি ফিরলে আস্থা বাড়বে। আর অগ্রগতি না এলে অর্থনৈতিক চাপ আরও গভীর হতে পারে। তাই ঘোষিত সিদ্ধান্ত কত দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন হয়, সেদিকেই এখন সবার নজর।

