আগামী জাতীয় বাজেটে সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন নতুন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এতে প্রথম অর্থবছর থেকেই প্রশাসনের নিজেদের অঙ্গীকার বাস্তবায়নের ইঙ্গিত মিলছে।
অর্থমন্ত্রী নীতিনির্ধারকদের বলেছেন, বাজেট এমনভাবে প্রস্তুত করতে হবে যাতে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির অগ্রগতি স্পষ্টভাবে উঠে আসে। গতকাল সচিবালয়ে মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে তিনি এই নির্দেশনা দেন।
বৈঠকে উপস্থিত কর্মকর্তারা জানান, তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, আগামী জুনে পেশ হতে যাওয়া ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে যেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল–এর নির্বাচনি ইশতেহারের সুস্পষ্ট প্রতিফলন থাকে।
সভায় উপস্থিত অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক সিনিয়র কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে টিবিএসকে বলেন, নির্বাচনের আগে সরকার যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, বাজেটে তার প্রতিফলন নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই বাজেট প্রণয়নের কাজ এগিয়ে নিতে নির্দেশনা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।
বিএনপির অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতির মধ্যে রয়েছে প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগ বাড়ানো, তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ব্যবসা-বাণিজ্যে নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার।
এ ছাড়া স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে ব্যয় বাড়িয়ে জিডিপির ৫ শতাংশের বেশি করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে দলটি। এসব খাতে জিডিপির অনুপাতে ব্যয় বাড়াতে গেলে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হবে।
সরকারের আলোচিত প্রতিশ্রুতির মধ্যে রয়েছে দেশব্যাপী ফ্যামিলি কার্ড চালু করা। গতকালের বৈঠকে বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়। এই কর্মসূচি বাস্তবায়নে বছরে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হবে ১২ হাজার কোটি থেকে ২৪ হাজার কোটি টাকা।
এ ছাড়া বিএনপি ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এটি বাস্তবায়নেও বড় অঙ্কের অর্থ প্রয়োজন হবে। পাশাপাশি দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, নিম্ন ও মধ্যবিত্তের সহায়তা কর্মসূচি এবং জ্বালানি ও খাদ্য সরবরাহ স্থিতিশীল রাখার প্রতিশ্রুতিও রয়েছে।
আগামী জুনে প্রথম বাজেট দিতে যাচ্ছে তারেক রহমান–এর নেতৃত্বাধীন সরকার। সে হিসেবে বাজেটের আগে নতুন সরকারের হাতে সময় রয়েছে প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন মাস। কর্মকর্তারা বলছেন, এক অর্থবছরেই সব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।
তবে অর্থমন্ত্রী চান, বাজেটের মাধ্যমে সরকারের নীতিগত দিকনির্দেশনা এবং প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সদিচ্ছার স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হোক।
এদিকে এক বছরেই কর-জিডিপি অনুপাত ৮ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন অর্থমন্ত্রী। বিষয়টিকে উচ্চাকাঙ্ক্ষী বলে মনে করছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ড–এর কর্মকর্তারা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের ট্যাক্স পলিসি বিভাগের এক সিনিয়র কর্মকর্তা টিবিএসকে বলেন, এই লক্ষ্য অর্জনে রাজস্ব আদায়ে প্রায় ৫০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন হবে। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে যা বাস্তবে অসম্ভব বলেই মনে হচ্ছে।
তিনি বলেন, অর্থনীতিতে এমন কোনো গতি তৈরি হয়নি যে এত বেশি হারে রাজস্ব আদায় বাড়বে।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কর-জিডিপি অনুপাত নেমে এসেছে ৬ দশমিক ৭ শতাংশে। গত দুই দশকে রাজস্ব আদায়ে গড়ে ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলেও কর-জিডিপি অনুপাত বাড়েনি। বরং তা কমেছে বা স্থির থেকেছে। এ কারণে জিডিপির সঠিক হিসাব নির্ধারণের আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ–এর অতিরিক্ত পরিচালক (গবেষণা) তৌফিকুল ইসলাম খান মনে করেন, বিএনপির প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে রাজস্ব আয় বাড়ানো জরুরি।
তিনি বলেন, এই হারে রাজস্ব বৃদ্ধি অসম্ভব নয়। তবে এর জন্য ব্যাপক সংস্কার প্রয়োজন হবে।
গত ১৯ ফেব্রুয়ারি সিটিজেনস প্ল্যাটফর্ম ফর এসডিজি, বাংলাদেশ আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে নতুন সরকারকে চলতি অর্থবছরের বাকি সময়ের জন্য বাজেট সংশোধনের সুপারিশ করা হয়।
তবে শনিবারের বৈঠকে বিষয়টি আলোচনায় আসেনি বলে জানিয়েছেন এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান।

