দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র কৃষি খাতের জন্য ঋণের চিত্র এখনও আশাব্যঞ্জক নয়। নানা উদ্যোগের কথা শোনা গেলেও বাস্তবে কৃষকরা এখনও নতুন ঋণ পেতে সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। একদিকে কিস্তি আদায়ে ব্যাংকের কঠোরতা, অন্যদিকে নতুন ঋণ বিতরণে অনীহা—এই দ্বৈত চাপের মধ্যে পড়ছেন কৃষকেরা।
মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতাও একই কথাই বলছে। ঋণ নিতে হয় অনেক ধাপ, সামলাতে হয় জটিল কাগজপত্র। অনেক ক্ষেত্রেই দালালের উপর নির্ভরশীলতার অভিযোগও উঠেছে। এতে কৃষকের আগ্রহ কমছে, আস্থা দুর্বল হচ্ছে। অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃষিখাতে সীমিত ঋণ প্রবাহ কেবল আর্থিক বৈষম্য নয়, ভবিষ্যৎ খাদ্যনিরাপত্তার জন্যও ঝুঁকির ইঙ্গিত বহন করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ডিসেম্বর শেষে কৃষিঋণের মোট স্থিতি ৬০ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে সব খাতের মোট ঋণ ১৮ লাখ ৩ হাজার ৮৩৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ মোট ঋণের মাত্র ২.১৬ শতাংশই কৃষিতে যাচ্ছে। অথচ দেশের প্রায় ৪৬ শতাংশ শ্রমশক্তি এই খাতে নিয়োজিত এবং জিডিপিতে কৃষির অবদান ১০.৯৪ শতাংশ। ব্যাংকগুলোর নিট ঋণের লক্ষ্য কৃষিতে মাত্র ২.৫ শতাংশ, যা কৃষির গুরুত্বের সঙ্গে তুলনীয় নয়। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এ হার বাস্তব চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়; বরং এটি নীতিগত অবহেলার ইঙ্গিত দেয়।
চলতি অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে কৃষি খাতে ব্যাংকগুলো ২১ হাজার কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই অঙ্ক ছিল ১৬ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ বিতরণ বেড়েছে ৫ হাজার কোটি টাকা বা ৯.৬৯ শতাংশ। এই সময়ে ঋণ আদায় হয়েছে ২১ হাজার ৭৭৪ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ১৩.৮৯ শতাংশ বেশি। মাঠের কৃষকের অভিযোগ, নতুন ঋণ পেতে জটিলতা যত বেশি, কিস্তি আদায়ে তত কঠোরতা।
অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, অতীতের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত উৎপাদন পুনরুদ্ধারে বেশি ঋণ প্রয়োজন ছিল। কিন্তু ব্যাংকগুলোর অনীহার কারণে ঋণের প্রবাহ প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়েনি। ফলশ্রুতিতে অনেক কৃষক অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান জানান, বর্তমান লক্ষ্যমাত্রা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। তবে কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নে ঋণ বিতরণ সহজ করতে ব্যাংক শাখার পাশাপাশি এজেন্ট ব্যাংকিং, সাব-ব্রাঞ্চ, কন্ট্রাক্ট ফার্মিং ও এরিয়া অ্যাপ্রোচ পদ্ধতিতে জোর দেওয়া হচ্ছে।

