মূল্যস্ফীতির চাপের মুখে স্বল্পপুঁজির এসএমই (ক্ষুদ্র ও মাঝারি) খাতের উদ্যোক্তারা টিকে থাকা নিয়েই ব্যস্ত। কাঁচামালের দাম, শ্রমিকের মজুরি, কারখানা ভাড়া ও যাতায়াত খরচের ধারাবাহিক বৃদ্ধির কারণে ব্যবসায়ের ব্যয় বাড়ছে।
অর্থনীতিবিদ ও শিল্প খাতের সংশ্লিষ্টরা জানাচ্ছেন, দেশে নিম্নমানের আমদানিকৃত পণ্যের প্রভাবে স্থানীয় উদ্যোক্তারা অসম প্রতিযোগিতার মুখোমুখি। ন্যূনতম লাভে পণ্য বিক্রি করলেও মধ্যস্বত্বভোগী ও পাইকারদের কারণে উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য বজায় রাখা কঠিন হয়ে গেছে।
এসএমই উদ্যোক্তারা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওঠানামা, ডলারের উঁচু মূল্য এবং রাজনৈতিক অস্থিরতাকেই খাতের সংকটের মূল কারণ হিসেবে দেখছেন। অর্থনীতির বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকার বদলেও ব্যাংকঋণে সুদহার কমেনি। নির্বাচনের সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং বাজারের নানান চ্যালেঞ্জের প্রভাব এসএমই খাতের ব্যবসাকে প্রভাবিত করছে।
এসএমই ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “এসএমই খাত দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। এটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ। তবু পুঁজির সংকট, প্রশিক্ষণ ও দক্ষতার অভাব, বিনিয়োগের ঘাটতি এবং রপ্তানি বাজারে অক্ষমতার কারণে সংকট কাটছে না।”
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশে শুল্ক বৃদ্ধি হওয়ায় কাঁচামাল আমদানি ব্যয় বেড়েছে। দেশের এসএমই উদ্যোক্তারা বেশির ভাগই উপজেলার ব্যবসায়িক এলাকার সঙ্গে যুক্ত। পাইকারি ও আড়তদারদের মধ্য দিয়ে কাঁচামাল পৌঁছানোর সময় দাম কয়েকগুণ বেড়ে যায়। ফলে উঁচু দামের কাঁচামাল দিয়ে উৎপাদন করা কঠিন হয়ে গেছে।” তিনি আরও বলেন, “উৎপাদন সূচকের ক্রমবর্ধমান পতন এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক সূচকও ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, যা স্বল্পপুঁজির উদ্যোক্তাদের জন্য আরও কষ্টকর।”
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক মুস্তফা কে মুজেরী জানাচ্ছেন, বড় ব্যবসায়ীরা পর্যাপ্ত পুঁজির কারণে সংকট কাটিয়ে উঠতে সক্ষম। ব্যাংক ঋণ সহজে পান। কিন্তু এসএমই উদ্যোক্তাদের ঋণ পাওয়ায় বাধা থাকে—ব্যাংকের লাভ কম হওয়া এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের অভাব। তিনি মনে করান, “সরকার চাইলেই এই খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়িয়ে দ্রুত উন্নয়ন ঘটাতে পারবে।”
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অপর্যাপ্ত সরবরাহ, অবকাঠামোগত ঘাটতি এবং বিদেশি পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতার কারণে এসএমই খাতের উদ্যোক্তারা টিকে থাকতে সংগ্রাম করছেন। ক্রমাগত লোকসান আর কিছু প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যেই বন্ধ হয়েছে।
এফবিসিসিআই জানাচ্ছে, দেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৮০ শতাংশ এসএমই খাত থেকে আসে, এবং জিডিপিতে অবদান ২৫ শতাংশের বেশি। বিসিআই সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী বলেন, “এসএমই খাত নতুন উদ্যোক্তা তৈরি, আঞ্চলিক ভারসাম্য এবং নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে গুরুত্বপূর্ণ। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ পুঁজির অভাব। খাতের বিকাশ ছাড়া দেশ উদ্যোক্তানির্ভর অর্থনীতিতে দাঁড়াতে পারবে না। সরকার ও ব্যবসায়ী সংগঠনদের স্বল্পপুঁজির উদ্যোক্তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে।”
নারী উদ্যোক্তাদের সংগঠন ওয়েব ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, “জ্বালানি সরবরাহের ঘাটতি উৎপাদন ও বিনিয়োগকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে। ২০২৩-২৪ সালে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির পর শিল্প খাতে ৩৩ শতাংশ বৃদ্ধি হলেও টেক্সটাইল, স্টিল ও সারের উৎপাদন ৩০–৫০ শতাংশ কমেছে।” বিদায়ী সরকারের শিল্প মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের সুরক্ষা এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতা চেয়েছিলেন।
শিল্পনীতির সংজ্ঞা অনুযায়ী ১৬–৩০০ কর্মীর প্রতিষ্ঠান এসএমই খাতে পড়ে। দেশে ৪৬,২৯১টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ৯৩ শতাংশই অণু, ক্ষুদ্র ও মাঝারি। এ খাত কর্মসংস্থানের ৩১.৫ শতাংশ এবং জিডিপির ৪.৮৫ শতাংশ অবদান রাখে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প ৯০ শতাংশ ব্যবসা ও ৫০ শতাংশের বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি আশরাফ আহমেদ বলেন, “মুদ্রানীতি ও বিনিয়োগের অভাবের কারণে এসএমই খাত সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে। খাতের বিকাশ না হলে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়।”
এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি ও নতুন সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, “প্রতিবেশী দেশের মোট জিডিপির ৬০–৭০ শতাংশে এসএমই অবদান রাখে। ২০৪১ সালের মধ্যে ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য অর্জনের জন্য খাতের সহায়তা জরুরি। আলাদা এসএমই ব্যাংক, শুল্ক বৃদ্ধি এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে মনোযোগ দিতে হবে।” তিনি আরও বলেন, “এসএমই পণ্যের ডিজাইন, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি সমন্বিতভাবে উন্নয়ন করলে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো সম্ভব।” মন্ত্রিসভায় যোগ দেওয়ার আগে তিনি এই কথাগুলো জানিয়েছিলেন।

