বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ছে। প্রচলিত গন্তব্যগুলোতে চাহিদা ধীর। পাশাপাশি বাড়ছে নানা বাণিজ্যিক শর্ত ও বাধা। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প এখন নতুন বাজার খুঁজছে।
দীর্ঘদিন ধরে দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রধান ভরসা এই খাত। তবে রপ্তানির বড় অংশ এখনো ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রে কেন্দ্রীভূত। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শর্ত আরোপের কারণে শিল্পমালিকেরা বিকল্প বাজারে নজর দিচ্ছেন।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি-এর সভাপতি ও রাইজিং ফ্যাশনস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহমুদ হাসান খান (বাবু) বলেন, তৈরি পোশাকশিল্প বহু বছর ধরে দেশের রপ্তানি আয়ের চালিকাশক্তি। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো-এর তথ্য অনুযায়ী, গড়ে প্রতি অর্থবছরে দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৪ শতাংশ আসে এই খাত থেকে।
তবে সাফল্যের পেছনে রয়েছে একটি বড় ঝুঁকি। বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র মিলিয়ে বাংলাদেশের মোট তৈরি পোশাক রপ্তানির প্রায় ৬৮ থেকে ৭০ শতাংশ যায় এই দুই বাজারে। সীমিত গন্তব্যে এমন নির্ভরতা একদিকে স্থিতিশীল আয় দেয়। অন্যদিকে বৈশ্বিক মন্দা, রাজনৈতিক অস্থিরতা বা নীতিগত পরিবর্তন এলে পুরো খাত ঝুঁকিতে পড়ে।
এই পরিস্থিতিতে নতুন ও অপ্রচলিত বাজারে প্রবেশকে সময়োপযোগী কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে দ্রুত বাড়ছে ভোক্তা চাহিদা। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারে তৈরি পোশাকের বাজার সম্প্রসারিত হচ্ছে। লাতিন আমেরিকার ব্রাজিল, মেক্সিকো ও চিলিতেও নতুন ক্রেতা বাড়ছে। আফ্রিকার দক্ষিণ আফ্রিকা, কেনিয়া ও নাইজেরিয়াকে দীর্ঘমেয়াদে সম্ভাবনাময় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো উচ্চমানের বাজারেও রয়েছে সম্প্রসারণের সুযোগ। বাজার বহুমুখীকরণ এখন আর বিকল্প নয়। এটি টিকে থাকার কৌশল। নতুন গন্তব্যে প্রবেশ মানে শুধু রপ্তানি বাড়ানো নয়। বরং ঝুঁকি কমিয়ে শিল্পের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা।
ত্রিমুখী প্রতিযোগিতা:
বৈশ্বিক তৈরি পোশাক বাজারে প্রতিযোগিতা এখন তীব্র। এই প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় দুই প্রতিদ্বন্দ্বী চীন ও ভিয়েতনাম।
চীন: দীর্ঘদিন ধরে তৈরি পোশাক খাতে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে চীন। তবে উচ্চ মজুরি, পরিবেশ সংক্রান্ত কঠোর বাধ্যবাধকতা এবং রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কারণে দেশটি ধীরে ধীরে কিছু বাজার হারাচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্যযুদ্ধ। এই পরিস্থিতিতে চীন থেকে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র কিছুটা রক্ষণশীল অবস্থান নিচ্ছে। ফলে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে পরিবর্তনের আভাস দেখা যাচ্ছে।
ভিয়েতনাম: অন্যদিকে ভিয়েতনাম শক্তিশালী প্রতিযোগী হিসেবে উঠে এসেছে। প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থা, উচ্চ কর্মক্ষমতা এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনার কারণে দেশটি আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে আস্থা তৈরি করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিসহ আরও কয়েকটি বাণিজ্য জোটে যুক্ত থাকায় তারা শুল্ক সুবিধাও পাচ্ছে। এতে করে বৈশ্বিক বাজারে তাদের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান আরও মজবুত হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে সংগঠনটির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, দেশের অবস্থান এখন মাঝামাঝি পর্যায়ে। একদিকে তুলনামূলক সস্তা শ্রম বাংলাদেশের বড় শক্তি। অন্যদিকে দীর্ঘ সময় ধরে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠায় বিশ্ববাজারে একটি দৃঢ় অবস্থান তৈরি হয়েছে। তবে সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। পণ্যের বৈচিত্র্য, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং ব্র্যান্ডিংয়ের ক্ষেত্রে এখনো পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। শিল্পসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে শুধু কম খরচে উৎপাদন নয়, মান, উদ্ভাবন ও দক্ষ ব্যবস্থাপনাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
নতুন বাজারের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ:
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো-এর তথ্য বিশ্লেষণে উঠে এসেছে সাম্প্রতিক চিত্র। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে, অর্থাৎ জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত, বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নে রপ্তানি হয়েছে প্রায় ১২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। যুক্তরাষ্ট্রে গেছে প্রায় ৫ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ প্রচলিত দুই বাজারেই রপ্তানির বড় অংশ কেন্দ্রীভূত রয়েছে।
অন্যদিকে জাপান, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, চীন, রাশিয়া, ব্রাজিল ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো মিলিয়ে নতুন বা অপ্রচলিত বাজারে রপ্তানি হয়েছে আনুমানিক ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার। যা মোট পোশাক রপ্তানির মাত্র ১৪ শতাংশের কিছু বেশি। খাতসংশ্লিষ্টদের লক্ষ্য ছিল এই অংশ অন্তত ২০ শতাংশে উন্নীত করা। কিন্তু বাস্তবে তা সম্ভব হয়নি। বরং সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, নতুন বাজারে রপ্তানির প্রবৃদ্ধি নিম্নমুখী।
২০২৩-২৪ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথমার্ধে এসব বাজারে রপ্তানি কমেছে প্রায় ৩ থেকে ৫ শতাংশ। বিশেষ করে রাশিয়া ও তুরস্কে রপ্তানি কমেছে প্রায় ৮ শতাংশ। মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশেও কমেছে ৬ শতাংশের বেশি। খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, বৈশ্বিক রাজনৈতিক অস্থিরতা, ডলার সংকট এবং ভোক্তা ব্যয়ের চাপ এসব বাজারে চাহিদা কমিয়ে দিয়েছে। ফলে বহুমুখীকরণের লক্ষ্য থাকলেও বাস্তব চিত্র এখনো চ্যালেঞ্জপূর্ণ।
এশিয়ার সম্ভাবনাময় বাজার:
জাপান: বর্তমানে জাপানে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি বছরে প্রায় ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। গত এক দশকে এই বাজারে রপ্তানি দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। তবু জাপানের মোট পোশাক আমদানিতে বাংলাদেশের অংশ এখনো ৪ শতাংশের নিচে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাপানের বাজার বড় সুযোগ তৈরি করলেও মান নিয়ন্ত্রণে কঠোরতা রয়েছে। নিখুঁত সেলাই, উচ্চমানের ফিনিশিং এবং সময়ানুবর্তিতা সেখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের সব কারখানার পক্ষে এসব মানদণ্ড পূরণ এখনো সহজ নয়।
ভারত: ভৌগোলিকভাবে কাছাকাছি হলেও ভারতের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি সীমিত। গেল অর্থবছরে ভারতে রপ্তানি ছিল আনুমানিক ৭৫০ মিলিয়ন ডলার। যা মোট পোশাক রপ্তানির প্রায় ৩ শতাংশ। খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, শুল্ক ও অশুল্ক বাধা, সীমান্তে দীর্ঘসূত্রতা এবং স্থানীয় শিল্প সুরক্ষায় ভারতের নীতিগত অবস্থান রপ্তানি বৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করছে।
চীন: চীনের বাজারে প্রবেশ আরও বেশি চ্যালেঞ্জিং। বিশ্বের বৃহত্তম পোশাক উৎপাদক দেশ হওয়ায় সেখানে প্রতিযোগিতা তীব্র। ২০২৪ সালে চীনের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ছিল প্রায় ৫৫০ মিলিয়ন ডলার। অথচ চীনের মোট পোশাক আমদানি বাজারের আকার ১২০ বিলিয়ন ডলারের বেশি। অর্থাৎ এই বিশাল বাজারে বাংলাদেশের অংশ ১ শতাংশেরও কম। খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, বিশেষায়িত ও উচ্চমূল্যের পণ্য ছাড়া চীনের বাজারে টিকে থাকা কঠিন। ফলে সম্ভাবনা থাকলেও সক্ষমতা বাড়ানো ছাড়া বড় অংশীদার হওয়া সম্ভব নয়।

