বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নৌপথে নতুন যুগের সূচনা হলো। দেশের বৃহত্তম যাত্রীবাহী জাহাজ ‘রূপসা’ এবং ‘সুগন্ধা’ আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করা হয়েছে। আসন্ন ঈদকে সামনে রেখে যাত্রীদের ভোগান্তি কমাতে এবং সড়ক ও রেলপথে যাত্রী চাপ হ্রাসে এই জাহাজ দুটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
গতকাল সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) দেশের শীর্ষস্থানীয় জাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপবিল্ডার্স লিমিটেড তাদের নবনির্মিত এই জাহাজ দুটি নৌ-পরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি)-এর কাছে হস্তান্তর করেছে। সংশ্লিষ্টরা এটিকে দেশের জাহাজ নির্মাণ শিল্পে একটি বড় মাইলফলক হিসেবে দেখছেন।
ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপবিল্ডার্সের পরিচিতি:
চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তীরে অবস্থিত ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপবিল্ডার্স লিমিটেড ২০০০ সালে প্রতিষ্ঠিত। এটি দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় এবং সরকারি তালিকাভুক্ত জাহাজ নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান। ৪২ একরের বেশি জমিতে প্রতিষ্ঠিত এই ইয়ার্ডে ৩,৫০০-এর বেশি কর্মী নিয়োজিত।
প্রতিষ্ঠানটি আন্তর্জাতিক মানের মাল্টি-পারপাস কার্গো জাহাজ, যাত্রীবাহী ভেসেল, টাগবোট এবং ড্রেজার নির্মাণ ও রপ্তানি করে। জার্মানি, ডেনমার্ক ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশে এর জাহাজ রপ্তানি হয়েছে।
উল্লেখযোগ্য নির্মিত জাহাজের মধ্যে রয়েছে:
- রপ্তানিযোগ্য জাহাজ: টাগবোট (খালিদ, ঘায়া), ল্যান্ডিং ক্রাফট (রায়ান), অয়েল ট্যাংকার।
- যাত্রীবাহী জাহাজ: এমভি বাঙালি, এমভি মধুমতি,কেয়ারি সিন্দাবাদ।
- অন্যান্য নৌযান: ফিশিং ট্রলার, কার্গো জাহাজ, রো-রো ফেরি, ড্রেজার।
ওয়েস্টার্ন মেরিনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই জাহাজ দুটি দেশের অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহনকে আরও দক্ষ, নিরাপদ ও আরামদায়ক করবে।
নৌপরিবহনের তাৎপর্য ও যাত্রী সুবিধাসমূহ:
ওয়েস্টার্ন মেরিন গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্যাপ্টেন সোহেল হাসান জানিয়েছেন, আসন্ন ঈদুল ফিতরের ছুটিতে ঘরমুখো মানুষের যাতায়াতে এই জাহাজ দুটি বড় স্বস্তি দেবে। জাহাজ দুটি ঢাকা-বরিশাল-খুলনা রুটে চলাচল করবে। এটি শুধু যাত্রীদের আরামদায়ক ভ্রমণ নিশ্চিত করবে না, বরং দেশের সড়ক ও রেলপথে অতিরিক্ত চাপ কমাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
‘রূপসা’ এবং ‘সুগন্ধা’ জাহাজের সুবিধা ও ক্ষমতা: জাহাজ দুটি যাত্রীদের আরাম এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আধুনিকভাবে ডিজাইন করা হয়েছে। প্রতিটি জাহাজে:
- যাত্রী ধারণক্ষমতা: ৭৬৪ জন
- ক্রু সংখ্যা: ৪৪ জন
- সর্বোচ্চ গতিবেগ: ১২ নটিক্যাল মাইল
- বিলাসবহুল কেবিন সংখ্যা: ৪৬টি (ভিআইপি, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণি)
ভিআইপি ও প্রথম শ্রেণির কেবিনে রয়েছে ৪টি ভিআইপি এবং ২৭টি প্রথম শ্রেণির কেবিন, যা উচ্চবিত্ত ও শৌখিন যাত্রীদের জন্য। দ্বিতীয় শ্রেণিতে আছে ১৫টি কেবিন এবং ৯০ জন যাত্রীর জন্য আধুনিক চেয়ার সিটিং সুবিধা। সাধারণ যাত্রীদের জন্য ৫৮২ জন ধারণক্ষমতার প্যাসেঞ্জার ডেক রয়েছে। জাহাজে রাখা হয়েছে বহুমুখী আসন ও আবাসন ব্যবস্থা, যাতে দীর্ঘ পথেও যাত্রীরা আরামদায়ক ভ্রমণ করতে পারে।
ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপবিল্ডার্স লিমিটেডের হাত ধরে নির্মিত ‘রূপসা’ ও ‘সুগন্ধা’ শুধু দুটি নতুন জাহাজ নয়, বরং দেশের নৌ-শিল্প সক্ষমতার প্রতীক। দেশীয় প্রযুক্তি ও দক্ষ জনশক্তির সমন্বয়ে নির্মিত এই জাহাজগুলো প্রমাণ করেছে, বাংলাদেশ এখন অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন খাতে বড় আকারের আধুনিক জাহাজ নির্মাণে সক্ষম। যাত্রীসেবা উন্নয়ন, নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিতকরণ এবং নৌখাতের প্রসারে ওয়েস্টার্ন মেরিনের এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে আরও বড় সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে।

