খুলনার কয়রার গাতিঘেরি গ্রামের কৃষক দেবাশীষ মণ্ডল এবার আট বিঘা জমিতে বোরো ধান চাষ শুরু করেছেন। মৌসুমের শুরুতে তিনি সরকার নির্ধারিত দামে সার কিনতে পেরেছিলেন। কিন্তু মাঝামাঝি সময়ে ইউরিয়া সার কেজিপ্রতি ৩ থেকে ৬ টাকা বেশি দিয়ে কিনতে হচ্ছে। একই সঙ্গে টিএসপি, ডিএপি, এমওপি সারেও কেজিপ্রতি ৮ থেকে ১০ টাকা বেশি খরচ হচ্ছে। সঙ্গে বেড়ে গেছে শ্রমিক ও সেচের খরচ। ফলে বোরো চাষে লোকসানের শঙ্কা দেখা দিয়েছে এই কৃষকের কাছে।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বোরো মৌসুমের শুরুতেই মাঠে কৃষকদের ব্যস্ততা বেড়ে গেছে। তবে ব্যস্ততার সঙ্গে সঙ্গে উদ্বেগও বাড়ছে। কৃষকরা জানাচ্ছেন, সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি খরচ করে সার কিনতে হচ্ছে। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেকেই বোরো আবাদ কমানোর কথা ভাবছেন। সরকারের পরিবর্তন সত্ত্বেও সারের বাজারে সিন্ডিকেটের প্রভাব কমেনি।
সরকারি সূত্রে বলা হয়, সার সংকট নেই। বিএডিসি জানিয়েছে, গুদামে সার রাখার জায়গা পর্যন্ত নেই। কিন্তু মাঠে কৃষকদের অভিজ্ঞতা ভিন্ন। সরকার নির্ধারিত এক বস্তা ইউরিয়া সারের দাম ১ হাজার ২৫০ টাকা হলেও কৃষককে ১ হাজার ৪৫০–১ হাজার ৪৬০ টাকা খরচ করতে হচ্ছে। ডিএপি সারের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। বস্তাপ্রতি অতিরিক্ত ২০০ টাকা খরচ উৎপাদনের ব্যয় বাড়াচ্ছে এবং খাদ্য নিরাপত্তার জন্যও শঙ্কা তৈরি করছে।
কৃষকরা অভিযোগ করছেন, মৌসুমে ডিলাররা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বেশি দাম আদায় করছেন। নজরদারির অভাবে ডিলার ও খুচরা বিক্রেতা চক্র সারাদেশে দামের অরাজকতা সৃষ্টি করেছে। যদিও অভিযান চলছে, মাঠে স্থায়ী প্রভাব দেখা যাচ্ছে না।
দেশের মোট ধানের বড় অংশ বোরো মৌসুমে উৎপাদিত হয়। এই সময়ে সারের বাজারে অনিয়ম থাকলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে, ফলনে ধাক্কা পড়বে এবং শেষ পর্যন্ত চালের বাজারেও প্রভাব পড়তে পারে। তাই শুধু বরাদ্দ ও মজুত হিসাব নয়, মাঠ পর্যায়ে কার্যকর তদারকির প্রয়োজন বলেই মনে করছেন তারা।
হিসাবে আছে, বাস্তবে ঘাটতি:
বর্তমান বোরো মৌসুমে দেশের প্রায় ৫০ লাখ হেক্টর জমিতে বোরোর আবাদ হচ্ছে। এ সময়ে সোয়া ২ কোটি টনের মতো চাল উৎপাদিত হয়, যা সারাবছরের খাদ্য সরবরাহের প্রধান ভিত্তি। বোরো চাষ সম্পূর্ণভাবে বীজ, সার ও সেচনির ওপর নির্ভরশীল। উপকরণের দাম বাড়লে উৎপাদন খরচও সরাসরি বেড়ে যায়।
শুধু ধান নয়, এই সময় আলু, পেঁয়াজ, সরিষা ও বিভিন্ন সবজি উৎপাদনও চূড়ান্ত পর্যায়ে থাকে। তাই সারের বাজারে অস্থিরতা পুরো খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খলে অনিশ্চয়তা তৈরি করে। গত আমন মৌসুমে দেড় কোটি টনের বেশি চাল উৎপাদিত হলেও কৃষককে বাড়তি দামে সার কিনতে হয়েছে। কিছু অভিযান হলেও ডিলারদের বাড়তি দামের প্রবণতা কমেনি।
সরকারি হিসাবে সারের কোনো সংকট নেই। গুদামে পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। তবু মাঠ পর্যায়ে কৃষকের অভিজ্ঞতা ভিন্ন। সরকার নির্ধারিত ইউরিয়া সারের দাম কেজিপ্রতি ২৭ টাকা হলেও কৃষককে ২–৫ টাকা বেশি খরচ করতে হচ্ছে। টিএসপির ২৭ টাকার নির্ধারিত দামের বিপরীতে ৩–১৩ টাকা বেশি, ডিএপি ২১ টাকার বিপরীতে ৭–১৫ টাকা বেশি, এমওপি ২০ টাকার বিপরীতে ৩–৮ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।
কৃষকের অভিযোগ, পরিবহন ঠিকাদার ও ডিলারের একটি চক্র অবৈধভাবে সার মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে। সরকারি গুদামে সার থাকলেও খুচরা পর্যায়ে সরবরাহ কমিয়ে বাড়তি দাম আদায় করা হচ্ছে। একই ব্যক্তি বা স্বজনের নামে একাধিক ডিলারশিপের অভিযোগও উঠেছে।
সরকার ‘সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ-সংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা-২০০৯’ সংশোধন করেছে। নতুন নীতিমালার মাধ্যমে বিতরণ ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার কথা বলা হলেও, বাস্তবে পুরোনো চক্র সক্রিয় হয়ে গেছে। অভিযোগ রয়েছে, বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএ) একটি অংশ নীতিমালার বিরোধিতা করছে এবং ধীরে বাস্তবায়নের দাবি তুলছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সরকারি হিসাব অনুযায়ী সাড়ে ৫ লাখ টন ইউরিয়া, ৩ লাখ ২১ হাজার টন টিএসপি, ৫ লাখ ৩৩ হাজার টন ডিএপি এবং ৩ লাখ ৩১ হাজার টন এমওপি সারের মজুত রয়েছে। উপজেলা পর্যায়েও চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কিছু সারের বরাদ্দ গত বছরের তুলনায় সামান্য কম। উদাহরণস্বরূপ, চলতি ফেব্রুয়ারিতে টিএসপি বরাদ্দ ৭৫ হাজার ৫০০ টন, যেখানে গত বছর ছিল ৮০ হাজার ৮০০ টনের বেশি। ডিএপি বরাদ্দ ১ লাখ ৩৭ হাজার ৩০০ টন, গত বছর ছিল ১ লাখ ৪৪ হাজার টনের বেশি। এমওপির বরাদ্দ বেড়েছে ৬৭ হাজার ৮০০ টন। যদিও পার্থক্য বড় নয়, ভরা মৌসুমে সামান্য ঘাটতিও বাজারে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময়ও ভরা মৌসুম শুরু হয়েছিল এবং তখনও একই অভিযোগ উঠেছিল– সরকারি পর্যায়ে সারের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়নি। বর্তমানে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। কৃষি মন্ত্রণালয়ে পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী আছেন, জেলা পর্যায়েও নির্বাচিত প্রতিনিধি রয়েছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সমন্বিত নজরদারি থাকলে এখনো বাড়তি দামে সার বিক্রি বন্ধ করা সম্ভব।
কৃত্রিম ঘাটতি, বেড়ে গেছে চাষির খরচ:
১১ জেলায় সমকাল প্রতিনিধিরা মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধান চালিয়ে দেখেছেন, সারের বাজার পরিস্থিতি একরকম নয়। সরকারি হিসাব অনুযায়ী অনেক জেলায় পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। কিন্তু মাঠে কৃষকরা অভিযোগ করছেন, ডিলার সিন্ডিকেট ও কৃত্রিম সংকটের কারণে তারা বাড়তি দামে সার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।
চুয়াডাঙ্গায় বোরো মৌসুমে সারের কোনো ঘাটতি নেই বলে কৃষি বিভাগ জানায়। জেলার মোট আবাদি জমি ৯৪ হাজার ২০ হেক্টর। চার উপজেলায় বিসিআইসি অনুমোদিত ৫০ ও বিএডিসির ৯৩ জন ডিলার রয়েছেন। তবু অভিযোগ রয়েছে, হাতে গোনা কয়েকটি পরিবার সারের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। একই ব্যক্তি বিসিআইসি ও বিএডিসির ডিলারশিপ পেয়েছেন– এমন অভিযোগও উঠেছে। ইউনিয়নের বাসিন্দা না হলেও ডিলারশিপ পাওয়ার ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে।
উল্লেখযোগ্য ডিলাররা হলো: চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার শংকরচন্দ্র ইউনিয়নের মেসার্স হাবিবুর রহমান, আনসার আলী, গড়াইটুপি ইউনিয়নের মেসার্স আনোয়ার ট্রেডার্স, বেগমপুর ইউনিয়নের মেসার্স আকবার আলী, তিতুদহ ইউনিয়নের মেসার্স হুদাবুর রহমান, এবং কার্পাসডাঙ্গা ইউনিয়নের মেসার্স জগবন্ধু বসু ও শম্ভু গোপাল বসু। শংকরচন্দ্র ইউনিয়নের তিন ভাই–ডিঙ্গেদহর আনসার আলী, আকবার আলী ও আনোয়ার হোসেন–অন্য ইউনিয়নে ডিলারশিপ ব্যবসা করছেন।
তবে জেলা সার ডিলার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. আকবার আলী দাবি করেন, নীতিমালা অনুযায়ী ডিলারশিপ পেয়েছেন এবং সেই অনুযায়ী ব্যবসা করছেন। কৃষকরা অভিযোগ করছেন, মৌসুমের শুরুতেই কৃত্রিম সংকট তৈরি করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।
গাইবান্ধায় সাত উপজেলায় ১ লাখ ২৯ হাজার ২০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হচ্ছে। প্রয়োজনীয় ইউরিয়া, টিএসপি, পটাশ ও ডিএপির প্রায় পুরো চাহিদা মজুত রয়েছে। সরকারি নির্ধারিত দাম হলো ইউরিয়া ২৭ টাকা, টিএসপি ২৭ টাকা, পটাশ ২০ টাকা ও ডিএপি ২১ টাকা কেজি। তবে খুচরা বাজারে কেজিপ্রতি ৩–৫ টাকা বেশি নেওয়ার অভিযোগ আছে। রসিদ চাইলে সার না দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে। খোলাহাটি ইউনিয়নের কৃষক সাগির মিয়া জানান, বোরো চাষে খরচ বেড়েছে, বিশেষ করে সার ৩–৫ টাকা বেশি, কীটনাশকের দাম ১৫–২০ শতাংশ বেড়ে গেছে।
দিনাজপুরে ফেব্রুয়ারিতে সারের বরাদ্দ কম পাওয়ার তথ্য মিলেছে। ইউরিয়া, ডিএপি, টিএসপি চাহিদার তুলনায় কম এসেছে। ফলে বাজারে ‘সংকটের অজুহাত’ দেখিয়ে বাড়তি দাম আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। এক বিঘা জমিতে বোরো আবাদে খরচ প্রায় ৩৫ হাজার টাকা, লাভ মাত্র ৫–১০ হাজার টাকা; সেখানে সারের দাম বাড়লে লাভ প্রায় শূন্যে নেমে আসে। মাধবপুর গ্রামের কৃষক রফিকুল ইসলাম জানান, টিএসপি কিনতে গেলে বাজারে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। দক্ষিণনগর এলাকার কৃষক বেনুরাম সরকারও বলছেন, অনেক কৃষক সার পাচ্ছেন না, অতিরিক্ত দাম দিয়ে কিনতে হচ্ছে।
রাজশাহীর বাগমারা, তানোর, বাঘা ও চারঘাটের কৃষকরা বলছেন, সরকারি দামে সার পাওয়া যায় না; বেশি দিলে মিলছে। বাগমারায় রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তির বাড়ি থেকে শত শত বস্তা সার উদ্ধার হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে। তবে জেলা কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, মাঠে ৬ হাজার টন সার সরবরাহ আছে; সংকট নেই। তানোরের রুবেল হোসেন বলেন, সরকারি দামের চেয়ে ৩০০–৪০০ টাকা বেশি দিয়ে সার কিনতে হচ্ছে।
যশোরে কৃষকরা জানাচ্ছেন, ইউরিয়া ও ডিএপি সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বস্তাপ্রতি ২০০–৩০০ টাকা বেশি দিয়ে কিনতে হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু বিসিআইসি ডিলার বরাদ্দের সার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে পছন্দের খুচরা বিক্রেতার কাছে ছাড়ছেন। ডিলারদের দাবি, কমিশন কম এবং পরিবহন ও ক্ষয়ক্ষতির খরচ তুলতে বাড়তি দাম নেওয়া হচ্ছে।
মনিরামপুরের রোহিতার কৃষক নাজমুল জানান, মৌসুমে বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পরিকল্পিত সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানো হচ্ছে। সরকারি ডিলারদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সার পাওয়া যাচ্ছে না, অথচ গ্রামের খুচরা দোকানে একই সার বেশি দামে মিলছে।

