মোবাইলে আর্থিক সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ‘নগদ’ বেসরকারি খাতে ছাড়ার প্রসঙ্গে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর গত সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) এক জাতীয় দৈনিককে বলেন, ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেম ওরফে আরমানের চিঠি তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে পাননি। তবে ব্যারিস্টার আরমান চিঠির সত্যতা স্বীকার করেছেন।
গভর্নরের এমন বক্তব্যের এক দিন পরই ব্যারিস্টার আরমান বাংলাদেশ ব্যাংকে গভর্নরের সঙ্গে বৈঠক করেন। এর আগে গত ৮ ফেব্রুয়ারি ব্যারিস্টার আরমান বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে একটি চিঠি দেন। চিঠিতে তিনি স্পষ্টভাবে নগদ কেনার আগ্রহ প্রকাশ করেন। উল্লেখ করেন, তার আগেও গভর্নরের সঙ্গে একাধিক বৈঠক হয়েছে এবং বৈঠকের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি নগদ ডিজিটাল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস সংক্রান্ত পরামর্শের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
সংসদ নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে দেওয়া চিঠিতে ব্যারিস্টার আরমান আরও জানান, বাংলাদেশের ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স গ্রহণ ও প্রতিষ্ঠার জন্য গভর্নরের সহযোগিতা মূল উদ্দেশ্য। উদীয়মান প্রযুক্তি ও ডিজিটাল উদ্ভাবনের মাধ্যমে বৈশ্বিক আর্থিক খাতের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশের ডিজিটাল ব্যাংকিং খাত এগিয়ে নেওয়ার স্বপ্ন তিনি তুলে ধরেন। উল্লেখযোগ্য, ইতিমধ্যে কয়েকজন বিদেশি বিনিয়োগকারীও তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন।
চিঠিতে নগদকে ‘সম্মানজনক ও সম্ভাবনাময় সুযোগ’ হিসেবে উল্লেখ করে বিনিয়োগের আগে একটি পূর্ণাঙ্গ ফরেনসিক অডিটের অনুমতি চান তিনি। অডিটের মাধ্যমে নগদের আর্থিক ও ব্যবসায়িক অবস্থা যাচাই করার প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করা হয়েছে।
গত মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের সঙ্গে বৈঠক শেষে ব্যারিস্টার আরমান সাংবাদিকদের জানান, ‘নগদ’-কে বেসরকারি খাতে ছাড়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নতুন সরকারের নীতির ওপর নির্ভর করবে। সরকার ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিলে বিনিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হবে।
আরমান বলেন, তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে নয়, একজন পেশাদার আইনজীবী হিসেবে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছেন। তিনি আরও জানান, আগে ডেল, মাইক্রোসফট, অ্যাপল ও উবারের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে। এখন সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের পক্ষে আইনগত সহায়তা দিচ্ছেন।
নগদে বিনিয়োগ লাভজনক হবে কি না তা যাচাই করার জন্য অডিটের প্রস্তাবও গভর্নরকে জানানো হয়েছে। সংসদ সদস্য হওয়ার পর স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করা স্বার্থের সংঘাত সৃষ্টি করবে কি না এমন প্রশ্নে ব্যারিস্টার আরমান বলেন, “সংসদ সদস্য হিসেবে এই দায়িত্ব কোনো স্বার্থের সংঘাত তৈরি করে না। রাজনীতি করছি জনগণের সেবার জন্য, এখানে কোনো আয় নেই।”
২০১৯ সালের ২৬ মার্চ মোবাইলে আর্থিক সেবা হিসেবে যাত্রা শুরু করে ‘নগদ’। পরে প্রতিষ্ঠানটিকে ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়া হয়। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নগদকে নিয়ম ভেঙে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর ২০২৪ সালের ২১ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংক নগদের আগের পর্ষদ ভেঙে প্রশাসক নিয়োগ দেয়। তবে উচ্চ আদালত পরে সেই সিদ্ধান্ত অবৈধ ঘোষণা করলে ডাক অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্ব গ্রহণ করে।
অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে নগদের সাবেক চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ ২৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে বাংলাদেশ ব্যাংক। মামলায় বলা হয়, ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে বিভিন্ন ব্যাংকের ই-মানি পরিদর্শনে ১০১ কোটি টাকার রিয়েল মানি ঘাটতি এবং ৬৪৫ কোটি টাকার ই-মানি ঘাটতির তথ্য উঠে আসে।
গত আগস্টে গভর্নর ঘোষণা করেন, নগদকে বেসরকারি খাতে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘পোস্ট অফিসের পক্ষে নগদ পরিচালনা সম্ভব নয়। এজন্য একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে প্রধান শেয়ারহোল্ডার হিসেবে যুক্ত করতে হবে।’

