মুষলধারে বৃষ্টি নামলেই রাজধানীর দক্ষিণাংশে যেন থেমে যায় স্বাভাবিক জীবন। পল্টন, রমনা, বংশাল, যাত্রাবাড়ী ও মতিঝিল এলাকায় হাঁটুসমান পানি জমে থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীরা পড়েন চরম ভোগান্তিতে। এই চিত্র বদলাতে বড় আকারের উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় ডিএসসিসির আওতাধীন প্রধান সড়কের ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা, নর্দমা ও ফুটপাত সংস্কার ও উন্নয়নের একটি প্রকল্প তৈরি করে অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে। প্রস্তাবিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৯৪৫ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। প্রকল্পটি যাচাই করতে সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে কয়েকটি বিষয়ে আপত্তি তুলে সংশোধনের পর অনুমোদনের সুপারিশ করা হয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে ডিএসসিসি।
পরিকল্পনা কমিশন ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ঢাকা দেশের রাজধানী এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র। বিশ্বের ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। প্রায় দুই কোটি মানুষের বসবাস এই মহানগরে। জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে যানবাহন। ফলে স্থায়ী যানজট এখন নিত্যদিনের বাস্তবতা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অতিবৃষ্টির ঘটনা বাড়ায় জলাবদ্ধতা নতুন করে দুর্ভোগ বাড়িয়েছে। অধিকাংশ ফুটপাত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পথচারীদের নিরাপদ চলাচলও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রধান সড়ক, নর্দমা ও ফুটপাত সংস্কারকে জরুরি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। স্থানীয় সরকার বিভাগ সে অনুযায়ী প্রকল্প প্রণয়ন করে।
প্রকল্পের লক্ষ্য চারটি—যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়ন, জলাবদ্ধতা নিরসন, পথচারীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্য চলাচল নিশ্চিত করা এবং যানজট কমানো। মোট ব্যয়ের মধ্যে ডিএসসিসি বহন করবে ২৮৩ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। বাকি ৬৬১ কোটি ৮২ লাখ টাকা আসবে সরকারি কোষাগার থেকে। শুরুতে বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছিল ২০২৫ সালের ১ অক্টোবর থেকে ২০২৮ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত। এটি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে অননুমোদিত নতুন প্রকল্প তালিকায় রয়েছে।
প্রকল্প এলাকা নির্ধারণ করা হয়েছে ডিএসসিসির অঞ্চল-১ থেকে ৫ পর্যন্ত। এর আওতায় থাকবে ধানমন্ডি, নিউ মার্কেট, শাহবাগ, রমনা, পল্টন, শাহজাহানপুর, লালবাগ, বংশাল, যাত্রাবাড়ী ও মতিঝিল থানা এলাকা। কাজের পরিধি অনুযায়ী প্রায় সাড়ে ৪০ কিলোমিটার প্রধান সড়ক, ৬৮ কিলোমিটার নর্দমা এবং ৬৬ কিলোমিটার ফুটপাত উন্নয়ন করা হবে। ব্যয়ের বড় অংশ যাবে ড্রেনেজ ব্যবস্থায়। নর্দমা উন্নয়নে ধরা হয়েছে ৬৩৮ কোটি টাকা। সড়ক উন্নয়নে ২০৫ কোটি এবং ফুটপাত নির্মাণে ৭৩ কোটি টাকা ব্যয় করা হবে। ইউটিলিটি লাইন ও তার সরাতে থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১০ কোটি টাকা। কর্মকর্তাদের সম্মানী ভাতা ১০ লাখ, প্রচার ও বিজ্ঞাপনে ৫ লাখ এবং স্টেশনারি খাতে ৫ লাখ টাকা ধরা হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রকল্প ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৯৪৫ কোটি ৫৪ লাখ টাকা।
পিইসি সভায় প্রকল্পের নাম সংশোধনের নির্দেশ দেওয়া হয়। নতুন নাম প্রস্তাব করা হয়েছে—সড়ক, ড্রেনেজ ও ফুটপাত উন্নয়নের মাধ্যমে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসন ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন। একই সঙ্গে প্রকল্পের মেয়াদকাল পুনর্নির্ধারণ করে ২০২৬ সালের ১ এপ্রিল থেকে ২০২৯ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত তিন বছর করার সুপারিশ করা হয়েছে।
এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট সব ইউটিলিটি সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় সভা করে তাদের প্রকল্পসংক্রান্ত তথ্য ডিপিপিতে যুক্ত করতে হবে। অর্থায়নের বিষয়ে অর্থ বিভাগের সম্মতি নিয়ে তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পূর্তকাজের প্যাকেজভিত্তিক ক্রয়পদ্ধতি ও সম্ভাব্য সময়সূচিও প্রকল্প মেয়াদের মধ্যে নির্ধারণ করতে বলা হয়েছে।
ডিপিপিতে প্রস্তাবিত প্রতিটি সড়ক, নর্দমা ও ফুটপাতের পৃথক তালিকা, নকশা, দৈর্ঘ্য-প্রস্থভিত্তিক একক ব্যয় এবং জিআইএস ম্যাপ সংযুক্ত করার সুপারিশ এসেছে। সড়কের প্রস্থভেদে আলাদা নকশা যুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি চলমান বা প্রস্তাবিত অন্য কোনো প্রকল্পের সঙ্গে দ্বৈততা নেই—এ মর্মে প্রত্যয়ন সংযুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে দক্ষিণ ঢাকার দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা ও অবকাঠামোগত সংকট নিরসনে এটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে অনুমোদন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া কত দ্রুত এগোয়, তার ওপরই নির্ভর করবে নগরবাসীর প্রত্যাশা পূরণ হবে কি না।

