বাংলাদেশ সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক চাপ সামলে উল্লেখযোগ্য স্থিতিস্থাপকতা দেখিয়েছে। আগামী কয়েক বছরে প্রবৃদ্ধি ধীরে ধীরে আরও জোরদার হবে—এমনটাই মনে করছেন এইচএসবিসি গ্লোবাল রিসার্চ এশিয়ার প্রধান, অর্থনীতিবিদ ফ্রেডেরিক নিউম্যান।
গত সোমবার বাংলাদেশে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি জানান, ২০২৬ সালে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশ হতে পারে। ২০২৭ সালে তা বেড়ে ৫ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছাবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে ব্যাংকটি। রপ্তানি আয়ের ক্ষেত্রেও ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত রয়েছে। ২০২৬ ক্যালেন্ডার বছরে রপ্তানি মূল্য প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ১ শতাংশ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও এটি মাঝারি মাত্রার পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত দেয়।
‘বাংলাদেশ অ্যান্ড দ্য ওয়ার্ল্ড: ইকোনমিক প্রসপেক্টস ফর ২০২৬ অ্যান্ড বিয়ন্ড’ শীর্ষক এই আয়োজন করে হংকং অ্যান্ড সাংহাই ব্যাংকিং করপোরেশন লিমিটেড। এতে দেশের শীর্ষ আর্থিক কর্মকর্তা, করপোরেট নেতা ও নীতিনির্ধারকেরা অংশ নেন। বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক প্রবণতা এবং তার প্রভাব নিয়ে আলোচনা হয়।
জুমের মাধ্যমে মূল বক্তব্যে নিউম্যান বলেন, বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি, কঠোর আর্থিক পরিবেশ ও বহির্বাণিজ্যে অস্থিরতার মতো ধাক্কা সত্ত্বেও বাংলাদেশ স্থিতিশীল অবস্থানে ফিরে এসেছে। প্রবাসী আয় বছরওয়ারি বাড়ছে। আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে অর্থ পাঠানোর প্রবণতা বাড়ায় এই প্রবাহ শক্তিশালী হয়েছে। মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমায় ব্যক্তিখাতের ভোগব্যয়ও সমর্থন পাবে। যা অর্থনীতির বড় চালিকাশক্তি।
তবে তিনি সতর্ক করেন, সাম্প্রতিক সাধারণ নির্বাচনের পর দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ কিছুটা বাড়তে পারে। কিন্তু বড় ধরনের গতি পেতে হলে নতুন সরকারকে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। আইনশৃঙ্খলা জোরদার করা, নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৬ সালের নভেম্বরে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণকে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে এ উত্তরণের সঙ্গে নতুন চ্যালেঞ্জও আসবে। বাজারে প্রবেশাধিকার বাড়ানো, সুশাসন উন্নত করা এবং অবকাঠামো শক্তিশালী করার মাধ্যমে রপ্তানির প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে হবে। তার ভাষায়, এলডিসি উত্তরণ সংস্কারের তাগিদ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। অনুকূল বাণিজ্য সুবিধা নিশ্চিত করা এবং প্রচলিত পণ্যের বাইরে রপ্তানি বৈচিত্র্য আনা জরুরি।
বৈশ্বিক ভোক্তা চাহিদা কমে যাওয়া অর্থনীতির প্রধান বহিঃঝুঁকি বলে মনে করেন নিউম্যান। যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত শুল্ক ব্যবস্থাও এর একটি কারণ। এতে রপ্তানিমুখী খাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প চাপে পড়তে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার ওপর জোর দেন তিনি। কারণ এটি বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার। এলডিসি উত্তরণের পরও যেন অগ্রাধিকারমূলক বা কাছাকাছি সুবিধা বজায় থাকে, তা নিশ্চিত করা রপ্তানি ও কর্মসংস্থান টিকিয়ে রাখতে জরুরি।
নিউম্যান বলেন, শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার গঠিত হয়েছে। এখন তাদের হাতে স্পষ্ট রাজনৈতিক ম্যান্ডেট রয়েছে। প্রতিশ্রুত সংস্কার বাস্তবায়ন এবং তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশা পূরণে সরকারকে দৃঢ় অবস্থান দেখাতে হবে। মূল বক্তব্যের পর প্রশ্নোত্তর পর্বে অংশগ্রহণকারীরা বিনিময় হার ব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগ পরিবেশ সংস্কার এবং বৈশ্বিক আর্থিক বাজারের প্রবণতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
অনুষ্ঠানে এইচএসবিসি বাংলাদেশের প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা জিগনেশ রূপারেল ব্যাংকটির সর্বশেষ বৈশ্বিক আর্থিক ফলাফল ও আন্তর্জাতিক সক্ষমতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ১৬১ বছরের ইতিহাসে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সহজ করার লক্ষ্যই এইচএসবিসির ভিত্তি। বাংলাদেশসহ ৫৬টি দেশ ও অঞ্চলে উপস্থিতি নিয়ে গ্রাহকদের বৈশ্বিক সুযোগের সঙ্গে যুক্ত করছে প্রতিষ্ঠানটি।
ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশের সভাপতি কাওসার আলম বলেন, এই আয়োজনটি সময়োপযোগী। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের পরিবর্তিত সামষ্টিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা বোঝার সুযোগ তৈরি হয়েছে। অনুকূল জনসংখ্যাগত কাঠামো ও স্থিতিশীল বেসরকারি খাত দেশের বড় সম্ভাবনা। কাঠামোগত বাধা দূর করে কার্যকর সংস্কার বাস্তবায়ন করা গেলে ২০৪০ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হওয়ার লক্ষ্য অর্জন সম্ভব।
এইচএসবিসি বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাহবুব উর রহমান বলেন, ২০২৫ সালে ব্যাংকের শক্ত অবস্থান তাদের বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক ও গ্রাহকের আস্থার প্রতিফলন। সংস্কার ও প্রবৃদ্ধির নতুন পর্যায়ে প্রবেশের সময় স্থানীয় সম্ভাবনাকে বৈশ্বিক সুযোগের সঙ্গে যুক্ত করাই তাদের লক্ষ্য। ‘সিএফও কানেক্ট’-এর মতো উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের জ্যেষ্ঠ আর্থিক কর্মকর্তাদের জন্য অভিজ্ঞতা বিনিময় ও বৈশ্বিক প্রবণতা বোঝার একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে চায় ব্যাংকটি। অনুষ্ঠানে দেশীয় ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা ও শীর্ষ নির্বাহীরা উপস্থিত ছিলেন।

