রাজধানীতে অনুষ্ঠিত এক গোলটেবিল আলোচনায় অর্থনৈতিক সংস্কার ও ভবিষ্যৎ উন্নয়ন কৌশল নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামো পুনর্গঠনের জন্য একটি সমন্বিত রূপরেখা তুলে ধরেন, যেখানে দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগনির্ভর প্রবৃদ্ধির দিকে অগ্রসর হওয়ার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
‘বাংলাদেশের উন্নয়ন পর্যালোচনা: নবনির্বাচিত সরকারের স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি অগ্রাধিকার’ শীর্ষক আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিতুমীর বলেন, অতীতের ভোগনির্ভর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই প্রমাণিত হয়নি। বিশেষ করে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে সঞ্চিত ঋণের চাপ অর্থনীতির ওপর উল্লেখযোগ্য বোঝা তৈরি করেছে।
এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে সরকার দ্রুত বিনিয়োগনির্ভর অর্থনৈতিক কাঠামোর দিকে রূপান্তরের উদ্যোগ নিচ্ছে বলে তিনি জানান। তার মতে, দেশীয় বিনিয়োগের পাশাপাশি প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) বাড়ানো গেলে অর্থনীতির ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে।
কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর লক্ষ্য:
অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ বাড়ানোকে এই রূপান্তরের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেন তিতুমীর। তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত বিশ্বের নিম্নতমগুলোর একটি। এই অবস্থার পরিবর্তনে ২০৩৫ সালের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত গড়ে ১৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে লক্ষ্য অর্জনে ধাপে ধাপে অগ্রসর হওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। প্রথমে তুলনামূলক স্বল্পমাত্রার বৃদ্ধি নিশ্চিত করে পরবর্তী পর্যায়ে বড় পরিসরে রাজস্ব বৃদ্ধির পথ তৈরি করা হবে।
কর সংস্কৃতি ও রাজস্ব কাঠামো সংস্কারের প্রয়োজন:
উপদেষ্টা বলেন, টেকসই অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানকে উৎসাহিত করে এমন কর সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি। একই সঙ্গে বর্তমান রাজস্ব কাঠামোর বিভিন্ন কাঠামোগত দুর্বলতার দিকেও তিনি ইঙ্গিত করেন।
স্ট্যাটুটরি রেগুলেটরি অর্ডার (এসআরও)-এর অতিরিক্ত ব্যবহারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, এটি অনেক সময় এমন একটি ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে যেখানে প্রভাবের ভিত্তিতে সুবিধা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। তাই ন্যায্য প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করতে এই নির্ভরতা কমানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
তিতুমীর জানান, সরকার পরিচয় বা প্রভাবনির্ভর ‘গ্রিনফিল্ড’ প্রণোদনার পরিবর্তে কার্যসম্পাদনভিত্তিক (এক্স-পোস্ট) ভর্তুকি ব্যবস্থার দিকে যেতে চায়। এই পদ্ধতিতে সম্ভাবনার ভিত্তিতে নয়, বরং বাস্তব ফলাফলের ভিত্তিতে প্রণোদনা দেওয়া হবে। তৈরি পোশাক খাতে এমন মডেলের ইতিবাচক উদাহরণ রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
রাজস্ব আহরণে শুধু বৃহৎ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ)-এর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার প্রবণতাকেও একটি বড় সীমাবদ্ধতা হিসেবে তুলে ধরেন তিনি। তার মতে, কর প্রশাসনের সব ইউনিটে সমানভাবে দক্ষতা বাড়াতে হবে, যাতে রাজস্ব আহরণ আরও বিস্তৃত ভিত্তির ওপর দাঁড়ায়। তিনি আরও বলেন, বর্তমান দারিদ্র্য পরিস্থিতিতে কেবল কৃচ্ছ্রসাধন নীতি কার্যকর সমাধান নয়। বরং অপচয় কমানো এবং রাজস্ব নীতিকে পুনর্গঠন করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বাস্তবায়ন হার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিতুমীর বলেন, সরকারি অর্থের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে জবাবদিহি জোরদার করা প্রয়োজন। বিশেষ করে জ্বালানি খাতে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি ব্যয়ের বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি জানান, এই চাপ কমাতে সরকার কয়েকটি কৌশলগত উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছে।
আলোচনার শেষাংশে দেশের বিশিষ্ট নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিতুমীর বলেন, জনসেবামূলক পণ্য ও সেবার অর্থায়ন নিশ্চিত করতে কর প্রদানের সংস্কৃতি শক্তিশালী করা জরুরি। একই সঙ্গে পরিচালন ব্যয় কমিয়ে উন্নয়ন ব্যয় বাড়ানোর মাধ্যমে সামগ্রিক সামাজিক কল্যাণ নিশ্চিত করার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।

