প্রাচ্যের অক্সফোর্ডখ্যাত প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ২০২১ সালে তার শতবর্ষ পূর্ণ করেছে। শতাব্দী পেরোনোর পরও প্রাচীন এই বিশ্ববিদ্যালয়টির কোনো পূর্ণাঙ্গ আর্থিক প্রতিবেদন কখনোই প্রকাশ হয়নি। অর্থনৈতিক এ তথ্যের অভাবে জনসাধারণ ও সংশ্লিষ্টরা জানে না বিশ্ববিদ্যালয়ের কত সম্পদ আছে, কত দায় আছে, আয়-ব্যয় কত এবং কতটা অনুদান এসেছে। শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, গত বছর প্রতিষ্ঠিত বগুড়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা লক্ষ্য করা গেছে।
একটি অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দেশের ৫৬টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনোটি বার্ষিক আর্থিক হিসাব বিবরণী তৈরি করে না। ডিজিটাল যুগে এসে এ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখনও ম্যানুয়ালি আয়-ব্যয়ের হিসাব রাখে। এ পরিস্থিতি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।
আইসিএবির উদ্বেগ:
দ্য ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশের (আইসিএবি) প্রেসিডেন্ট এন কে এ মবিন বলেন, “পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জনগণের অর্থে পরিচালিত হয়। তাদের অবশ্যই পূর্ণাঙ্গ আর্থিক প্রতিবেদন থাকা উচিত। ব্যালেন্সশিট ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পদ ও দায়-দেনার বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া সম্ভব নয়। এতে অনিয়মের সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়।”
তিনি উদাহরণ দেন, “ধরা যাক, বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম বছর ১০টি গাড়ি কিনল, পরের বছর আরও ৫টি। ব্যালেন্সশিট না থাকলে জানার উপায় নেই কোন গাড়ি ব্যবহার হচ্ছে, কোনটা নষ্ট হয়েছে। এর ফলে সম্পদ ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের সম্ভাবনা থাকে।”
আর্থিক প্রতিবেদনের গুরুত্ব:
একজন পূর্ণাঙ্গ আর্থিক প্রতিবেদন সাধারণত চারটি অংশে বিভক্ত—ব্যালেন্সশিট, ইনকাম স্টেটমেন্ট, ক্যাশ ফ্লো স্টেটমেন্ট এবং চেঞ্জেস ইন ইক্যুইটি। এই চারটি অংশ একসাথে প্রতিষ্ঠানের সম্পদ, দায়-দেনা, আয়-ব্যয় ও আর্থিক অবস্থার পূর্ণ চিত্র তুলে ধরে। শুধুমাত্র আয়ের হিসাব দিয়ে কোনো প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং ও ইনফরমেশন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আল আমিন বলেন, “যে প্রতিষ্ঠান আয়-ব্যয় করে বা কোনো সেবা দেয়, তার আর্থিক প্রতিবেদন থাকা আবশ্যক। শুধু আয়ের হিসাব দিয়ে আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়ের প্রায় সবই আসে শিক্ষার্থীর ফি থেকে। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কম ফি ও সরকারের অনুদান থেকে পরিচালিত হয়। অনুদান ইউজিসির মাধ্যমে আসে এবং তা অডিট হয়। সরকারি ক্রয় নীতিমালা অনুসরণ করা হয়। তাই স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলার সুযোগ কম।”
ইউজিসি ও এফআরসির পদক্ষেপ:
ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (এফআরসি) জানিয়েছে, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আর্থিক হিসাব বিবরণী তৈরি না হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে (ইউজিসি) নির্দেশনা দেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। এর ফলে ইউজিসি দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে আর্থিক হিসাব বিবরণী প্রস্তুতির জন্য চিঠি দিয়েছে।
ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আইয়ুব ইসলাম বলেন, “প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়কে আর্থিক হিসাব বিবরণী তৈরির জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছে। এফআরসির নির্দেশিত মডিউল অনুসরণ করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রতিবেদন তৈরি করবে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক অনিয়ম ও অস্বচ্ছতা অনেকাংশে কমবে।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক এম জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী ও হিসাব পরিচালক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, “বিশ্ববিদ্যালয় আয়-ব্যয়ের হিসাব তৈরি করে কোষাধ্যক্ষের দপ্তরে পাঠায়। এটি অনুমোদিত হয়ে প্রতি বছর সরকারি অডিটে যায়। তবে অন্যান্য কোনো আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি হয় না। ইউজিসির চিঠি জানার পরও কোন প্রজ্ঞাপন বা বাধ্যবাধকতা নেই।”
বেসরকারি বনাম সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়:
প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের আর্থিক হিসাব বিবরণী তৈরি করে এবং বহিঃনিরীক্ষকের মাধ্যমে নিরীক্ষিত হয়। কিন্তু সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সামগ্রিক আর্থিক হিসাব বিবরণী তৈরি করে না। শুধুমাত্র অভ্যন্তরীণ ব্যবহারের জন্য আয়-ব্যয়ের হিসাব তৈরি করা হয়। এ কারণে সম্পদ ও দায়ের সঠিক তথ্য পাওয়া সম্ভব হয় না।
এফআরসির অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ৫৬টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ১০টির ক্ষেত্রে অডিটের নির্দেশনা আছে, বাকি ৪৬টির ক্ষেত্রে নেই। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আর্থিক স্বচ্ছতায় বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দেয়।
সম্ভাব্য সমাধান:
আইসিএবি প্রেসিডেন্ট এন কে এ মবিন মনে করেন, এক্সটার্নাল অডিট ফার্ম নিয়োগ দিয়ে গত ১০ বছরের সম্পদের ওপেনিং ব্যালেন্স তৈরি করা যেতে পারে। এরপর ধারাবাহিকভাবে প্রতিবেদন তৈরি ও পর্যালোচনা সম্ভব। এ ধরনের পদক্ষেপ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে।
এফআরসি দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক ব্যবস্থা উন্নয়নের লক্ষ্যে পূর্ণাঙ্গ আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি ও বহিঃনিরীক্ষণের মাধ্যমে সুশাসন নিশ্চিত করার কাজ করছে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা অনেকাংশে বৃদ্ধি পাবে।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আর্থিক প্রতিবেদনের অভাব শুধুমাত্র হিসাবের ঘাটতি নয়। এটি পুরো ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতার প্রশ্ন। এফআরসির পদক্ষেপ ও ইউজিসির নির্দেশনা বাস্তবায়িত হলে দেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মতো আর্থিক স্বচ্ছতা বজায় রাখতে পারবে।

