দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন এবার রীতিমতো কঠিন পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। সংখ্যার হিসেবে এই নিয়োগ যেন এক অবিশ্বাস্য বাস্তবতা সামনে এনে দিয়েছে। মাত্র ১ হাজার ১২২টি শূন্য পদের বিপরীতে আবেদন জমা পড়েছে প্রায় সাত লাখ। অর্থাৎ গড়ে একটি পদের জন্য লড়ছেন ছয় শতাধিক প্রার্থী। বাংলাদেশে সরকারি চাকরির প্রতিযোগিতা যে কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে, এই একটি তথ্যই তা স্পষ্ট করে দেয়।
বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশনের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই নিয়োগে আবেদন প্রক্রিয়া শেষ হয় গত বছরের ২৬ অক্টোবর। তখন থেকেই কমিশন বিশাল এই পরীক্ষার আয়োজন নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছে। কারণ সাত লাখ পরীক্ষার্থীর জন্য একযোগে পরীক্ষা নেওয়া মানেই এটি দেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে অন্যতম বড় নিয়োগ পরীক্ষা।
এই বিপুল আগ্রহের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে প্রধান শিক্ষক পদের বেতন কাঠামোর পরিবর্তন। সম্প্রতি সরকার এই পদকে ১১তম গ্রেড থেকে উন্নীত করে ১০ম গ্রেডে অন্তর্ভুক্ত করেছে। এর ফলে প্রধান শিক্ষকদের মূল বেতন এখন শুরু হচ্ছে ১৬ হাজার টাকা থেকে, যা অভিজ্ঞতা ও পদোন্নতির সঙ্গে বাড়তে বাড়তে সর্বোচ্চ ৩৮ হাজার ৬৪০ টাকায় পৌঁছাতে পারে। আগে যেখানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকদের বেতন শুরু হতো মাত্র ১২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে, সেখানে এই উন্নয়ন স্বাভাবিকভাবেই চাকরিপ্রার্থীদের দৃষ্টি কেড়েছে।
বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি সামাজিক মর্যাদাও এই পদের প্রতি আকর্ষণ বাড়িয়েছে। একটি বিদ্যালয়ের নেতৃত্ব দেওয়া, শিক্ষার মান উন্নয়নে সরাসরি ভূমিকা রাখা—এই দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত সম্মান অনেক মেধাবী ও অভিজ্ঞ শিক্ষক প্রার্থীকেই নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। ফলে প্রতিযোগিতা শুধু সংখ্যায় নয়, মানের দিক থেকেও অনেক বেশি তীব্র হয়েছে।
তবে এই নিয়োগের পথটা এত সংকীর্ণ হওয়ার পেছনে আরেকটি বড় কারণ রয়েছে। প্রধান শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ২০২৫ সালের ৩১ আগস্ট। তখন শূন্য পদের সংখ্যা ছিল ২ হাজার ১৬৯টি। কিন্তু পরবর্তীতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা সংশোধন করা হলে পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে যায়। নতুন বিধিমালা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, মোট শূন্য পদের ৮০ শতাংশ পদোন্নতির মাধ্যমে পূরণ করা হবে এবং মাত্র ২০ শতাংশ পদ সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে দেওয়া হবে। এর ফলেই সরাসরি নিয়োগের জন্য পদের সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ১২২টিতে। পদের সংখ্যা হঠাৎ কমে যাওয়া এবং একই সময়ে বেতন গ্রেড উন্নীত হওয়ায় প্রতিযোগিতা একেবারে চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে।
পরীক্ষা আয়োজন প্রসঙ্গে পিএসসি জানিয়েছে, এখনো নির্দিষ্ট কোনো তারিখ ঘোষণা করা হয়নি। কমিশনের চেয়ারম্যান মোবাশ্বের মোনেম স্বীকার করেছেন, এত বিপুল সংখ্যক পরীক্ষার্থীর জন্য পরীক্ষা আয়োজন করা অত্যন্ত জটিল এবং সময়সাপেক্ষ কাজ। স্বচ্ছতা ও প্রশ্নফাঁস রোধের বিষয়টি মাথায় রেখে কমিশন সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এই পরীক্ষা ঢাকায় একক কেন্দ্রে আয়োজন করা হবে। সে অনুযায়ী সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে প্রস্তুতি চলছে।
নিয়োগ পরীক্ষার কাঠামো অনুযায়ী মোট ১০০ নম্বরের ভিত্তিতে প্রার্থী নির্বাচন করা হবে। এর মধ্যে লিখিত পরীক্ষার জন্য নির্ধারিত থাকবে ৯০ নম্বর এবং মৌখিক পরীক্ষার জন্য ১০ নম্বর। লিখিত পরীক্ষায় বাংলা, ইংরেজি, গণিত, দৈনন্দিন বিজ্ঞান এবং সাধারণ জ্ঞান—বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি অন্তর্ভুক্ত থাকবে। লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হলে অন্তত ৫০ শতাংশ নম্বর অর্জন করতে হবে। কেবল লিখিত পরীক্ষায় সফল প্রার্থীরাই মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবেন।
এই নিয়োগ ঘিরে তৈরি হওয়া সাত লাখ প্রার্থীর প্রতিযোগিতা শুধু একটি পরীক্ষার গল্প নয়, বরং এটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ও কর্মসংস্থানের বাস্তব চিত্রও তুলে ধরে। এত বিপুলসংখ্যক যোগ্য প্রার্থী যখন মাত্র কয়েক হাজার পদের জন্য লড়ছেন, তখন প্রশ্ন উঠছে—কর্মসংস্থান কাঠামো, শিক্ষানীতি ও দক্ষতা ব্যবস্থাপনায় নতুন করে ভাবার সময় কি এসে যায়নি?
সবশেষে একটাই প্রশ্ন সামনে রয়ে যায়—এই সাত লাখ প্রার্থীর ভিড় পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত কারা হবেন দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্য মুখ? সেই উত্তর জানতে এখন চোখ সবার পিএসসির দিকে।

