বাংলাদেশে শিক্ষার্থীরা প্রথম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত বাংলা ও ইংরেজি—দুটি ভাষাই বাধ্যতামূলকভাবে পড়ে। কিন্তু ১২ বছর পড়াশোনা শেষে বহু শিক্ষার্থীই কাঙ্ক্ষিত ভাষাগত দক্ষতা অর্জন করতে পারে না। এর প্রভাব পড়ছে উচ্চশিক্ষা, প্রতিযোগিতামূলক ভর্তি পরীক্ষা এবং চাকরির বাজারে।
উত্তরপত্র, অফিসিয়াল চিঠি, নথিপত্র, পোস্টার, ব্যানার, এমনকি গণমাধ্যম ও পাঠ্যবইয়েও ভাষাগত ভুল চোখে পড়ে। চাকরিক্ষেত্রে ইংরেজিতে সাবলীলভাবে কথা বলতে বা সঠিকভাবে লিখতে না পারার কারণে অনেক চাকরিপ্রার্থী বাদ পড়ে যাচ্ছে। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান চীন, ভারত ও শ্রীলঙ্কাসহ অন্যান্য দেশ থেকে কর্মী নিয়োগ করছে।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের প্রাক্কালে বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে।
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সরকারি কর্মকর্তাদের মতে, দক্ষ ও অনুপ্রাণিত শিক্ষকের অভাব, সুসংহত ভাষানীতি না থাকা এবং ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষাপদ্ধতি—এই সংকটের মূল কারণ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, যোগ্য ও প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাবই প্রধান সমস্যা। অনেক শিক্ষক যথাযথ প্রশিক্ষণ পান না, কেউ কেউ ঘুষ দিয়ে চাকরি পান এবং শ্রেণিকক্ষের চেয়ে কোচিং ও প্রাইভেট টিউশনে বেশি আগ্রহী থাকেন।
তিনি বলেন, আমরা এমন একটি জাতি, যার অধিকাংশ মানুষের মাতৃভাষা বাংলা, অথচ এই ভাষাই অবহেলিত। এটি রাষ্ট্রের ব্যর্থতা। ভাষা শেখার ক্ষেত্রে সাহিত্য শেখানো হয় না—কেবল ব্যাকরণ ও অনুবাদ শেখানো হয়। অথচ সাহিত্য থেকেই ভাষার প্রকৃত দক্ষতা আসে।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের ‘ন্যাশনাল অ্যাসেসমেন্ট অব সেকেন্ডারি স্টুডেন্টস–২০২৩’ শীর্ষক জরিপে ৬০ হাজার শিক্ষার্থীর ওপর গবেষণায় দেখা গেছে, অষ্টম ও দশম শ্রেণির বহু শিক্ষার্থী বাংলা ও ইংরেজিতে দুর্বল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক বাংলা অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক বলেন, ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে ইংরেজির ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পর বাঙালি বুদ্ধিজীবীরা বাংলায় গুরুত্ব দিলেও ভাষা শিক্ষার গভীর চিন্তাভাবনা গড়ে ওঠেনি।
১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পর ভাষা উন্নয়ন ও জ্ঞানচর্চার পরিবর্তে বিত্তশালী শ্রেণি সন্তানদের বিদেশে পাঠাতে শুরু করে। দেশপ্রেমের কথা বলা হলেও মন ছিল বিদেশমুখী—এটিকে তিনি জাতীয় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেন।
বিশ্ববিদ্যালয় অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের উপাচার্য অধ্যাপক শামসাদ মোর্তুজা বলেন, শিক্ষার্থীরা প্রশিক্ষিত শিক্ষকের নাগাল পায় না। বড় বড় শ্রেণিকক্ষে লেখা, পড়া, বলা ও শোনার চারটি দক্ষতা শেখানো কার্যকর হয় না।
তিনি আরও বলেন, জাতীয় শিক্ষাক্রম পর্যাপ্ত উচ্চাভিলাষী নয়। শিক্ষকদের সক্ষমতা বিবেচনায় রেখে পাঠ্যক্রম সহজ করে দেওয়া হয়, যার সুযোগ নিয়ে কোচিং ব্যবসা প্রসারিত হয়।
তিন মাধ্যমের (বাংলা, ইংরেজি ও মাদ্রাসা) শিক্ষাব্যবস্থা ভাষাগত বৈষম্য তৈরি করছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে ‘বাংলা-শুধু’ নীতি ইংরেজির প্রয়োজনীয়তাকে কম গুরুত্ব দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আশাদুজ্জামান বলেন, সমস্যার শুরু প্রাথমিক স্তরেই। পরিকল্পনার অভাব, বিষয়ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষক না থাকা এবং ঘন ঘন পাঠ্যক্রম পরিবর্তন—এসব সমস্যা পরিস্থিতিকে জটিল করেছে।
তিনি জানান, দেশে প্রায় ৬৫,৫৬৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৩২,০০০টিতে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। যদিও ২৩ ডিসেম্বর সরকার প্রধান শিক্ষকদের বেতন ১০ম গ্রেডে উন্নীত করেছে, তবু শূন্যপদ বড় চ্যালেঞ্জ।
তিনি আরও বলেন, প্রত্যন্ত এলাকায় শিক্ষক নেই বা দক্ষ শিক্ষক থাকতে চান না। রাজধানীকেন্দ্রিকতা পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করেছে।
বাংলা ভাষা প্রচলন আইন ১৯৮৭ এবং ২০১২ ও ২০১৪ সালে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী সব ক্ষেত্রে বাংলা ব্যবহারের কথা থাকলেও তা যথাযথভাবে মানা হচ্ছে না।
অধ্যাপক আশাদুজ্জামান বলেন, ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে অর্জিত ভাষার মর্যাদা আমরা যথাযথভাবে রক্ষা করছি না। দেশে একটি শক্তিশালী ভাষা কমিশন প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কেবল শিক্ষাগত সমস্যা নয়—একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যা। ধনী শ্রেণি ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করে এবং ভাষাগত বৈষম্য নিয়ে উদ্বিগ্ন নয়। অন্যদিকে সাধারণ শিক্ষার্থীরা কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না।
অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, অনেক শিক্ষার্থী বাংলায় আগ্রহী নয়, কারণ তারা মনে করে এটি চাকরি পেতে সহায়ক নয়। ফলে ভাষা শিক্ষার প্রতি সামগ্রিক আগ্রহ কমে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ, যথাযথ প্রশিক্ষণ, স্থিতিশীল ভাষানীতি এবং সাহিত্যভিত্তিক ভাষা শিক্ষা ছাড়া এ সংকট কাটানো সম্ভব নয়। ভাষা শেখা কেবল পরীক্ষার বিষয় নয়; এটি চিন্তা, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের অংশ।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের প্রাক্কালে প্রশ্ন উঠছে—আমরা কি সত্যিই আমাদের ভাষাকে যথাযথ মর্যাদা দিচ্ছি? আর ইংরেজিকে প্রয়োজন অনুযায়ী দক্ষভাবে শেখাতে পারছি?
১২ বছর পড়াশোনার পরও যদি ভাষায় দুর্বলতা থেকে যায়, তবে তা শুধু শিক্ষার্থীর ব্যর্থতা নয়—এটি পুরো ব্যবস্থার সংকটের প্রতিফলন।

